৪.৪৫ বালিশে গড়িয়ে পড়তে থাকে চোখের জল।
৪.৪৬ আমার ভারী নিশ্বাসের শব্দ শুধু। চারদিকে আর কোনও শব্দ নেই। কবরের নিস্তব্ধতা চারদিকে। চোখের জল পড়ার কোনও শব্দ হয় না। ও নিঃশব্দে পড়ে।
৪.৪৮ বিছানা ছেড়ে উঠি। বিছানার এক পা দূরেই ছোট একটা টেবিলের ওপর আমার ল্যাপটপ। ল্যাপটপ চালু করি। এই ল্যাপটপটিই নিয়ে বেরিয়েছিলাম, যখন বেরিয়েছিলাম। দুদিনের জন্য যেতে বলেছিল, কোথায় নাকি কোন রিসর্ট আছে, থেকে রোববার কী সোমবার ফিরে আসবো। এখনও ভাবলে কেমন গা ছমছম করে। আমাকে। তাড়াবার জন্য কী ভীষণ ফাঁদ পেতেছিলো ওরা।
৪.৫০ গুগলে খবরগুলো দেখি। মেরিনিউজ ডট কমের একটি খবর পেয়ে খুব মন খারাপ হয়ে যায়। লেখক বলছেন আমি সরকারের বিরুদ্ধে নালিশ করছি। বলেছি আমি নাকি গৃহবন্দি অবস্থায় আছি। আমি নাকি এখানে সুখে নেই। কত বড় স্পর্ধা আমার যে সুখ চাইছি। দাবির শেষ নেই আমার। কত টাকা খরচ হচ্ছে আমার পেছনে, অথচ সাত হাজার কী দশ হাজার মেয়ে আজ দিল্লির রাস্তায় গৃহহীন পড়ে আছে।
লেখাটা আমাকে চুপসে দেয়। আমি কি ইচ্ছে করে এখানে এসেছি? সরকারের টাকায় খাওয়া দাওয়ার ইচ্ছে কি আমার ছিল, নাকি আছে? আমি তো নিজের পয়সায় থাকি এ দেশে। কেউ আমাকে দুটো পয়সা দিয়ে সাহায্য করে না। বরং আমিই দিই। দরিদ্রকে যখনই যেভাবে পারি সাহায্য করি। এখানে গৃহবন্দি আমাকে করতে বলেছে কে? একটা জিনিসই আমি প্রাণপণে চাই, সে হল মুক্তি। স্বাধীনতা এবং স্বনির্ভরতা ফিরে পেতে চাই, যে দুটো পেতে জীবনভর কঠিন সংগ্রাম করছি।
৪.৫০ দীর্ঘশ্বাস। দীর্ঘশ্বাস। দীর্ঘশ্বাস।
৫.০০ ইমেইলগুলো পড়ি। একটা ইমেইল প্যারিস থেকে। আমি সেই পুরস্কারটি কালই পেয়ে গেছি। সিমোন দ্য বোভোয়া’র জন্মশতবার্ষিকীতে পুরস্কারটি দেওয়া হল। সিমোন দ্য বোভোয়া পুরস্কার। খুব বড় বড় দার্শনিক, লেখকেরা ছিলেন, কেট মিলেটও ছিলেন জুরি হিসেবে।
৫.২০ একটা ভালো লাগা আমাকে ছুঁয়ে থাকে। আমি কল্পনা করে নিতে পারি প্যারিসের কোনও বড় অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠান ঠিক কেমন হতে পারে, ওরকম অনেক অনুষ্ঠানে আমি কথা বলেছি। হাজার হাজার শিক্ষিত, সচেতন, বুদ্ধিজীবী, লেখক, শিল্পী, দার্শনিকের সামনে আমি বক্তৃতা দিয়েছি। ওই দূর দেশের সমর্থন আমার কাছে কী রকম যেন এখন রূপকথার মতো লাগে তবু। এই বন্দি জীবনে সুদূরের সমর্থন আমাকে মুক্তির কোনও গল্প শোনাতে পারে না।
.
১২ জানুয়ারি
এক.
