একদিন তোমাকে বলে দিলাম কত টাকা আমাকে হাসপাতালে জমা দিতে হয়েছে। সেটা তোমার জন্য কত লক্ষ টাকা খরচ করছি সেটা বোঝাবার জন্য নয়, তোমার জন্য কত ক্ষতি আমার হচ্ছে, সেটা বোঝাবার জন্য নয়। তোমাকে ভালোবাসি, তোমার সুস্থ হওয়াটা চাই, টাকা আমার কাছে তুচ্ছ, তোমার সুস্থ হওয়াটা বড়, এ কথাটা বোঝাবার জন্য। তুমি কি বুঝেছিলে? নাকি ভেবেছিলে টাকা খরচ নিয়ে আমার অনুশোচনা হচ্ছে। ভেতরে ভেতরে তুমি সাংঘাতিক অভিমানী মেয়ে ছিলে। সংবেদনশীল, স্পর্শকাতর। জানি না কী মনে হয়েছিলো তোমার। কেমন যেন চুপচাপ থাকতে। যেন তোমার কিছুই হয়নি, কোনও অসুখ হয়নি, যেন দিব্যি আছো। কার সঙ্গে অভিনয় করতে, মা? কাকে ফাঁকি দিতে? একবারও এরপর জিজ্ঞেস করোনি, ডাক্তার কী বলেছিলো যে আমি কাঁদছিলাম। একবারও কেন তুমি জানতে চাওনি। তুমি তো কত কিছুর খুঁটিনাটি জানতে চাইতো কী করে বিদেশে বাজার করি, কী করে রান্না করি, হাত পুড়ে যায় কিনা রাঁধতে গিয়ে, টাকা পয়সা ঠিক ঠিক আছে কিনা, হিসেব করে খরচ করি কিনা। দেশে ফেরার জন্য কোনও চিঠিপত্র লিখছি কী না দেশের সরকারকে, ব্যারিস্টার কামাল হোসেনকে জানাচ্ছি। কী না দেশে ফেরাবার ব্যবস্থা করার জন্য, সব।
০৪. তোমাকে নিয়ে এলাম বটে বাড়িতে
তোমাকে নিয়ে এলাম বটে বাড়িতে। কিন্তু কী করবো! বুকের ধুধু প্রান্তর জুড়ে হাহাকারের ঝড়। আমি তো তোমাকে সর্বাধুনিক চিকিৎসা দেবার জন্য দেশ থেকে নিয়ে এসেছি এই দূর দূরান্তে। এত দূর এসেছো, চিকিৎসা তো আমাকে করাতে হবে। উৎসুক অপেক্ষা করছে, জানি। তুমি বাঁচতে চাইছে, জানি। কতটুকু দুর্বল তুমি ভেতরে, কতটুকু শক্ত হয়ে আছো বাইরে, হাসছে, কথা বলছো, খাচ্ছো, গল্প করছো, বুঝি। মাঝে মাঝে মনে হয় চিৎকার করে সারা শহর ফাটিয়ে কাঁদি। কেউ নেই আমাকে সাহায্য করার। কেউ নেই তোমাকে বাঁচাবার। ডাক্তার আমাকে পরামর্শ দেয়নি নতুন ওষুধটি তোমাকে দেওয়ার। কিন্তু ডাক্তার বললেই আমি শুনবো কেন? সুইডেনের সাদা ডাক্তারদের আমি দেখে এসেছি কেমন চমৎকার তাদের চিকিৎসা। আমার ওই সাদা-মোহ আর নেই। ডাক্তারদের বিশ্বাস করাও আমি জানি যে আমার উচিত নয়। ডাক্তারের ওই তিন মাস বাঁচার ঘোষণা আমাকে দুমড়ে মুচড়ে, ভেঙে চুরে, আমার হৃৎপিণ্ড পিষে, আমার রক্ত শুষে নিয়ে, আমার মস্তিষ্ক কামড়ে, আমার ত্বক কেটে কেটে, আমার হাড়ে মজ্জায় আগুন ধরিয়ে, আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ছিদ্র করে আমাকে ভয়াবহ মৃত্যুর সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। যেন তুমি নও, আর মাত্র তিন মাস আয়ু আমার। যেন তোমার নয়, এ আমার মৃত্যুসংবাদ। নরকের গহ্বরে। কেউ আমাকে পেছন থেকে আচমকা ধাক্কা মেরে যেন ফেলে দিল। তার চেয়ে বোধহয় এই ভালো ছিল এই কুৎসিত খবরটি না জানা। তার চেয়ে বোধহয় এই ভালো ছিল আশায় আশায় থাকা। দেশেই থাকতে, কিমোথেরাপি চলতে থাকতো। জানতাম, অপারেশন হয়েছে, কিমোথেরাপিও কাজ করছে, জানতাম তুমি সুস্থ হয়ে উঠছো, উঠবে। দুঃসংবাদ শোনার চেয়ে না শোনাই ভালো। নিষ্ঠুর সত্য জানার চেয়ে সুন্দর মিথ্যে জানাও হয়তো ভালো। যদি এও না জানতাম, যে, তোমার ওই রোগটির নাম ক্যানসার! যদি না জানতাম লিভার পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে তোমার রোগ, যদি মূখের মতো সুখে থাকতে পারতাম! মা।
সারারাত আমি ঘুমোতে পারি না। বাবাকে ড্রইংরুমে শুতে দিয়ে আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমোই। যে আদর তোমাকে সারাজীবন করিনি, সেই আদর করি। আমার বিশ্বাস হতে চায় না ক্যানসার হাসপাতালের ডাক্তারের কথা, আমি সবলে সর্বশক্তি দিয়ে অস্বীকার করতে চাই ডাক্তারের ভবিষ্যদ্বাণী। আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় না ঢাকার ডাক্তারের ডায়াগনোসিস। যদি ভুল হতো সব! টিউমারপরীক্ষা করতে গিয়ে এমন তো হয়প্যাথোলজির লোক ভুল করেছে। অ্যাডেনোকারসিনোমা বলেছে, আসলে অ্যাডেনোকারসিনোমা নয়, ক্যানসার নয়। লিভার মেটাসটাসিস বলছে, আসলে তা নয়। প্রতিদিন তো ডাক্তাররা রোগীর রোগ ধরতে ভুল করছে। তোমার রোগ ধরতেই কম ভুল তো ডাক্তাররা এ যাবৎ করেনি। তবে কেন এখন ভুল হবে না! কেন সব ডাক্তার হঠাৎ করে নির্ভুল হয়ে গেল। দেশে বিদেশে সবখানে!
