আমি বিশ্বাস করতে চাই না আমার জীবন থেকে বাংলার বইমেলা চিরকালের মতো হারিয়ে গেছে। বিশ্বাস করতে চাই না আমার সুখ, স্বপ্ন, আমার ভালোলাগা, ভালোবাসা সবকিছুরই কবর হয়ে গেছে।
এখনও আমি স্বপ্ন দেখি। এখনও ভালোবাসা পেতে সাত সমুদ্র পেরোই। একা, এক-ঘর অন্ধকারে, ভীষণ বেদনায় যখন নুয়ে থাকি, হতাশার চাবুক এসে জীবনকে রক্তাক্ত করতে থাকে, ভালোবেসে একখানা হাত কেউ যদি তখন রাখে হাতে, কী যে আশ্চর্য বেঁচে উঠি। ওই ওটুকু স্পর্শই আমাকে আবার স্বপ্নের দিকে আলোর গতিতে টেনে নিয়ে যায়।
একজন লেখকের সঙ্গে যেমন শব্দের একটা গভীর সম্পর্ক থাকে, বাঙালি একজন পাঠকের সঙ্গেও থাকে বাংলা-বইমেলার সেই সম্পর্ক। এ বছর আমাকে না হয় বিচ্ছিন্ন করা হল। প্রিয় বইমেলা থেকে, আগামি বছর থেকে বাকি জীবন যেন বাংলার সঙ্গে আমার সম্পর্ক অবিচ্ছিন্ন থাকে, অবিচ্ছেদ্য থাকে।
কেউ কেউ আমার নিরাপত্তার কথা বলছে। আমি জানি, মানুষের ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা। গত তিনবছর কলকাতা শহরের ভিড়ের রাস্তায় কোনও নিরাপত্তারক্ষী ছাড়াই আমি নির্বিঘ্নে হেঁটেছি। আমাকে কোনওদিন বুলেটপ্রুফ গাড়ি ব্যবহার করতে হয়নি। হঠাৎ কী এমন ঘটে গেল! দুটো লোক সিটি বাজাবে বলে কি আমরাসিনেমা দেখতে যাই না, বাজার হাট করি না। আমরা কি জানি না দুটো লোকের সিটি বাজানোয় সায় দিলে দশটা লোকে সিটি বাজায়! আমরা জানি সব। তারপরও মুখ বুজে থাকি। মুখ বুজে থাকতে থাকতে আমরা বছর গেলে, বয়স গেলে বুঝি যে, মুখ বুজে থাকাটাই আমাদের সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দুই.
সকালে সিগারেট খাচ্ছিলাম। মরতে চাইছি মনে হয়। হ্যাঁ তাই তো। তা না হলে সিগারেট আনাবো কেন? একটার পর একটা সিগারেট খাচ্ছি কেন। আমি কি জানি না সিগারেট আমাকে বছরের পর বছর কী করে খেয়েছে! কী কষ্ট হয়েছে সিগারেট ছাড়তে, ভুলে যাওয়ার কোনও তো কারণ নেই! সব জেনেও, সব বুঝেও আমি সিগারেট ধরাই। হাসিখুশি অফিসার মেয়েটির চোখে আমার জন্য করুণা।
–কেন, সিগারেট কেন?
–উত্তর তো খুব সোজা।
–কীরকম সোজা?
–ডিপ্রেশন।
–এদের রাজনীতির কারণে তুমি তোমার এসেন্সকে নষ্ট করবে কেন? তুমি তোমাকে ধ্বংস করবে কেন? তুমি এসবের ঊর্ধ্বে। এইসব তুচ্ছ রাজনীতি, নোংরামির কাদায় তুমি নিজেকে ডোবাবে কেন? তুমি কি এসবকে তুচ্ছ করতে পারো না?
–কী হবে..
–কী আর হবে। যা হয় তা হবে। এত ভাববারই বা কী আছে। তুমি অনেক বড়। তুমি কোনও ভুল করোনি। তোমাকে আটকে রেখেছে বলে তুমি নিজেকে ঝরে যেতে দেবে কেন? তাহলে তো তাদেরই জয় হল। বেঁচে থাকো, তোমার আদর্শ, তোমার দৃঢ়তা সবকিছু নিয়ে তীব্র ভাবে বাঁচো। তোমাকে নিয়ে আমরা গর্ব করি। এখানকার রাজনীতি নিয়ে গর্ব করার কিছু নেই।
–কবে যে শেষ হবে এখানকার বাস….
–শেষ তো নিশ্চয়ই একদিন হবে। এইভাবে তো চলতে পারে না। নিশ্চয়ই কোনও কোনও সমাধানে আসবে সরকার।
–খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছে। সিগারেট এই যে খাচ্ছি, অবশ্য ভেতরে ফুসফুসে ধোঁয়া নিচ্ছি। আশংকা হচ্ছে, আবার না নেশা হয়ে যায় ..
–সিগারেট ছাড়ো। বাঁচো। ইন্ডিয়া ইজ নট এভরিথিং।
ইন্ডিয়াইজ নট এভরিথিং, এই বাক্যটি আমাকে একটু হয়তো শক্তি দিল। দুপুরে লিখলাম। বিকেলে স্নান করলাম। পরিষ্কার জামা কাপড় পরলাম। সন্ধের দিকে যখন পাখিদের নীড়ে ফেরার দিকে তাকিয়ে থেকে বললাম, পাখিরা নীড়ে ফিরছে, আমারই নীড় নেই ফেরার, মেয়েটি পাশে বসে বললো, ‘ওদের তো নীড় ভেঙে যায়। আবার গড়ে।’
–হ্যাঁ আমার মতো। কত নীড় গড়লাম। কত দেশে। ভাঙলো। আবার গড়লাম।
–তোমার কি কখনও ইচ্ছে হয় কেউ থাকুক জীবনে? সঙ্গে কেউ আছে, পাশে কেউ আছে, এই অনুভূতিটা ইচ্ছে হয় না?
–হ্যাঁ ইচ্ছে হয়। কিন্তু সবসময় ভুল মানুষকে সঙ্গী ভেবে ভুগেছি।
–একা লাগে না?
–লাগে হয়তো মাঝে মধ্যে। কিন্তু একাই তো বাস করছি দীর্ঘকাল। কেউ এসে আমার স্বাধীনতার ব্যাঘাত ঘটাক চাই না। ভালোবাসায় আপত্তি নেই।
.
১১ জানুয়ারি
৪.২৭ একটা দুঃস্বপ্ন আমাকে ঘুম ভাঙিয়ে দিল। দুঃস্বপ্ন, আমার ওই নীল বইটা, ভারত বাসের অনুমতির বইটা কারা যেন ছিঁড়ে ফেলেছে টুকরো টুকরো করে। কোথাও একটা ঝগড়াঝাটি চলছে। টুকরোগুলো কুড়োতে চেষ্টা করছি আমি, টুকরোগুলো জোড়া দেওয়ার চেষ্টা করছি। কোত্থেকে দমকা হাওয়া এসে টুকরোগুলোকে উড়িয়ে নিচ্ছে। আমার ঠিক মনে নেই আমি ওই কাগজগুলোর পেছনে দৌড়োচ্ছিলাম নাকি স্তম্ভিত দাঁড়িয়ে ছিলাম।
৪.৩০ সিলিংএর দিকে তাকিয়ে থাকি। সাদা সিলিং। সাদা একটা পাখা ঝুলে আছে। প্রায় একই রঙের। পাখাটা স্থির হয়ে আছে। এ দেশে স্থির হয়ে থাকা পাখা খুব চেনা দৃশ্য নয়। ঘুরতে থাকা পাখা দেখেই মানুষ অভ্যস্ত। পাখার মতো আমিও ঝুলে আছি। জানিনা কোত্থেকে ঝুলে আছি, আর যদি বাঁধন ছুটে যায়, তাহলে ঝুলে থাকা আমার পতন হবে কোথাও কোথায়, জানি না।
৪.৪০ বুকটা বড় খালি খালি লাগে। প্রচন্ড শীত করতে থাকে।
৪.৪২ মাকে মনে পড়ে। আমি চোখ বুজি। মাকে আমার স্পর্শ করতে ইচ্ছে হয়। মাকে বড় জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে হয়। মার কানে কানে বলতে ইচ্ছে হয়, মা তুমি আমাকে এখান থেকে নিয়ে চলো, মা তুমি আমাকে বাড়ি নিয়ে চলো।