মাঝে মাঝে ভাবি কলকাতায় থাকার জন্য এত পাগল কেন আমি? কলকাতা আমাকে কী দিয়েছে? আমার কি খুব সামাজিক জীবন ছিল কলকাতায়। দিনের পর দিন কি আমি একাকীত্বে ভুগিনি? কোনও সাহিত্যিক আজ্ঞা কি হত আমার বাড়িতে? না। চারদিকে অনুষ্ঠান, চারদিকে উৎসব লেগেই থাকতো কলকাতায়। কোথাও কি খুব ডাক পড়তে আমার! মাঝে মাঝে রঞ্জন হয়তো কোথাও যেতে বলতো, তাও তার যদি অকস্মাৎ কোনও কারণে আমার কথা মনে পড়তো, অথবা কেউ যদি তাকে বলতো আমাকে ডাকার জন্য। যে হাতে গোনা ক’দিন আমি গিয়েছি সন্ধের পার্টিতে, আমার ভালো লাগেনি। মদ খেতে পছন্দ করলে, অথবা সাজগোজের অভ্যেস থাকলে হয়তো ওসব খুব পছন্দ হত, কিন্তু ওসব পছন্দ করার অন্তত আমার কোনও কারণ ছিল না। ভালো লাগার মধ্যে কিছু মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়া। কিছু মানুষের সঙ্গে দু চারটে কথা বলা। যে কোনও কথাই তো আমার মনে ধরে না। বুদ্ধিদীপ্ত কথা খুব শুনিনি। যশ খ্যাতির পেছনে দেখেছি লোকে পড়ি কী মরি দৌড়োয়।
কলকাতায় বাস শুরু করার বছরখানিক পর থেকেই লক্ষ্য করেছি আমাকে এড়িয়ে চলেছে আনন্দবাজার। বড়লোকের খেয়াল। নারীর কোনও দেশ নেই’ পান্ডুলিপি আনন্দ পাবলিশার্সে দেওয়ার পরও ছাপাবে না বলে ফেরত দিয়ে দিয়েছে। আমার খবর হয়তো মাঝে সাঝে ছাপায়, যেহেতু ওগুলো খবর। কিন্তু লেখক হিসেবে নামটা মুছে দিয়েছে। দু’দুবার আনন্দ পুরস্কার দেওয়ার পরও। দুঃখ করা ছাড়া আমার কিছু করার নেই। দৈনিক স্টেটসম্যান-এ প্রতি বুধবারে লিখতাম। নিয়মিত কোথাও লিখতে পেরে অনেকটা দুঃখ ঘুচেছিল বটে। সামাজিক জীবন বলতে সত্যি কিছু ছিল না। হাতে গোনা ক’জন বন্ধু বাড়ি আসতো। তারা বেশির ভাগই সাহিত্যশিল্প জগতের বাইরের লোক। ওই জগতের যাদের সঙ্গেই যোগাযোগ ছিল, ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে গিয়েছিল সেটা। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমার বই নিষিদ্ধ করার জন্য সরকারকে আবেদন করার পর থেকে এবং সরকার সে আবেদন রক্ষা করার পর থেকে সুনীল এবং সুনীলের শিল্পী সাহিত্যিক বন্ধু ও শিষ্য এবং সরকারের ঘনিষ্ঠ শিল্পী সাহিত্যিক শিষ্য সবাই আমাকে তাদের শত্রু জ্ঞান করাটাকেই রাজনৈতিক এবং সামাজিকভাবে যৌক্তিক বলে মনে করেছেন এবং আমার থেকে দূরে থেকেছেন। যদিও আমি অসম্ভব আন্তরিক, এবং প্রাণবন্ত একজন মানুষ, এই আমাকেই নিঃসঙ্গ জীবন কাটাতে হয়েছে কলকাতায়, মাসের পর মাস। তাহলে কী আছে কলকাতায়? কেবল কি ভাষাটার জন্য? কেবল কি মাঝে মাঝে ওই দু’একজন বাঙালির সঙ্গে বাংলায় কথা বলার জন্য? মাঝে মাঝে বাংলা কোনও নাটক দেখার সুযোগ হয়, সে কারণে? ভোরে ঘুম থেকে। উঠে চা খেতে খেতে পড়া যায় বাংলা পত্রিকা? তাছাড়া আর কী?
