আমি চমকে গিয়েছিলাম সেদিন ওর কথা শুনেও।
আমাকে ভাঙতে চাইছে ওরা। ওদের কি কেউ দায়িত্ব দিয়েছে আমাকে ভাঙতে? নাকি এমনিতে কথায় কথায় বলছে ওরা। কিছু বুঝতে পারি না।
কিন্তু যদি না ভাঙি? ওরা কি কিছু ভেবেছে, যদি না ভাঙি, তাহলে কী করবে ওরা?
যে করেই হোক ভাঙার ব্যবস্থা করবে? ভয় পাওয়া আমার উচিত নয়, তারপরও অন্ধকার কেঁপে আসার মতো ভয় আসে কেঁপে।
.
১৫ জানুয়ারি
দিন গুলো কি যাচ্ছে, নাকি যাচ্ছে না? আমার এখানে ক্যালেন্ডার নেই। সকালের খবরের কাগজগুলোয় দেখি দিন যাচ্ছে। প্রভু দাঁতের অবস্থা জানার জন্য ফোন করেছিলেন। আমি কোনও খবর আছে কি না জানতে চেয়েছি। খবর বলতে যা শুনতে চেয়েছি, কর্তারা আমার কলকাতা ফেরত যাওয়ার ব্যাপারে কিছু বলছেন কি না। না খবর নেই, প্রভুর যান্ত্রিক স্বর।
ভালো বা মন্দ যে কোনও একটি খবরই আমি জানতে চাই। এভাবে বাঁচতে কেউ পারে না। স্বাধীনতার জন্য সারাজীবন লড়াই করার পর আমাকে শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে, পরাধীনতার শাস্তি। একশ’ কোটিরও বেশি লোক এ দেশে। এই দেশে একজন লেখককে কোথাও আটকে রাখা হয়েছে। দিনের পর দিন যাচ্ছে। কেন আমি কলকাতায় ফিরতে পারবো না, তার কোনও তো কারণ নেই। আমার বাড়ি থেকে আমাকে তুলে এনে অন্য একটা শহরে একটা ঘরে বন্দি করে রাখা হয়েছে। এ ঘটছে ভারতবর্ষে। মাঝে মাঝে আমি বিশ্বাস করতে পারি না।
আগে যারা ফোন করতো, তাদের অনেকেই এখন আর ফোন করে না। সম্ভবত আমি এখন সরকারি খাতায় বাতিলের তালিকায় বলে। বাতিলের খাতায় নাম উঠলে বা কালো তালিকাভুক্ত হলে যথাসম্ভব এড়িয়ে চলাটাই মঙ্গল বলে বেশির ভাগ লোকে জানে।
মানস ঘোষের পত্রিকায় খুব ছোট করে কালকের ধর্মমুক্ত মানববাদী মঞ্চের খবরটা ছাপা হয়েছে। অগ্রিম খবর দেওয়াই হয়নি যে মুসলমান সমাজের প্রগতিশীল বিজ্ঞানমনস্ক মানুষেরা একত্র হচ্ছেন তসলিমাকে কলকাতায় ফিরিয়ে আনার জন্য। কথা নাকি ছিল দেওয়া হবে। আর, অনুষ্ঠান হয়ে যাবার পর এই এতটুকু সংবাদ। অথচ ফিরিয়ে আনার প্রথম র্যালির খবর ছিল বিরাট করে প্রথম পাতায়। মানস ঘোষও কি দুরে সরে যাচ্ছেন? কাছের মানুষগুলো, আপন মানুষগুলো কেন যে দূরে সরে যায়! আনন্দবাজার তো অনেক আগেই দূরে সরে গেছে। অন্যান্য পত্রিকার চরিত্র বোঝা দায়। একমাত্র দৈনিক স্টেটসম্যানই ছিল পাশে। নতুন পত্রিকা। তারপরও খুব দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছিল।
দুপুরে ঘুমোলাম। আজকাল ঘুমোলেই দুঃস্বপ্ন এসে ঘুম নষ্ট করে দেয়। ভীষণ একা লাগে। বাবা মার কথা খুব মনে পড়ে। মনে পড়ে আর একা লাগে। এত একা বোধহয় আমার কখনও লাগেনি আগে।
কাল ফকরুল মামা ফোন করেছিল। কী রকম যেন লাগে এমন ফোনে। সেই যে কবে কলকাতায় সাত কী আট বছর আগে দেখা হয়েছিল। তারপর আর কোনও যোগাযোগ নেই। আর দেখা নেই। কাল ফোন। আমি কোথায় আছি জিজ্ঞেস করলো। বুক হু হু করে ওঠে। এরাই তো আমার আত্মীয়। আমি কি ওদের ভুলে থাকি নাকি ওরা আমাকে ভুলে থাকে? আমি তো চাই সবাইকে নিয়ে এক শহরে থাকতে। আমি তো চাই সবার সুখে দুঃখে কাছাকাছি থাকতে। চাই ভালোবাসা পেতে। ভালোবাসা দিতে।
পারি না।
.
