ফোন কিছু কলকাতা থেকে আসে। ফোন কিছু যায়। ফোনের আসা যাওয়ার সংখ্যা ধীরে ধীরে কমছে। হ্যাঁ কমছে। শঙ্খ ঘোষ ফোন করলেন। অভিনন্দন জানালেন সিমোন দ্য বোভোয়া পুরস্কার পাবার জন্য। জিজ্ঞেস করলেন, ফ্রান্সে লিখেছি, যে, এখানে কেউ নেই পাশে’, সে কেন। বললাম ‘পুরোনো একটা লেখার অনুবাদ ওটি। তখন সত্যি বলতে কী কেউ ছিল না। মনে মনে বলি, এখনই বা কে আছে, কী আছে! গুটিকয় মানুষ আছে শুধু, রাজনৈতিক অরাজনৈতিক কোনও দল টল তো নেইই। বললাম, প্রথম দিকে, মহাশ্বেতা দেবীরা সভা বা মৌন মিছিল করার আগে, সত্যিই তো কিছু তো হচ্ছিল না। ঠিকই তো, কোনও রাজনৈতিক দল কি বলেছে কিছু, এত নারীবাদী সংগঠন, এত মানবাধিকার সংগঠন, কিছু তো বলেনি তারা। সেই সময়টায় ওই লেখাটা লিখেছিলাম। ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করে ল্য মদ ছাপিয়েছে।
বললাম, তা ছাড়া পরে যে লেখাটা লিখেছি, যেটা আপনি কিছু লাইন কাটলেন, সেখানে তো সবাইকে আমি ধন্যবাদই জানিয়েছি।
–হ্যাঁ। সেটা পরের লেখা। ছাপা হওয়াটা আগের লেখা।
বুঝলেন শঙ্খ ঘোষ।
শঙ্খ ঘোষ বারবার বোঝাতে চাইছেন অনেকে আছেন আমার সঙ্গে। বলেছিলেন ভ’বাবুকে বলবেন আমাকে যেন কলকাতায় ফেরত পাঠান। ভ’বাবুকে অবশ্য এখনও তাঁর সেই জরুরি ফোনটা করা হয়নি। তিনি কি সত্যিই পাশে আছেন! যখন অভিযোগ করা হচ্ছে আমি মুসলিম বিরোধী, তিনি চুপচাপ শুনছেন। কোনোদিন তো প্রতিবাদ করেননি, বলেননি সেই ঘটনাটির কথা, বছর কয়েক আগে আমি যে তাঁর হাতে দশ হাজার টাকা দিয়েছিলাম গুজরাতের দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত মুসলমানদের জন্য সাহায্য করতে। টাকা সংগ্রহ করার ভার ছিল তাঁর। আমি ফলাও করে প্রচার চাইনি কিন্তু মিথ্যে অভিযোগে যখন আমাকে দেশ থেকে তাড়ানো হচ্ছে, তখন তো বলা যেত।
শঙ্খ ঘোষ যে সাহায্যটি করলেন, তা হল, আমার যে লেখাটা পড়া হবে অনুষ্ঠানে বা ছাপা হবে পত্রিকায়, সেটি সংশোধন করে দিলেন, মৌলবাদী মুসলমানদের আঘাত করতে পারে, বা সরকার ক্ষুব্ধ হতে পারেন এমন কোনো শব্দ বা বাক্যের অস্তিত্ব যেন না থাকে। এসবের আঁচ যেখানে পেয়েছেন, সেখানে কেটে বাদ দিয়েছেন বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। বাদ দেওয়াটুকুই হয়েছে, তসলিমাকে কলকাতায় ফেরানোর ওই অনুষ্ঠানে তিনি কথা দিয়েও উপস্থিত থাকতে পারেননি। অন্য কাজ ছিল তাঁর।
কবে আমাদের বড় লেখক কবিরা ব্যানে এবং সেন্সরশিপে অগাধ বিশ্বাস থেকে নিজেদের মুক্ত করবেন, জানিনা।
আজ বিকেলে হাঁটছিলাম ছাদটায়, আকাশে কয়েকটা তারা শুধু। হাঁটছিলাম আর কথা বলছিলাম প্রভুর সঙ্গে। প্রভু এবং তাঁর বাহিনী নিজেদের অফিসের কাজ ফেলে আমার পেছনে সময় দিয়ে যাচ্ছে। আমি চাই না আমার জন্য কারও কোনও ক্ষতি হোক। কিন্তু ক্ষতি তো সরকারের হচ্ছে। সরকারি কাজ ফেলে আমাকে পাহারা দেওয়া বা সঙ্গ দেওয়া তো দিনের পর দিন চলতে পারে না। আমি ভালোবেসে এ দেশে থাকতে চাই। কারও কোনও অনিষ্ট হোক চাই না। কেবল চাই অবসান হোক এই অবস্থার। একসময় হঠাৎ প্রভু জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কলকাতার বাড়িটা ছেড়ে দেননি?
