কিন্তু দেশে ফিরে গেলে শেষ কটা দিন তোমার পাশে কে থাকবে মা! পৃথিবীটায় যে তুমি ভালোবাসা পেয়েছে, শুধুই আঘাত পাওনি, এ তোমাকে কে বোঝাবে? আমি সারাদিন ছটফট করি, সারারাত এপাশ ওপাশ করি। আমার আঙুলে একের পর এক সিগারেট পুড়তে থাকে। ভাবনা জট পাকিয়ে যায়, ভাবনাকে খুলে খুলে আলাদা করি। আবার জটপাকায়। তোমার যেমন সময় নেই, আমারও সময় নেই হাতে। নিউইয়র্কের সুইডিশ অ্যামবেসিতে ছুটে যাই, বলি আমি আপনাদের রাজনৈতিক আশ্রয় নিজ দায়িত্বে বাতিল করতে চাইছি, রাজনৈতিক শরণার্থীর জন্য জাতিসংঘের যেপাসপোর্ট আমার আছে, তাও আমি নিজ দায়িত্বে ত্যাগ করছি, আমাকে আমার বাংলাদেশের পাসপোর্টটি ফেরত দিন। জরুরি। দূতাবাস থেকে বলা হল, তাহলে আপনি কিন্তু আর ফিরেপাবেন না আপনার রাজনৈতিকশরণার্থীর সম্মান, এই জাতিসংঘের ট্রাভেল ডকুমেন্টও আর জুটবে না। আমি থোড়াই পরোয়া করি ওসবের। জীবনের ঝুঁকি আমি নেব, তবু আমার মার পাশে আমি থাকবো। নিরাপদ বিদেশ আর ততোধিক নিরাপদ বিদেশি পাসপোর্টে আমার কোনও মোহ নেই। আমি সমস্ত ত্যাগ করতে পারি নিমেষে। সুইডেনের দূতাবাস দ্রুতই আমার কথা রাখলো। সুইডেন থেকে জরুরি তলবে আনিয়ে দিল আমার পাসপোর্ট। ফেরত নিয়ে নিল জাতিসংঘের নথিপত্র। তখনও আয়ু আছে ওই পাসপোর্টের। এখন কিনতে হবে আমার দেশে যাওয়ার টিকিট। অন্য কোনও বিমানে আমার যাওয়া চলবে না, যেতে হবে বাংলাদেশ বিমানেই। কারণ তোমার আর বাবার বাংলাদেশ বিমানেরই ফেরত যাত্রার টিকিট। কিন্তু বিমানের টিকিট কাটতে আমি যদি বিমান অফিসে যাই, মুহূর্তে রাষ্ট্র হয়ে যাবে আমি দেশে ফিরছি। অন্য কাউকে দিয়ে টিকিট কাটালেও আমার নাম নিয়ে সমস্যা। এ নাম তো জগতে দ্বিতীয় কোনও ব্যক্তির নেই, এক আমার ছাড়া! মিলনকে পাঠালাম টিকিট কাটতে, তসলিমা নাসরিন নামে নয়, যেন টি, নাসরিন নামে টিকিট কাটে। তাই হল, বিমান অফিসের কেউ বুঝলো না এই টি. নাসরিনটি যে আসলে আমি। হতে পারে তৌহিদা নাসরিন, হতে পারে তাবাসসুমা নাসরিন। আমার যাবার খবরটি শুধু হাতে গোনা কজন জানে। বাবা, তুমি, ইয়াসমিন, মিলন, সুহৃদ। একজনের বাইরে আর কাউকেই আমি জানতে দিইনি। ছোটদার সঙ্গে প্রতিদিন ফোনে কথা হচ্ছে, তাকেও বলিনি যে আমি যাচ্ছি। বাংলাদেশে কোনও প্রাণী এ খবর জানুক আমি চাইনি। জানাজানি হয়ে গেলে মৌলবাদীদের প্রয়োজন হবে না, হাসিনা সরকারই আমাকে ছিঁড়ে খেয়ে ফেলবে, সরকারি আদেশ অমান্য করার অপরাধ কী যে সে অপরাধ!