১৬ জানুয়ারি
আজ সকালে কলকাতা থেকে ফোন এল। দৈনিক স্টেটসম্যানে আমাকে নিয়ে শাঁওলি মিত্র আর ভবানীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন। গিল্ডের খবর আছে, মিল্লি ইত্তেহাদ পরিষদ যে গিল্ডকে চিঠি পাঠিয়েছে আমার বই যেন না থাকে, থাকলে মেলায় গন্ডগোল হবে, সেই চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছেন গিল্ডের কর্তারা আমার প্রকাশকদের কাছে। ভালো উত্তর দিয়েছেন শিবানী মুখোপাধ্যায়, বলেছেন, আমরা বই নেব, ব্যস। আনন্দ পাবলিশার্স থেকে সুবীর মিত্র বলেছেন, বই মেলার দেরি আছে, এখনও ভাবার সময় আছে। বই থাকাই তো স্বাভাবিক। অনিমা বলেছেন গাঙচিল থেকে, আমরা যে বই ছাপিয়েছি সে বইয়ে ধর্ম বিষয়ে কোনও কথা নেই।
সকালে মানস ঘোষকে ফোন করলাম। কথা বলতে বলতে গলা বুজে আসে। এরপর দেখি চোখ বেয়ে জল গড়াচ্ছে। মুছে ফেলছি হাতে, আবার ভিজে যাচ্ছি।
প্রশান্ত রায়ের সঙ্গে কথা হল, ওই গিল্ডের ব্যাপার নিয়েই। গিল্ডের কাছে চিঠি, গিল্ড নিজে সামলাবে এসব সমস্যা, তা নয়, চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছে প্রকাশকের কাছে, যেন প্রকাশকের দায়িত্ব এটি।
শাঁওলি মিত্র জিজ্ঞেস করেছেন, আমাকে কেন আটকে রাখা হয়েছে, আমি কি গণহত্যাকারীদের চেয়েও ক্ষতিকর। ভবানীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, যেভাবে লিখছি আমি, সেভাবে লেখায় কাজ হবে না। আমাকে মুসলিম সমাজের অশিক্ষিত লোকদের কাছে গিয়ে গিয়ে বোঝাতে হবে। বিদ্যাসাগরকে লোকে মানতেন কারণ তিনি হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে সরাসরি কোনও বাজে কথা বলেননি।
কিন্তু আমার প্রশ্ন, ওভাবেই কি করতে হবে সমাজের পরিবর্তন। বছর তো গেছে অনেক। নিয়ম কি বদলাবে না! বা আমি যদি অন্যের নিয়মের বাইরে বেরিয়ে নিজের নিয়মে কাজ করি। গ্রামে গ্রামে হেঁটে হেঁটে কাউকে না বুঝিয়ে শুধু যদি লিখি, যা আমি সবচেয়ে ভালো পারি! এ কী দোষ? লেখাটা?
সুদীপমৈত্র সংস্কার কুসংস্কার নিয়ে প্রতি বুধবারে নিয়মিত লেখেন। অসাধারণ লেখা। এবার মৌলবাদ আর ধর্মবিশ্বাস নিয়ে লিখেছেন। ‘ধর্মবিশ্বাস ঠিক আছে, মৌলবাদটা ঠিক নেই’ –এই বহু পুরোনো ধারণার সমালোচনা, যেটা আমার লেখায় বারবার খন্ডন করেছি। নিজে তো আজ বন্দি হয়ে আছি। আমার লেখা, আমার ভাবনা আমার বিশ্বাসও বন্দি। আমার আদর্শের কথা যদি কোথাও দেখি কেউ লিখছে, ভালো লাগে বড়। আজ দৈনিক স্টেটসম্যানে ফোন করে সুদীপকে অভিনন্দন জানালাম। সুদীপ খুব খুশি হল। ওর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়নি কখনও। বন্ধুত্ব তো দূরের কথা। একটু আফশোস হয়, কলকাতায় অনেক ভুল মানুষের সঙ্গে ওঠাবসা করেছি। খাঁটি মানুষগুলোই রয়ে গেছে। দূরে। কলকাতায় যাবার পর জীবনটাই পাল্টে ফেলবো, সিদ্ধান্ত নিই।