পরদিন তোমাকে স্লোন কেটেরিং হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে সেই ট্রায়াল চিকিৎসাটি নিই তোমার জন্য। জাপানের কী একটা উদ্ভিদের নির্যাস। নাম, সিপিটি ইলেভেন। ইনজেকশন নিতে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হয় না। আমার সিদ্ধান্ত আমি নেব। টাকা দিচ্ছি, ইনজেকশন দাও। বিদেশে তোমার চিকিৎসা হচ্ছে, তোমার চেহারায়তি ফিরে এলো। বেশ খুশি মনেই হাসপাতালে গেলে। ভাবছিলে, চিকিৎসা নিশ্চয়ই আছে তোমার রোগের। রোগটা কী, এ পর্যন্ত তোমার সামনে কেউ উচ্চারণ করেনি। হয়তো ভেবেছিলে যে অপারেশনেরপরও যে পেটে একটা অস্বস্তি রয়ে গেছে, সেটা কাটাতে নিউইয়র্ক এনে চিকিৎসা করাতে হচ্ছে। ভেবেছিলে নাকি ঠিকই বুঝতে পেরেছিলে কী অসুখ হয়েছে তোমার! তখন না মনে হলেও এখন মনে হয় তুমি প্রথম থেকে ঠিকই বুঝেছিলে সব। এমনকী তুমি তো বলছোই যে ঢাকায় কিমোথেরাপি নেওয়ার পর শরীরটা তোমার ভালো লাগতো। ওইবিষ শরীরে নেওয়ারপর তোমার শরীর ভালো লাগার তো কোনও কারণ নেই, ভালো লেগেছিলো তোমার মন। কিছু একটু চিকিৎসা হচ্ছে, চিকিৎসা হওয়া মানেই কোনও না কোনও একদিন ভালো হয়ে ওঠা, গোপনে এই একটি বিশ্বাস তোমার ভেতরে কাজ করতো। অথবা কোনও আশা নেই, কিন্তু প্রাণপণে একটু আশার সন্ধান করতে। মা। খুব বাঁচতে চাইতে তুমি। সারাজীবন তুমি মৃত্যুর কথা বলেছো, আর যেদিন মৃত্যু সত্যি সত্যিই উপস্থিত হলো, একবারও উচ্চারণ করোনি মৃত্যুর কথা। জীবনের কথা বলতে। ভবিষ্যতের কথা বলতে। তুমি কি আমাদের ফাঁকি দিতে চাইতে, বোঝাতে চাইতে তুমি আদৌ জানো না কী রোগে আক্রান্ত তুমি? তোমাকে আমরা বুঝতে দিতে চাইতাম না তোমার অসুখের কিছু, তুমিও অভিনয় করতে যেন কিছুই জানো না। তুমি আমাদের স্বস্তি দিতে চাইতে না বোঝার অভিনয় করে। তোমাকে ওই অভিনয়টুকু করতেই হয়তো হয়েছিলো। নিজের জীবন দিয়ে আমাদের মুখে হাসি ফোঁটালে, নিজের জীবন দিয়ে আমাদের তুমি সুখ আর স্বস্তি দিয়ে গেলে। অবুঝের মতো থেকে গেলে। তুমি তো কিমোথেরাপির কথা বলেছো। বলেছো অপারেশনের পর তোমাকে ‘কিমো’ দেওয়া হচ্ছে। তুমি তো জানো হাশেম মামার লিভার ক্যানসার হয়েছে, তাকে কিমোথেরাপি দেওয়া হয়। সংক্ষেপে যাকে হাশেম মামা আর অন্যরা কিমো বলতো। কিমো শব্দটি তো ক্যানসার ছাড়া অন্য কোনও অসুখের চিকিৎসার বেলায় ব্যবহার করা হয় না। তুমি যে তোমার বেলায় দিব্যি ব্যবহার করলে! কাউকেই তো প্রশ্ন করোনি, তোমাকে স্যালাইনে ভরে যে ওষুধটি দেওয়া হচ্ছে। সেটিকে কি কারণে কিমো বলা হয়, কিমো তো ক্যানসারের ওষুধ! কাউকে অপ্রস্তুত করতে চাওনি বুঝি!
