আকাশের নক্ষত্ররাজির দিকে তাকিয়ে ভাবি তোমার কথা, খুব অনুতাপ করি তোমার সেরাতের কষ্টের জন্য। যদি তোমাকে ওভাবেই রাখতাম, বিছানা থেকে না নামিয়ে নিতাম, যদি ওই ডাক্তারের গালে জোরে একটা চড় কষাতে পারতাম, যদি পুলিশ ডাকতাম, যদি মামলা ঠুকে দিতাম! কিছুই করিনি। সুইডেনে তোমাকে চিকিৎসা করাতে গিয়ে আমি টাকার অভাব বোধ করেছিলাম। তখন থই থই কৃপণতা আমার। আর যখন তোমার চিকিৎসা না করিয়ে তোমাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিলাম, তখন আমি উদার হস্ত, আমার মতো দরদি আর দুটি নেই। তোমার অসুখ ধরাপড়ারপর আমাকে যদি কেউ বলতো তোমার মার ভালো চিকিৎসা হতে পারে, তোমার মা বেঁচে উঠবে, তোমার যা আছে সহায় সম্পদ সব দিয়ে দাও। আমি হয়তো তক্ষুণি সব দিয়ে দিতাম।
শ্লোন কেটেরিংএর আশা আমাকে বাদই দিতে হল। তোমার অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। সিপিটির বিষে তুমি নীল হয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন। ইমারজেন্সির স্যালাইনও তোমাকে সুস্থ করতে পারলো না। আবার জ্বর হল তোমার। আবার বমি। তোমাকে অ্যাম্বুলেন্স ডেকে পাশের হাসপাতালে নিয়ে গেলাম, ওখানেও সারারাত ধরে স্যালাইন দেওয়া হল। তোমার গা থেকে জল হাওয়া হয়ে যাচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে কেন যাচ্ছে কে জানে। শরীরের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতাও কমে গেছে, বার বার কোথাও না কোথাও ইনফেকশন হচ্ছে তোমার, তাই জ্বর। ক্যানসার, মেটাসটেসিস, ভুল অপারেশন, কিমোথেরাপি, সিপিটি নামের জাপানি বিষ –সব তোমাকে গিলে খাচ্ছিল। অন্তত এই বোধটুকু আমার হয়েছে যে দেশ থেকে অতদূর বিদেশে এসে তোমার ক্ষতি ছাড়া লাভ কিছু হয়নি। আমি তো ক্ষতি তোমার করেইছিলাম দেশে, সুইডেনে, আবার অতদূরপথ পাড়ি দিয়ে আমারই ক্ষতির শিকার তোমাকে হতে হল। তোমার শরীরে আর যে ওই বিষ ঢোকানো চলবে না, সে আমি হাড়ে হাড়ে বুঝি। তিন মাস আয়ুর ভবিষ্যদ্বাণী আমাকে কানে বারবার হায়েনার হাসির মতো বাজতে থাকে। আমারও যেন গা থেকে জল কমে যাচ্ছে, সারা শরীর আমার কাঁপে, আশংকায়।
আমি তখন সেই কাজটি করি মা। তুমি জানো না কী করে আমি ফোন করতে শুরু করলাম দেশে। দেশে ডঃ কামাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। বললাম তোমার কথা, বললাম তোমাকে দেশে ফেরত যেতে হবে, বললাম, আমাকেও দেশে ফিরতে হবে। ডঃ কামাল হোসেন বললেন তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন। জানি না তিনিই নাকি অন্য কেউ আমাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ফোন নম্বর দিয়েছিলেন। আমি নিজেই ফোন করলাম তাঁকে। রফিকুল ইসলামকে আমি চিনি বৈকি। মুক্তিযোদ্ধা, বীর উত্তম খেতাব পেয়েছেন। একদিন আমার শান্তিবাগের বাড়িতে এসে মুক্তিযুদ্ধের ওপর তাঁর নিজের লেখা