–না।
–শুধু শুধু টাকা খরচ হচ্ছে না? ভাড়া লাগছে।
–হ্যাঁ তা লাগছে।
–কত টাকা যেন ভাড়া?
–কুড়ি। আর মেইনটেনেন্স আড়াইহাজার।
–এত টাকা প্রতিমাসে দিয়ে যাচ্ছেন?
–কী আর করবো! আমার পাবলিশারকে বলেছি ভাড়া দিয়ে যেতে। রয়ালটি থেকে কেটে রাখবেন।
–ছেড়ে দিতে পারেন ফ্ল্যাটটা।
–ছেড়ে নতুন একটা ফ্ল্যাট নেওয়া যেত। কিন্তু কে বাড়ি বদলাবে আমি ছাড়া। বাড়ি তো আমার গিয়ে দেখতে হবে। একটু কমের মধ্যে যদি একটা ফ্ল্যাট পাই, ভালো।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে প্রভু আবার কথা শুরু করেন।
–পুরস্কার আনতে ফ্রান্সে যাবেন না?
আমি বললাম, ওটা তো হয়ে গেছে। অনুষ্ঠান হয়ে গেছে। আমার ফরাসি প্রকাশক আমার পক্ষ থেকে পুরস্কার নিয়েছেন।
–অনুষ্ঠান হয়ে গেছে?
–হ্যাঁ হয়ে গেছে।
–কবে?
–এই তো ন’ তারিখে।
–তো পুরস্কারের জিনিসগুলো আনতে তো আপনাকে প্যারিসে যেতে হবে? তাই না?
–না। সার্টিফিকেট আর টাকাই তো। সার্টিফিকেট পাঠিয়ে দেবে কুরিয়ার করে। টাকা পাঠিয়ে দেবে আমার ব্যাংকে।
–সুয়েনসন কী বলে?
–কী ব্যাপারে?
–ফোন করে না?
–তা করে।
–বলে না কিছু?
–কী বলবে?
–আপনাকে সুইডেনে যেতে বলে না?
–কোথায়?
–সুইডেনে?
–কেন বলবে?
–দেখে গেল আপনার মানসিক অবস্থা। খুব খারাপ আছেন। এসব দেখে কি আপনাকে এখান থেকে নিয়ে যেতে চাইছে না?
–না।
–বলছেন কী।
–চাইবে কেন, সে তো জানে এই দেশে থাকতে আমি পছন্দ করি। এ দেশেই আমি থাকতে চাই। সে তো জানে যে আমি বিদেশে থাকতে চাই না। বিদেশে থাকা আমি পছন্দ করি না। আর ওদেশে আমি যাবোই বা কেন, কী করবো ওখানে গিয়ে? এখানে এখন না হয় স্বাধীনতা নেই আমার, কিন্তু এভাবে তো বেশিদিন থাকবো না। এসবের তো শেষ হবে একদিন।
বুঝি। হাড়ে হাড়ে একটা জিনিস বুঝি। প্রভুকে বলা হয়েছে আমার ভেতরের কথা জানতে। কী ভাবছি। বিদেশে চলে যাবার কথা ভাবছি কি না। না ভাবলে কেন ভাবছি না। আমাকে ভাববার জন্য বলা হচ্ছে। আমাকে ভাবনাটা দিচ্ছেন প্রভু। আমি বুঝি না, দেশ ছাড়ার কোনও ভাবনা আমার মাথায় কেন আসে না!
আরেকদিন একজন অফিসার হঠাৎ বলেছিল, ‘ফ্রিডম তো আসল। জীবনে স্বাধীনতাই যদি না থাকলে তাহলে আর কী। কেন তুমি চলে যাচ্ছো না, কী দরকার এভাবে বন্দি থেকে?’
