বাংলাদেশের বড় মানুষগুলো আমার পাশে ছিলেন, সবসময় ছিলেন। কলকাতায় ছিলেন অন্নদাশংকর রায়। তিনি এখন নেই। আছেন শিবনারায়ণ রায়, খুব পাশে আছেন। আছেন অম্লান দত্ত। ওঁদেরও বয়স মধ্য আশি। যদি ওঁরাও চলে যান, বড় একা হয়ে যাবো। জগতে কেউ আর থাকবে না পাশে দাঁড়াবার। যতটা বড়রা বোঝেন আমাকে, লক্ষ্য করেছি মাঝারি বা ছোটরা ততটা বোঝেন না। অবশ্য বয়স হলেই যে বুঝবেন, তা নয়। বোঝার মন আছে। বলেই বোঝেন।
রাজনীতি আমাকে বড় একা করে দিল। বাবা মা থেকে দূরে থাকতে হয়েছে। আত্মীয় স্বজন থেকে দূরে। যাঁরা স্নেহ করেন, শ্রদ্ধা করেন তাঁদের সবার থেকে দূরে। কী অদ্ভুত এক জীবন!
যে করেই হোক, যে ভাবেই হোক, যদি বাংলাদেশে চলে যেতে পারতাম। ইচ্ছে হয় ভ’বাবুকে বলি, আমাকে যেন দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করে দেন। ভ’বাবুর সঙ্গে নিশ্চয়ই ভালো সম্পর্ক ওখানকার সরকারের। ভারতের সঙ্গে তো বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন আগের চেয়েও ভালো হওয়ারই কথা, কিছুদিন আগে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশকে ভারত একশ কোটি টাকা দান করলো। যদি ভ’বাবু কোনও উদ্যোগ নিতেন আমাকে পাঠানোর। যেন হাসিনা আমার বিরুদ্ধে জারি করা হাবিজাবি মামলাগুলো তুলে নেন, যেন নিরাপত্তা দেন। আহ, যেতে পারতাম যদি নিজের বাড়িতে। নিজের ঘরে যদি বাকি জীবন বাস করতে পারতাম! মা’র অনেক আশা ছিল, স্বপ্ন ছিল দেশে ফিরি। ‘‘র স্বপ্ন পূরণ করতে ইচ্ছে হয়। বেঁচে থাকা কালীন তাঁর কোনও স্বপ্নই তো পূরণ করিনি। নিজেরও কি আমার দেশে ফেরার স্বপ্ন নেই। বুকের ভেতরের খুব গোপন কুঠুরিতে থাকে আমার সেই স্বপ্ন। ওখানেই রেখে দিই ওদের, পূরণ-না-হওয়া স্বপ্নগুলোকে আমি আর চোখের সামনে মেলে ধরি না। আড়াল করে রাখি। আড়ালে রেখে যে জীবনটা যাপন করি, সে জীবনটা হয়তো আসল জীবন নয়, বানানো।
.
৭ জানুয়ারি
কাল সারাদিন টেলিভিশনে তথ্যমন্ত্রী প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির ক্ষোভ দেখানো হল। তিনি খুবই রেগে আছেন আমার ওপর। কেন আমি ইসলামের সমালোচনা করেছি। আমার কোনও অধিকারই নেই কোনও ধর্ম নিয়ে সমালোচনা করার। এটা ভারতবর্ষ, এখানে এসব চলে না। বলেছেন আমাকে করজোড়ে ক্ষমা চাইতে হবে সব মুসলমানের কাছে। ইসলাম নিয়ে যা যা এ পর্যন্ত লিখেছি, সব কিছুর জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। বই থেকে ধর্ম নিয়ে লেখা যা কিছুই লেখা হয়েছে সব তুলে নেওয়া উচিত। আসলে, দ্বিখন্ডিত বইটিই নিষিদ্ধ করা উচিত। এর নাম ভারতবর্ষ, এখানে থাকতে হলে ধর্ম নিয়ে কথা বলা চলবে না।
এই প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সিই হায়দারাবাদে আমার ওপর আক্রমণ হওয়ার পর তীব্র নিন্দা করেছিলেন সেই আক্রমণের, এমনকী এও বলেছিলেন, তসলিমাকে নাগরিকত্ব দেওয়ার ব্যাপারে কেন্দ্র এখন ভেবে দেখবে। শুনে মনে হয়েছিল নাগরিকত্ব প্রায় হয়েই আছে, প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি শুধু শুভদিনটি ঘোষণা করবেন আজ বা কাল।
প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি কি ইসলামে বিশ্বাস করেন? আমার মনে হয় না, বিশ্বাস করলে তিনি ধর্মান্তরিত হতেন। তিনি হিন্দুধর্মে বিশ্বাস করেন সম্ভবত, অথবা কোনও ধর্মেই বিশ্বাস করেন না। তিনি নিশ্চয়ই জানেন ‘দ্বিখন্ডিত’র কিছু অংশ আমি বাদ দিয়ে দিয়েছি। দুঃখিতও হয়েছি কেউ দুঃখ পেয়ে থাকলে। তাহলে কে বা কী তাকে হঠাৎ করে আমার বিরুদ্ধে আগুন হতে বললো। লোকে বলে, মুসলমানের ভোট পাওয়ার জন্য এরকম করছেন রাজনীতিকরা। আমার খুব অবাক লাগে, ভোটের জন্য কি নীতি আর আদর্শ সব বিসর্জন দিতে হয়। বিসর্জন দিয়ে ভোট পেতে কি সত্যিই কারও কোনও আনন্দ হয়? নীতি আর আদর্শের কথা এইজন্য বললাম, যে, গণতন্ত্রের তো একটা নীতি আছে। সবারই কথা বলার অধিকার আছে, কারও কথা পছন্দ না হলে পাল্টা কথা বলল। গায়ে হাত তোলো কেন? মুন্ডু চাও কেন? তান্ডব করো কেন? মানুষের ক্ষতি করো কেন? আগুন জ্বালাও কেন? এসব তিনি মানেন না বলেই নয়ই আগস্টে হায়দারাবাদে আমার ওপর হামলা হওয়ার পরদিন আমার পক্ষে কথা বলেছিলেন। দশই আগস্টের সেই প্রিয়রঞ্জনকে আমার মানুষ প্রিয়রঞ্জন বলে মনে হয়। তখন তিনি সত্যিকার তাঁর বিশ্বাসের কথাই বলেছিলেন। তারপর এখন যা বলছেন, মুসলমানদের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে হাত জোড় করে ক্ষমা চাইতে হবে, রাজনীতিক হিসেবে বলছেন। মানুষ প্রিয়রঞ্জন আর রাজনীতিক প্রিয়রঞ্জন এক নয়, ভিন্ন লোক। রাজনীতিক হতে হলে হয়তো মানুষ হওয়া যায় না, মানুষটাকে বাদ দিয়ে রাজনীতিক হতে হয়।
কুড়ি বছর কম হলে বয়স, ওঁদের জন্য দুