সিপিটির বিষ তোমার শরীরে বিষের ক্রিয়াই করেছিলো। স্যালাইনে একটু একটু করে ওই বিষ তোমার শরীরে ঢুকেছে। ট্যাক্সিতে যখন হাসপাতাল থেকে ফিরছিলাম, তোমার গা গুলিয়ে ওঠা শরীর নিয়ে তুমি চুপ হয়ে বসে ছিলে। মনের জোরে বসেছিলে মা। যখন জিজ্ঞেস করেছি, খারাপ লাগছে কি না। তুমি মুখে বলোনি, মাথা নেড়ে উত্তর দিয়েছো যে তুমি ঠিক আছে। আসলে তুমি প্রাণপণ চেষ্টা করছিলে, বিষ ধারণ করতে শরীরে। মনের শক্তি কি শরীরের ওপর সত্যিই খাটে! খাটলে তোমার বেলায় খাটতো। সুইডেনে না হয় ছোট ডাক্তাররা তোমাকে দেখেছিলো। আমেরিকায় তো সবচেয়ে বড় হাসপাতালের বড় বিশেষজ্ঞ তোমাকেপরীক্ষা করেছে। মনে তোমার তো শক্তি পাওয়ারই কথা। ডাক্তার তোমাকে সিপিটি ইনজেকশন দেওয়ার কথা বলেনি, এ আমার একার সিদ্ধান্ত, কিছুই তোমাকে বলিনি। তুমি তো ভেবেছিলে, ডাক্তারের পরামর্শে আমি তোমাকে ইনজেকশন দিচ্ছি। তোমাকে কত কিছু যে লুকিয়েছি! তোমাকে বুঝতে দিতে চাইতাম না যে আর কোনও চিকিৎসা তোমার নেই। বিশেষজ্ঞর পরামর্শ আমি মানিনি বটে, কিন্তু মনে মনে কি ধারণা করিনি যে ডাক্তার ভুল কথা বলছেনা! কিন্তু তারপরও হয়তো আমার অলৌকিকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়েছিল। অথবা এ ছাড়া আমার কোনও পথ ছিল না। তাই বলে যে তোমাকে ঝাড় ফুক দেওয়ার কথা বলবো, তা তো নয়। তুমি যখন ট্যাক্সি থেকে নেমে আমাকে ভর করে হাঁটছিলে আমার সাত তলার অ্যাপার্টমেন্টের দিকে, আমাকে বলেছিলে, ‘এখন থেকে তোমার কাছেই থাকবো আমি। বাকি জীবন তোমার কাছেই। আমি আর কোথাও যাবো না তোমাকে ছেড়ে। কেন বলেছিলে? কারণ তোমার চিকিৎসা নিয়ে আমার ব্যস্ততা, ছুটোছুটি দেখে তোমার মনে হয়েছিল, তোমাকে খুব ভালোবাসি! তোমার কি মনে হয়েছিল, যে ভালোবাসে তার কাছেই তোমার থেকে যাওয়া উচিত। ভালোবাসাকেই মনে হয়েছিল তোমার আশ্রয়! আমার মনে হয় না আমাকে তুমি খুশি করতে ও-কথা বলেছিলে। তোমার তো সংশয় হওয়ার কথা বাকি জীবন আমার কাছে থেকে যেতে চাওয়ায় আমি চমকিত হতে পারি, কিন্তু পুলকিত হব না। সম্ভবত তোমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিলো যে তোমাকে না ভালোবাসলে তোমার জন্য আমি কাঁদতে পারতাম না, আর তোমাকে দূর বিদেশে এনে অঢেল টাকা ঢেলে তোমার চিকিৎসা করতাম না। তুমি আমাকে খড়কুটোর মতো আঁকড়ে ধরেছিলে। কিন্তু বাড়ি ফিরে খুব বেশিক্ষণ তুমি ভালো থাকার অভিনয় করতে পারোনি। এমন বীভৎসভাবে বমি করলে যেন ভেতরে যা কিছু আছে সব ছিঁড়ে বেরিয়ে আসছে। সামনে দাঁড়িয়ে ওসব দেখার সাহস আমার হয়নি। বাবা তোমার শুশ্রূষা করেছে। ভীষণ জ্বর হলো রাতে। পরদিন স্লোন কেটেরিংএর ইমারজেন্সিতে নিয়ে গেলাম, ওই অসুস্থ তোমাকে, জ্বরে পুড়ে যাওয়া তোমাকে, শরীরে জল কমে গিয়ে যে তুমি প্রায় অবশ হাত পা পড়ে আছে। একটা স্যালাইন চালিয়ে দেওয়া হলো। স্যালাইন শেষ হবার পর ডাক্তার বললো তোমাকে