আজ শীলা রেড্ডি বললো, ‘কেন বই থাকবে না মেলায়, নিশ্চয়ই থাকবে। যা হয় হোক। আগুন লাগাবে? লাগাক। এত পিছু হটার কী আছে। ওরা বড় রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে ছাড়পত্র পেয়ে গেছে যা কিছু করার। তাই করছে। এখন কোন জায়গায় সরকার একটা সীমারেখা টানবে, তার বোধহয় ভাবার সময় এসেছে।’
দিন দিন একা হয়ে যাচ্ছি।
অবস্থা দেখে মনে হয় না যে খুব ভালো দিকে এগোচ্ছে। সবচেয়ে জরুরী যে প্রশ্ন, তা হল, আমাকে বন্দি করা হয়েছে কেন। সরকার বলছে মুখ বন্ধ করে থাকো। আনন্দবাজার, যে পত্রিকা জনমত তৈরি করতে পারতো, করছে না, বরং বলছে, মুখ বন্ধ করে থাকো। শঙ্খ ঘোষ, যার ওপর আশা করে বসে আছি যে সরকারের সঙ্গে কথা বলবেন, বলছেন মুখ বন্ধ রাখো কিছুদিন, শীলা বলছে, তুমি মুখ বন্ধ রাখো, তোমার সম্পর্কে অন্যরা এবার বলুক।
কিন্তু অন্যরা তো কিছু বলছে না।
খবর দেবেন বলেছিলেন শ্যাম বেনেগাল। উত্তর এলো না। এমএ বেবি জানাবেন বলেছিলেন কংগ্রেসের কারও সঙ্গে কথা বলার পর, জানালেন না। ভ’বাবুর একজন। কাছের লোক আগে প্রায়ই ফোন করতো খবরাখবর জানার জন্য, এখন আর করে না। ও যা কিছু করে ভ’বাবুর অনুমতি নিয়ে করে। তবে কি আমার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করার কথা কেউ তাকে বলেছে? ভ’বাবুও কিছু জানাচ্ছেন না। তপন রায় চৌধুরী দেখা করেছিলেন তাঁর সঙ্গে। আমার সম্পর্কে কথা হয়েছে। ভ’বাবু নাকি বলেছেন যে তিনি। কলকাতায় আমাকে পাঠাবেন, চিন্তার কিছু নেই। কিন্তু তপন রায় চৌধুরী ভরসা পাচ্ছেন না। বললেন, রাজনীতিকদের তিনি বিশ্বাস করেন না। টাইমস নাওএর সম্বিত পাল একদিন। ফোন করে বললো, ”দিদি, ভরসা তো কিছু দেখছি না, আমরা তো যতটা সম্ভব খবর করে যাচ্ছি, কিন্তু আপনার পক্ষে তো তেমন কোনও আন্দোলন গড়ে উঠছে না। জনমত তৈরি করার চেষ্টা করেও তো জনমত তৈরি করা যাচ্ছে না।
ঝাঁক ঝাঁক বিষণ্ণতার মধ্যে সুদুর থেকে সুখবর ভেসে আসে। আমাকে প্যারিসে সিমোন দ্য বোভোয়ার একশ বছর পূর্তি উপলক্ষে, মেয়েদের স্বাধীনতার জন্য লড়ার জন্য ‘সিমোন দ্য বোডোয়া পুরস্কার প্রদান করা হল। কাল রাতে আমার বক্তব্য লিখে পাঠিয়েছিলাম। ক্রিশ্চান বেস সেটা ফরাসিতে অনুবাদ করে পড়ে শুনিয়েছেন অনুষ্ঠানে। আমার পুরস্কারখানিও গ্রহণ করেছেন। সন্ধেয় ক্রিশ্চান বেস জানালেন যে মানুষ নাকি প্রচুর হাততালি দিয়ে আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছে। সকলে আমার নিরাপত্তা আর মুক্তির জন্য আওয়াজ তুলেছে।
ভারতবর্ষের মাটি কামড়ে পড়ে আছি মাটিকে ভালোবেসে, আর যে মাটি আমাকে টানে না, সেই মাটিতে মানুষ আমাকে ভালোবেসে পুরস্কার দিচ্ছে।
আমি কার? মাটির না মানুষের?
.
১০ জানুয়ারি
এক.
কলকাতায় বইমেলা। প্রতিবছরের মতো এবছরও। আমি থাকবো না।
ভারতে আসার অনুমতি যখন থেকে পেয়েছি, কোনও বছরই কলকাতার বইমেলায়। আমি অনুপস্থিত থাকিনি। বিদেশে যত কাজই থাকুক, ছুটে ছুটে এসেছি কলকাতায়, শুধু বইমেলার জন্য। আর, যখন থেকে কলকাতায় বাস করতে শুরু করেছি, বইমেলা তো ছিলই, বাড়ির কাছে, হাত বাড়ালে-ছোঁয়া-যায় দূরত্বে। একজন লেখকের জন্য বইমেলাই, আমার বিশ্বাস, সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। চারদিকে বই, লেখক কথা বলছেন পাঠকের সঙ্গে। লেখকের সঙ্গে দেখা হচ্ছে লেখকের বই নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। নতুন ভাবনারা ঘোরাফেরা করছে। মুক্তচিন্তার সবচেয়ে সুন্দর পরিবেশ তো বইমেলাই আমাদের দেয়।
কলকাতার বইমেলায় এবছর উপস্থিত থাকার কোনও সম্ভাবনাই, আমি আশংকা করছি, আমার নেই। কেন নেই, সে প্রশ্নের উত্তর আমি জানি না। খুব দুঃসময় এলে শুধু প্রশ্নই থাকে, উত্তর থাকে না।
খবর এলো, আমার বই যদি বইমেলায় থাকে, মৌলবাদীরা নাকি তান্ডব করবে। তান্ডব করাটা এখন খুব সহজ হয়ে গেছে অনেকের কাছে। তান্ডব করলে, যদি জানে, যে, তাদের ক্ষতি হওয়ার কোনও আশংকা নেই, বরং বাড়তি কিছু লাভ হবে, তবে করবে না-ই বা কেন!
নিজের জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে আমার। আমার চাওয়া কোনওকালেই খুব বড় কোনও চাওয়া ছিল না। বাংলার মেয়ে বাংলার মাটিতে নিভৃতে নিজের মতো করে বাস করতে চেয়েছিলাম, ওপারে সম্ভব না হলে, এপারে। কলকাতায় যে কটা বছর ছিলাম, আমি কোনও ক্ষতি তো করিনি কারও কারও পাকা ধানে মই দিইনি। কারও কিছু কেড়ে নিইনি। বরং অকাতরে দিয়েছি। যা-ই সম্ভব, যতটাই সম্ভব। নিজের বিশ্বাসের কথা লিখেছি। প্রায় দু’যুগ ধরে মানবাধিকার আর নারীর অধিকারের পক্ষে গোটা তিরিশেক বই লেখার পর কিনা আমাকে ইসলাম-বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা হল। যেন ইসলামের বিরোধিতা করাই আমার লেখালেখির উদ্দেশ্য, আর কিছু নয়। এত ভুল, এত মিথ্যে গায়ে সেঁটে দিলে কী ভয়ংকর পরিস্থিতির উদ্ভব হয়, সে কী দেখছি না! একজন সমাজ-সচেতন লেখকের জন্য এর চেয়ে ক্ষতিকর আর কী হতে পারে! রাজনীতির ধারে-কাছে-না-থাকা কোনও লেখককে যদি রাজনীতির খুঁটি হতে হয়, তবে দুর্যোগের কিছু আর বাকি থাকে না।
কলকাতায় আমার একলা-পড়ে-থাকা বাড়িটির প্রায়-আঙিনায় বইমেলা হচ্ছে এবার। পার্কাসে। আমার বন্ধুরা, চেনা-পরিচিতরা, মুখচেনা-অচেনারা সবাই যাবে মেলায়, কেবল আমারই যাওয়ার কোনও উপায় নেই। যতদিন বইমেলা চলবে কলকাতায়, ততদিন দিল্লির একটি ঠিকানাহীন ঘরে একলা বসে থাকতে হবে সারাবেলা ধুলোয় ধূসর হয়ে মেলায় ঘুরে বেড়ানোর সেইসব স্মৃতি সামনে নিয়ে। আমার তো হাত পা বাঁধা। মানুষের স্বাধীনতার কথা লিখে নিজের স্বাধীনতাই হারাতে হয়েছে। আমার তো কোনও শক্তি নেই বইমেলায় আগের মতো হাঁটার, চলার। আগের মতো উৎসবে সামিল হওয়ার।