কিছু বই দিয়েছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে যখন বললাম, যে, আমার মা অসুস্থ, আর মাত্র তিনমাস বাঁচবেন বলে ডাক্তার জানিয়ে দিয়েছেন, মার সঙ্গে তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো আমি কাটাতে চাই। মাকে নিয়ে আমি দেশে ফিরবো, যে করেই হোক আমাকে ফিরতে হবেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন আমি নিশ্চয়ই ফিরতে পারি, কোনও অসুবিধে নেই। তারপরও, বললেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে নিতে চান। এর দুদিন পর তিনি আমাকে জানিয়ে দিলেন, যে, শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা হয়েছে তাঁর। তিনি তাঁকে আমার মার আর মাত্র তিন মাস বাঁচার কথা বলেছেন কিন্তু হাসিনা চান না আমি দেশে ফিরি। সুতরাং, আমার ফেরা সম্ভব নয়। ফিরলে আমাকে বিমান বন্দর থেকেই বিদেশে ফেরত পাঠানো হবে, দেশে ঢুকতে দেওয়া হবে না। কী কারণ, কী অন্যায় আমি করেছি? নিরুত্তর ওদিকটা। অন্যায় আসলে কে কার সঙ্গে করছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারেন। তাঁর ইচ্ছেয় হোক, অনিচ্ছেয় হোক আমাকে তিনি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ জানিয়ে দিলেন, কোনও অবস্থাতেই যেন দেশে না ফিরি। বিমূঢ় বসে রইলাম। তোমাকে তো ফিরতেই হবে। তোমাকে দেশে ফেরত পাঠানোর কথাবার্তা চলছে শুনে লেমার বিস্মিত দুচোখ, দেশে কেন পাঠাবো, তোমাকে তো চিকিৎসার জন্য এদেশে আনিয়েছি, তবে চিকিৎসা না করে বিদেয় করতে চাইছি কেন? তোমার এই প্রশ্নটির উত্তর আমি তোমাকে দিতে পারিনি। কী দেব উত্তর, আমি কী বলবো মা, তোমার কোনও আর চিকিৎসা নেই? তোমাকে এখন দেশে গিয়ে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হতে হবে? বিদেশের মাটিতে তোমার মরার দরকার নেই, দেশে গিয়ে আত্মীয় স্বজনের মাঝখানে বসে তোমাকে মরতে হবে। আমার মনে হত, আত্মীয় স্বজনের ধরা ছোঁয়ার মধ্যে মত্যু হলে সেই মত্যু বুঝি চমৎকার হয়। কেন আমার মনে হয়েছিল ওসব? তোমার দুটো মেয়ে বিদেশে, তুমি কার কোলে মাথা রেখে মরার জন্য দেশে ফিরবে! কে আর কোল পেতে বসে আছে তোমার জন্য! যে আদর বাবা তোমাকে কোনওদিন করেনি, সে আদর করছে সে অসুখ ধরা পড়ার পর থেকে। বাবা তোমার সঙ্গে এক বিছানায় ঘুমোচ্ছে। তোমাকে রাতে রাতে উঠে বাথরুমে নিচ্ছে। তোমার সারা গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, তোমার সঙ্গে নরম গলায় কথা বলছে, এসব ছেড়ে তোমার আর কোথায় যাওয়ার প্রয়োজন! বিশেষ করে সেই দেশে যে দেশে ফিরে গেলে তুমি আমাকে পাবে না, ইয়াসমিনকেপাবে না। কিন্তু জানিনা, আমার কেবলই মনে হচ্ছিল, দেশের আর সব আত্মীয়দের তুমি দেখ, চোখ বোজার আগে তোমার জন্য ফেলা তাদের চোখের জলও তুমি দেখ। তুমি দেখ, তোমাকে শুধু আমি নই, আরও মানুষ আছে ভালোবাসার।