যেন বাড়ি নিয়ে যাই। তুমি এত ক্লান্ত, উঠতে চাইছিলে না। তোমাকে বলেছি, বিছানা খালি করে দিতে হবে। যে তুমি সব কষ্ট সইতে পারো, আমার সব আবদার মেনে নাও, সে রাতে তুমি মানতে চাওনি। কতটুকু কষ্ট শরীরে হলে তুমি ওইনাছোড়বান্দার মতো থাকতে চাইতে পারো, সে বুঝি। বাকিটা রাত তুমি ভিক্ষে চাইছিলে মা, শরীরে তোমার এক ফোঁটা শক্তি ছিল না বিছানা থেকে ওঠার। তুমি কাতর অনুনয় করলে রাতটা যেন যেখানে আছে সেখানেই থাকতেপারো। হাঁপাচ্ছিলে, কথা ঠিকমতো বলতে পারছিলে নীলকণ্ঠ তুমি। আমি কাকে অনুরোধ করবো! কেউ জানে না আমি নিজে একজন ডাক্তার, কেউ জানে না আমি একজন লেখক। কেউ জানে না আমি কোনও অখ্যাত কিছুনই। এ দেশ থেকে দু দুটো বই বেরিয়েছে আমার। এদেশের বড় বড় পত্রিকায় আমার প্রশংসা করে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে। এমনকী নিউ ইয়র্ক টাইমস, লস এঞ্জেলেস টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্টের মতো কাগজে সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে আমাকে নিয়ে। কিন্তু যে লোকগুলো আমাকে চেনে না, তাদের কাছে গরিব দেশের বাদামি রঙের মেয়ে ছাড়া আমার আর কোনও পরিচয় নেই। আমার অসুস্থ মাকে ধাক্ক দিয়ে বেড থেকে নামাবেনা তো কী! অথচ এই শহরেই আমার বক্তৃতা শুনতে লোক ভিড় করেছে। এই দেশে আমি তো অচেনা কিছু নই। কত তো আমার পাঠক শুভাকক্ষী আছে। তারা সব কোথায়! তারা কোথায় আমি জানি না। আমি কারও কোনও খবর জানি না। সমগ্র বিশ্বে একটা বিন্দুর মতো আমি একা। আর তুমি, আমার মা, আমাকে নিশ্চিন্তি দেবে, নির্ভাবনা দেবে বলে নিজের অসুখের কথা বলেও যখন দেখেছো আমাকে ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে, তুমি আর বলোনি। তুমি জোর করোনি। বলেনি যে তোমাকে ছোটখাটো ডাক্তার দেখালে চলবে না, বড় ডাক্তার দেখাতে হবে। তুমি আমাকে বিরক্ত করতে চাওনি। মৃত্যুকেই তুমি বেছে নিয়েছে। নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছে আমাকে ভারমুক্ত করতে, মা। তা ছাড়া আর কী, বলো। সে রাতে, ক্যানসার হাসপাতালের ইমারজেন্সিতে জ্বরে প্রায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকা তোমাকে একটা রাত শুধু মাত্র আর কয়েক ঘণ্টা শুয়ে থাকার অনুমতি যত চাইছি, তারা ততই বলে দিল, না হবে না, বেড খালি করে দিতে হবে। কী সুবিধে পাওয়ার জন্য এত টাকা অগ্রিম দিলাম তাহলে! না, ইমারজেন্সির ডাক্তার কিছুতেই শুনবেনা। হাসপাতালে ভর্তি করাবে না তোমাকে। শুধু লাত্থি দিয়ে তোমাকে নামাবে। এ সময় পাশে কেউ নেই। পাশে কেউই নেই মা। আমার মতো হতবুদ্ধি আর অসহায় তখন কেউ ছিল না। বিছানা থেকে করুণ ক্লান্ত তোমাকে নামিয়ে আনলাম। রাত তিনটেয় ট্যাক্সি ডেকে বাড়ি ফিরতে হলো। সারাপথ আমি কোনও কথা বলতে পারিনি তোমার সঙ্গে, পৃথিবীটাকে শুধু নির্মম মনে হয়নি, বড় নোংরা মনে হয়েছে।