ইয়াসমিন আর মিলন গেল বিমান বন্দরে বিদায় জানাতে। ইয়াসমিনকে বলেছি, এ তোর শেষ দেখা মাকে। শেষবার দেখে নে, ছুঁয়ে নে, মাকে যে ভালোবাসিস বারবার বল। যে কথা আমরা কোনওদিন বলিনি, সে কথা বলে দে। শেষবার। ইয়াসমিন কাঁদলো। তবে জানি না তুমি যে কদিন ছিলে নিউ ইয়র্কে, আমার বাড়িতে সে কেন অতিথির মতো আসতো, কিছুক্ষণ থেকেই তার যাই যাই শুরু হত। এক রাতও সে তোমার সঙ্গে ঘুমোয়নি! দিনে সে কাজ করতো। মুদির দোকানের ছোট কাজ। অনেক বলেছি কাজ টাজ বাদ দে, মার কাছে থাক। থাকেনি। তার টাকার দরকার। প্রচুর টাকা নাকি ধার করেছে দেশে যেতে গিয়ে, সুতরাং ধার শোধ করতে হবে। ধারের টাকা কত বল, আমি দিয়ে দিই, তবু মার কাছে থাক। মাকে আর কদিন পাবি। ডাক্তার বলে দিয়েছে তিন মাস মাত্র মা আছেন। তিন মাসের খবরটি যখন ছোটদাকেও জানিয়েছিলাম, কোনও প্রতিক্রিয়া দেখিনি। কী জানি, ওদের কাছে তিন মাসকে তিন যুগের মতো মনে হয়েছিল কি না। ইয়াসমিন তার কাজ থেকে ফিরে ভালোবাসাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠতো, ওর নাওয়া খাওয়া, ওর ঘুম, ওর কাপড় চোপড়। ভালোবাসাকে নিয়েই এখানে থাক, সবাই একসঙ্গে। না, ইয়াসমিনের যুক্তি ও খুব জ্বালায় সবাইকে। তা জ্বালাক। মার তো সঙ্গ চাই, মা তো ভালোবাসার জ্বালায় জ্বলছে না, তবে কেন! ইয়াসমিন একদিন তোমাকে নেমন্তন্ন করলো তার বাড়িতে। এতদিনে ওই একদিনেই সাত তলা থেকে তিনতলায় ওর বাড়িতে গিয়েছিলে। প্রচুর রান্না কান্না করেছিলো, সেসব খাওয়ালো সবাইকে। বাড়ি বলতে একটি মাত্র ঘর। মিলন ছোট কাজ করে, সে নিজেও ছোট কাজ ধরেছে। একটি ঘর ছাড়া কোনও বড় অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। ও খুশি হত ও যদি তোমাকে তার ঘর, তার দারিদ্র না দেখাতে পারতো। ও বোঝাতে চায় না যে ওর অল্প টাকা আয়, বোঝাতে চায় না যে আমেরিকায় সে এমন কোনও ভালো অবস্থায় নেই। ওর দারিদ্র দেখে তুমি আর বাবা দুঃখপাবে, হয়তো সে কারণে। নাকি অর্থ কড়ি নিয়ে ওর নিজের অহংকার করার কিছু নেই বলে ওই হীনম্মন্যতা! তোর মা আর মাত্র কটা দিন বাঁচবে। তোর কী আছে কী নেই, সেটার হিসেব না করলে কি চলে না রে ইয়াসমিন! জানিনা ইয়াসমিনের হীনম্মন্যতার এও কোনও কারণ ছিল কি না যে আমি যেমন পারছি, ও তোমার জন্য তেমন খরচ করতে পারছে না। ওর দেনার দায়, এই দায় আমার নেই। এর নাম কি তবে ঈর্ষা? তুমি অসুস্থ আর হঠাৎ করে ওর এমন তীব্র সংসারী হয়ে ওঠা, তোমাকে সময় দেওয়ার সময় না পাওয়া কেন! আমি খুব বিরক্ত হতাম ওর আচরণে, ওর না আসায়, না থাকায়। তুমি অনুযোগ করতে না। ও যেতে চাইলে ওকে যেতে দিয়েছো, বাধা দাওমি। একদিন জামার ওপর ও একটা ওড়না পরে এসেছিলো, আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, এটা কোথায় পেয়েছিস, এটা তো আমার শাড়ি ছিলো। হ্যাঁ দেশে গিয়ে ও আমার শাড়ি কেটে ওড়না বানিয়েছে। শাড়ি দিয়ে কী করবো আমি মা, পাঁচশ শাড়ি পড়ে আছে দেশে। বিদেশে তো আমি শাড়ি পরি না। ওই পুরোনো সুতির সস্তা একটা শাড়ি কেটে যদি ও একটা ওড়না বানায়, যে জিনিসগুলো ব্যবহার হচ্ছেনা, সে যদি আমারই ছোট বোন ব্যবহার করে, তবে খুশিই তো আমার হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমি বিরক্ত হয়ে বলেছিলাম, যেভাবে আমি আমার জিনিসপত্র রেখে এসেছি, সব সেভাবেই থাকুক আমি চেয়েছিলাম, এই চাওয়াটাকে মোটে মূল্য দিলি না। কেন বলেছিলাম মা? আগে না হয় বলেছি, দেশে ফেলে আসা আমার ঘর দুয়োর আমি সব আগের মতো ফিরে পাবো, এই স্বপ্ন হয়তো অনেক বড় স্বপ্ন নির্বাসিত এক মানুষের জন্য। কিন্তু তোমার ভয়াবহ অসুখটি হওয়ার পর, ডাক্তার তোমাকে হাতে গুনে কদিন বাঁচবে তা বলে দেওয়ার পর জিনিসপত্র, ঘর বাড়ি, বা কোনও কিছুর কি মূল্য আর থাকার কথা! আমার যা আছে, সব কিছু তো ইয়াসমিনের নামেই লিখে দিয়ে যাবো, তবে কেন ওই স্মৃতিকাতরতা আমার! নির্বাসিতার স্বপ্ন টপ্নও কি তখন তুচ্ছ হওয়ার কথা নয়! তুমিই যদি বেঁচে না থাকে, তবে কোথায় আমি আর ফিরবো? আমার জিনিসপত্রের কাছে, বাড়িঘরের কাছে? ওইইটকাঠসিমেন্ট কংক্রিটকাপড়চোপড় কি দেশের আরেক নাম। তুমিই যেখানে স্মৃতি হয়ে উঠবে আর কদিন পর, কোন স্মৃতি আছে জগতে, যে স্মৃতি তোমার স্মৃতির চেয়ে মূল্যবান? ইয়াসমিনের সঙ্গে অমন ব্যবহার যদি করেইছিলাম, তোমার সামনে করেছিলাম কেন, আমি যে খুব ছোট মনের একটা মেয়ে, স্মৃতি ফিরে পাওয়ার শখে অসভ্যের মতো আকুল, তা তোমাকে দেখিয়ে কি তোমার কিছু ভালো করেছিলাম আমি! যতই আমি তোমাকে শুধু প্রশান্তি দেব, শুধু ভালোবাসার কথা শোনাবো ভাবি, রূঢ় রুক্ষ বাস্তব এসে সব এলোমেলো করে দেয়।
