আমার কোনও দ্বিধা নেই বলতে, যে–আমি খুব বেশি কোনও সাহিত্যিক বা সাংস্কৃতিক পরিবেশ পাইনি। ব্রাত্য ছিলাম নাকি সেলিব্রিটি ছিলাম! দুটোতে মাঝে মাঝে তফাৎ খুব একটা থাকে না।
সুবিধে লুটতে অনেকে আসতো। রঞ্জন সেনগুপ্ত নামে এক বয়স্ক লোক হঠাৎ বন্ধু সেজে উদয় হল। ছলে কৌশলে কেবল টাকা নিত। দুদিন বাদে ফেরত দেবে বলে একবার বিরাশি হাজার টাকা ধার নিয়ে আর ফেরত দেয়নি।
কাজের লোক নিয়েও ভুগেছি কম নয়। এমন বন্ধু কেউ ছিল না যে একজন বিশ্বস্ত কাউকে দেবে ঘরের কাজকর্মে আমাকে সাহায্য করার জন্য। বিশ্বাস করে যাকেই ঘরে ঢুকিয়েছি, সেই বিশ্বাস ভেঙেছে।
দুই.
আমাকে নজরবন্দি করার জন্য বা আমাকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য, বা আমাকে সাহায্য করার জন্য যে দুজন লোক থাকে, যদিও ওরা বলে যে আমার কাছে ওরা আসছে আমাকে দেশ থেকে তাড়াবার কোনও উদ্দেশ্য নিয়ে নয়, আমার মনে হয় ওরা বোধহয় সত্য বলছে না, ওরা জানে সবকিছু, ওরা কায়দা করে আমার ভেতরের খবর নেয়–কিছু ভাবছি কি না, ভাবলে কী ভাবছি, চলে যাওয়ার চিন্তা মাথায় আসছে কি না। হঠাৎ কেউ কেউ তো বলেই, ‘তারচেয়ে বিদেশই ভালো। যে দেশে ফ্রিডম আছে, সে দেশই তো ভালো। মাঝে মাঝে না হয় বেড়াতে এলে ভারতে। ওরা কি এই কথা শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে বলে, বন্ধু ভেবে বলে, না কি ওপরওয়ালারা শিখিয়ে দিয়েছে বলতে, তাই বলে! আমি বুঝে পাই না। আমার বোধহয় খুব সন্দেহ-মন, অথবা পরিস্থিতি আমাকে সন্দেহপ্রবণ করেছে। অথবা চারপাশে যা চলছে, তা আরও অনেক গভীর জলের খেলা। আমি শুধু ওপর থেকে দেখছি এবং বিচার করছি। আমি আস্ত একটা বোকা।
সারাদিন লেখার চেষ্টার সঙ্গে লিখতে পারা এবং না পারা মিলিয়ে দিলে যা হয়, হয়েছে। সারাদিন আরও কিছু ঘটেছে। কিছু ছেলেমেয়ে আমাকে কলকাতায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সই সংগ্রহ করতে বেরিয়েছে কলকাতায়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সই দিলেন, তবে বললেন, ‘যেরকম প্রচার করা হচ্ছে ওর ব্যাপারে, যে, দিল্লিতে ওকে নিজের মতো থাকতে দিচ্ছে না, তা কিন্তু ঠিক নয়। ও কিন্তু খুব ভালো আছে। মৃণাল সেনএর কাছেও গিয়েছিল ওরা। মৃণাল সেন এমনকী ফোনে আমার সঙ্গে কথাও বললেন। আমি কেমন আছি শুনে তিনি বললেন, এ কী, এ তো কল্পনা করা যায় না। কিন্তু সই দেননি। ওদেরকে বলেছেন, ‘লেখাটা কড়া হয়ে গেছে, আরেকটু নরম করে লিখে নিয়ে এসো, সই দেব।
ওরা যখন বললো যে আপনিই নরম করে লিখে সই করে দিন। তখন তিনি নিজে লেখার বদলে মনসিজ মজুমদারকে ফোনে বললেন, নরম করে লিখে দিতে।
সই দিয়েছেন বিজয়া মুখোপাধ্যায়, তবে নাকি কিছু কথা শুনিয়ে, অ্যাপোয়েন্টমেন্ট না করে গেছে কেন, ইতাদি। শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় ঘুমোচ্ছিলেন, সই দিতে পারেননি। বাংলার কবিদের মধ্য থেকে সততা দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু শরৎএর মধ্যে এখনও অবশিষ্ট আছে। এখনও তিনি দিব্যি তসলিমার মতো নিষিদ্ধ লেখককে নিয়ে খচখচ করে দুটো তিনটে কবিতা লিখে চমকে দিতে পারেন লোকদের। দিব্যেন্দু পালিত সই দিয়েছেন, তবে বলেছেন, ‘এসব সরকারের ব্যাপার, সই দেওয়ার কোনও অর্থ হয় না।
কী হয় সইয়ে? এর আগে দু’জন ছেলে, আমার সঙ্গে পরিচয় নেই, শুনেছি, পত্রিকায় পড়েছি, রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমাকে কলকাতায় ফিরিয়ে আনার দাবিতে সই সংগ্রহ করেছিলো। ছ’হাজার সই দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্টের কাছে পাঠিয়েছিল। কোথায় ওই সইওয়ালা কাগজগুলো? নিশ্চয়ই ময়লা ফেলার বাক্সে।
.
১৩ জানুয়ারি
সকালে এনামুল কবীর পড়ে শোনালেন কলকাতা থেকে আজকের কাগজে লেখা গিয়াসুদ্দিনের একটা লেখা। এনামুল কবীর প্রায় প্রতিদিনই এ কাজটি করছেন। তসলিমা, আপনার অপরাধ আপনি মুসলিম পিতামাতার সন্তান। গিয়াসুদ্দিন অকপটে জানাচ্ছেন, পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু মৌলবাদীরা ছাড়া মুসলিম মৌলবাদীদের সবাই ভয় পায়। মহান নেতা নেত্রী বুদ্ধিজীবী লেখক শিল্পী সাহিত্যিক সবাই। মুসলমানদের মধ্যে যারা গোঁড়া নয়, তারা ভয়ে কাঠ হয়ে থাকে। আর, অমুসলমান আর অসাম্প্রদায়িক যারা, তাদের ভয়, পাছে যদি ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তিতে দাগ লেগে যায়। হিন্দু মৌলবাদীদের দ্বারা যারা আক্রান্ত, তাদের পাশে বিদ্বজ্জনেরা দাঁড়ান, কিন্তু মুসলিম মৌলবাদীদের দ্বারা আক্রান্তদের পাশে দাঁড়ান না।
গিয়াসউদ্দিন বলছেন, রাজনীতিকদের এই প্রশ্নটা তিনি করছেন না। কারণ ওরা ক্ষমতার দাস, মোল্লা তোষণ ওদের ধর্ম। প্রশ্নটা লেখক শিল্পী সাহিত্যিক বিদ্বজ্জনের কাছে। যাঁরা হিন্দু মৌলবাদী দ্বারা আক্রান্ত সংখ্যালঘুর পাশে দাঁড়ান, তাঁরা মুসলিম মৌলবাদীর হাতে আক্রান্ত কারও পাশে, বিশেষ করে সে যদি মুসলমান পরিবার থেকে আসে, দাঁড়াতে পারেন না কেন? উত্তর তিনিই দিয়েছেন। উত্তর হল, মুসলিম মৌলবাদীদেরকে ভয়। আর, তারা ভাবেন, যারা আক্রান্ত এবং আক্রমণকারী তারা উভয়ে মুসলমান, সুতরাং ওসব মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার।
গিয়াসউদ্দিন বলছেন, তসলিমা, আপনার প্রশ্ন কী দোষে আপনাকে শাস্তি পেতে হচ্ছে? আপনার বিরুদ্ধে যে দোষগুলোর কথা বলা হচ্ছে, তা সব আরোপিত, সব মনগড়া, সব অযৌক্তিক। আসলে দোষ আপনার একটাই, আপনার জন্ম মুসলিম পরিবারে। মুসলিম পরিবারে জন্মালে যুক্তিবাদী হওয়া যায় না, নারীবাদী হওয়া যায় না, মানববাদী হওয়া যায় না, প্রতিবাদী হওয়া যায় না। আপনি এসবই হয়েছেন, তাই মোল্লা মুফতিরা আপনাকে ক্ষমা করবে না। কোরান হাদিস আপনাকে ক্ষমা করতে বলেনি। আর মোল্লারা যাকে শত্রু ঘোষণা করে, আমাদের বিদ্বজ্জনেরা তাদের পাশে দাঁড়ায় না। আমাদের বিদ্বজ্জনেরা যে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’, আপনার পাশে দাঁড়িয়ে কেন তারা সাম্প্রদায়িক হতে যাবেন?
