শঙ্খ ঘোষ ফোন করেছিলেন, ভেবেছিলাম কোনও সুখবর দেবেন। না, সুখবর দেবার জন্য নয়। দ্য স্টেটসম্যানে বের হওয়া আমার ব্যানিশড উইদ এন্ড উইদাউটটা বাংলায় কেউ অনুবাদ করে লিটল ম্যাগাজিনে ছাপাতে চাইছে, সেটার জন্য। কেউ কোনও সুখবর আর দিচ্ছেন না। শঙ্খ ঘোষের কাছে আর সুখবর নেই। তিনি কি ইচ্ছে করলে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে ফোন করে বলতে পারেন না আমাকে কলকাতায় ফিরিয়ে নিতে? দু’জনে তো ভালো বন্ধুত্ব। হয়তো ভাবছেন, বললে কোনও কাজ হবে না। এ কিন্তু একেবারে কেউই ভাবছেন না, কে জানে, হতেও পারে কাজ!!
যত দিন যাচ্ছে, তত আমার অস্থিরতা বাড়ছে। যত দিন যাচ্ছে তত বেশি কঠিন হচ্ছে কলকাতায় ফেরা। যত দিন যাচ্ছে তত রাজনীতি বাড়ছে আমাকে নিয়ে।
.
৮ জানুয়ারি
টাইমস অব ইন্ডিয়ায় সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে, রাইটার ব্লকড় শিরোনামে। প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি যে আমাকে করজোড়েমুসলিমদের কাছে ক্ষমা চাইতে বলছেন, সেটার সমালোচনা করে লেখা। লেখাটির শেষ দিকটা এরকম ..The problem with such a political strat egy is that the more one appeases fundamentalists, thinking their point of view to be representative of a community, the more demands they’ll raise. And the more powerful they’ll become, once they’re seen to be effective in translating their views into state policy.
A secular state has to draw the line somewhere, otherwise it will give rise to a game of competitive fundamentalism that will damage the nation’s multicul tural fabric. Moreover, a democracy cannot stifle individual dissent. An individ ual, after all, is the smallest minority. It’s on his defence that democracy rests. When calling on Taslima to bend and scrape before religious authorities, it’s these democratic basics that the good information and broadcasting minister appears to have lost sight of.
আজ খবরে দেখলাম, প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির বক্তব্য মেনে নিচ্ছে কংগ্রেস পার্টি। কংগ্রেসএর মুখপাত্র বলেছেন, ঠিক কথাই নাকি প্রিয়রঞ্জন বলেছেন, এবং কংগ্রেস এ কথা বিশ্বাস করে যে আমার ক্ষমা চাওয়া উচিত সমস্ত মুসলিমের কাছে।
কী ভয়ংকর সংবাদ!
এসব শুনে বিজেপি বলছে, যে, সোনিয়া গান্ধি আর মনমোহন সিংকেও ক্ষমা চাইতে হবে রামসেতুর মন্তব্যের জন্য। রাম বলে কেউ ছিল না কোনওদিন, রাম হল কবির কল্পনা, এ কথা বললে হিন্দুর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে। সুতরাং ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্ন যদি ওঠে, তাহলে শুধু এক ধর্মের মানুষের কাছে কেন, সব ধর্মের মানুষের কাছে নয় কেন? ওরা যদি আঘাত পেতে পারে, এরাও আঘাত পেতে পারে।
আমি একটা অবিশ্বাস্যরকম নির্বোধ। একটা গাধার গাধা। দেশে দেশে অত্যাচারিত নানাভাবে। প্রাণের টানে বাংলায় থাকতে এসেছিলাম, নিজের মতো ছিলাম, নিজের ছোট্ট গন্ডি নিয়ে, বেশির ভাগ সময়ই ভীষণ একাকীত্বে ভুগেছি। আর আমাকে নিয়ে করা হচ্ছে রাজনীতি! ভারতবর্ষে! ভয়ে আমি খাস নিতে পারি না। আমার গা কাঁপে। হাত পা কাঁপে। এর পরিণতি কী? এভাবে একটা খোপের মধ্যে আমাকে আর কতদিন বাস করতে হবে।
.
৯ জানুয়ারি
আশ্চর্য, এও ঘটতে পারে। সাতটা মুসলিম সংগঠন, জামাতে ইসলামি, জমিয়তে উলেমা হিন্দ এবং আরও কটা সংগঠন সরকারের কাছে বলছে আমাকে যেন দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়। কোনও ভিসা যেন না দেওয়া হয়। জমিয়তে উলেমা হিন্দের যে মাদানি, যে লোক দ্বিখন্ডিত থেকে কিছু অংশ বাদ দেওয়ার পর বলেছিল, তারা আমার বিরোধিতায় আর যাচ্ছে না–এখন সেসব কথা ভুলে গিয়ে মহাসমারোহে লেগেছে আমার বিরুদ্ধে। জমিয়তের আরেক প্রধান নুমানি বলতে চাইছে যে হিন্দুধর্মের বিরুদ্ধেও লিখেছি, সুতরাং সব ধর্মের লোকেরা জড়ো হয়ে আমার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করুক। তারা এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাচ্ছে আমাকে ভারত থেকে তাড়ানোর জন্য। যোলো তারিখে নাকি আবার সর্বধর্মের সমন্বয়ে একটা সভাও করবে।
ওদিকে কলকাতার খবর হল, ওখানে সমাজবাদী দল আমার বিরুদ্ধে নেমেছে। ইদ্রিস আলী, যাকে ফুরফুরার ত্বহা সিদ্দিকী বলেছিল যে চেনেই না, ২১ নভেম্বরের ঘটনা থেকে নিজেদের অনেক কসরত করে সরাতে চেয়েছিলো, বলেছিল ইদ্রিস ডেকেছিল অবরোধের ডাক, ফুরফুরা ওতে মোটেও নেই, সেই ফুরফুরাই এখন ইদ্রিশের গলায় মালা পরাচ্ছে। যে কংগ্রেস দল থেকে ইদ্রিসকে বের করে দেওয়া হয়েছিল ২১ তারিখের পর, তাকেই যদি দলে ফের ফেরত নেওয়া হয়, প্রদেশ কংগ্রেসের নেতারা তান্ডবকারীদের ইন্ধন জোগানোর লোকটাকে যদি হাজতে দেখতে যেতে পারেন, ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে সংবর্ধনা দিতে পারেন, ফুরফুরা দেবে না কেন! এখন আবার সমাজবাদী দলের নেতা বিজয় উপাধ্যায়। নাকি বিষোদগার করেছে আমার বিরুদ্ধে। বইমেলা কমিটির কাছে চিঠি দিয়েছে, তারা চায়না তসলিমার কোনও বই মেলায় থাকুক। যদি তসলিমার বই মেলায় বিক্রি হয়, তবে ঘোষণা করে দিয়েছে, অগ্নিগর্ভ অবস্থা হবে আবার। এ নিয়ে নাকি গোয়েন্দা বিভাগ চিন্তিত। কী হবে তাহলে। আগে প্রশান্ত রায়কে বলেছিলাম কোনও বইযেন আমার না থাকে বইমেলায়। কিছু একটা গন্ডগোল হলে ওগুলো আবার ছুতো হবে আমাকে তাড়ানোর।
