এসব কথা আগেও হয়েছে। হিন্দুরা, বা হিন্দু বংশোদ্ভূত অতি সৎ ও সাহসী সেকুলাররা লিখেছেন। মুসলমানরা লেখেন না এভাবে। গিয়াসুদ্দিন আপাদমস্তক নাস্তিক বলেই লিখতে পেরেছেন। তবে ভারতবর্ষে মুসলমান পরিবারে জন্মে নাস্তিক হওয়ার চল খুব বেশি নেই। গিয়াসউদ্দিনের মতো আরও কয়েকজনকে আমি একসময় আবিষ্কার করে একত্র করেছিলাম। ধর্মমুক্ত মানববাদী মঞ্চ গড়ে তুলেছিলাম। যেন মুসলমানদের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা, ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কারমুক্ত মানসিকতা গড়ে ওঠে। ধর্মীয় সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ, এবং ধর্মমুক্ত শিক্ষার দাবি, নারীর সমানাধিকার, মানবাধিকার ইত্যাদি দাবি নিয়েই গড়া হয়েছিল মানববাদী মঞ্চ।
গিয়াসউদ্দিনকে ফোনে ধন্যবাদ জানাই। কাল ওদের প্রেস কনফারেন্স। কলকাতায়।
আজ মন ভালো করা আরও একটা খবর আছে। হিন্দুস্থান টাইমসে করন থাপর খুব ভালো লিখেছেন। লিখেছেন প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সি, ভারতের তথ্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী যে আমাকে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইতে বললেন মুসলমানদের কাছে, যেহেতু তাদের অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছি, মূলত সেটার সমালোচনা করেই লেখা। থাপর বলছেন, কারা তারা, যাদের অনুভূতিতে মোটেও আঘাত দেওয়া যাবে না? কারা তারা, যাদের সামনে তসলিমাকে নত হতে হবে এবং করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে? নিশ্চয়ই তারা আমরা নই, আমি নই, আপনি নন, কোনও উদার সহনশীল মানুষ নন, কোনও যুক্তিবাদী, মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী মানুষ নন, শিক্ষিত, সচেতন কেউ নন, তারা সংকীর্ণ, স্বার্থান্ধ, ধর্মান্ধ, মোল্লাশ্রেণী। আমাদের স্বাধীনতার সীমানা কি তারা মেপে দেবে? এ দেশে কী মানা যাবে এবং কী যাবে না তার নিয়ম তৈরি করার দায়িত্ব তাদের কে দিয়েছে?
I have to assert that when Mr. Mukherjee says Taslima Nasreen must not say, do or write things that”hurt the sentiments of our people”, I do not recognise the pronoun ‘our’. Am I part of it? Are you? Is he? Or does he only have in mind a small but vocal and violent minority –perhaps disowned by, or at least, em barrassing to the majority of their co-religionists –who, he believes, delivers votes?
We don’t expect very much of our politicians –if there is one lesson experi ence has taught us, it must be this –but, at the very least, they should stand up for our freedoms. Otherwise, they could soon be tolling the bell for them selves. Let them remember what they deny Taslima or us today; they could end up losing themselves tomorrow.
প্রভু, যিনি আমার স্বাধীনতার বাহন নিয়ে আসেন এখানে, তিনি এলেন। কী, আমাকে দাঁতের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবেন। কোথাও যাবার প্রস্তাব এলে আমি লাফিয়ে উঠি। কিছুক্ষণের জন্য হলেও বেরোনো তো যাবে এই বন্দিত্ব থেকে। সে যে উদ্দেশে হোক না কেন।
গাড়ি চলতে শুরু করলো। নতুন পথ। চারদিক দেখতে দেখতে যাই। এ অনেকটা প্রিজন ভ্যানে করে কোথাও যাবার মতো। কালো কাঁচ জানালাটা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকি। বাইরে জীবন। মানুষ যারা যাচ্ছে নিজের কাজে, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, কার কী দায় পড়েছে আমাকে চেনার, আমাকে নিয়ে ভাবার, আমাকে মারার! কারও না। গাড়িতে তো নিরাপত্তা রক্ষী নেই। গাড়ির সামনের কাঁচ দিয়ে রাস্তার লোকে আমাকে দেখছে, তাতে হয়েছেটা কী? কারও কিছু যায় আসে না। যে চেনে, সে চেনে। যে চেনে না, সে চেনে না। তবে কেন বন্দি করা আমাকে?
আমি বেরোলে নাকি দেশের দশটা লোক মরে যাবে। এই প্রশ্নের উত্তর তারা যা দেন, আমি তা মানি না। ওই উত্তরের কোনও যুক্তি নেই।
আমার আনন্দ হয় নতুন রাস্তা দেখে, তার মানে আমাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ডেন্টিস্টের ক্লিনিকে। প্রভুকে কিছু জিজ্ঞেস করি না। কিন্তু যখন একটা গলিতে ঢোকে গাড়ি, চুপসে যাই, এ তো সেই গলি। সেই চেনা গলি। সেই ভুতুড়ে নিরাপদ বাড়ি’র গলি। সেই একই বাড়িতে আনা হল আমাকে, যে বাড়িতে কেউ বাস করে না। উঁচু দেয়াল ঘেরা বাড়ি। উঁচু লোহার গেটওয়ালা বাড়ি। বাড়িটিতে চা বিস্কুট দেওয়ার জন্য লোক আছে, এ লোক আমার বিশ্বাস, খবর পেয়ে বাড়িতে আসে।
মাঠটায় হাঁটি। ওই মাঠটুকুই আমার স্বাধীনতা। গন্ডি যখন কমে আসে মানুষের, এক টুকরো জায়গাই কী বিশাল বলে মনে হয়।
ডেন্টিস্ট আসেন। ছোট পুঁটলিতে করে দাঁত দেখার জিনিসপত্র নিয়ে এসেছেন। কী হত, যদি তার ক্লিনিকে যেতাম? ওষুধপত্র লিখে দিলেন। ফেরার পথে রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে ওষুধপত্র কিনে প্রভু আমাকে রেখে চলে গেলেন। কারাগারটিতে রেখে গেলেন।
বাকি সময় আমার পেরোলো। যে কোনও দিনের মতোই। যে কোনও রাতের মতোই।
.
১৪ জানুয়ারি
আজ কলকাতায় মুসলমানদের প্রেস কনফারেন্স হচ্ছে। প্রগতিশীল মুসলমান অথবা প্রাক্তন মুসলমান অথবা মুসলমান সম্প্রদায়ের মুসলমান নামের ধর্মহীন মানুষেরা প্রেস কনফারেন্সে বলবেন, যে, তসলিমাকে তারা ফেরত চান কলকাতায়। মুসলমান সমাজের উন্নতির জন্যই তসলিমাকে তাঁদের প্রয়োজন।
না। আজ বিশেষ কিছু ঘটলো না। পিটিআইএর সুপ্রতীককে সিমোন দ্য বোভোয়া পুরস্কারের কথা বলাতে আজ দ্য হিন্দু আর হিন্দুস্থান টাইমসসহ কিছু কাগজে দেখলাম খবরটা। যে লেখালেখির জন্য ফ্রান্সে আমাকে পুরস্কৃত করা হচ্ছে, সেই একই লেখালেখির জন্য বাংলাদেশে আর ভারতে আমাকে অপমানিত করা হল। এ ছাড়া বলার আমার কিছু নেই।
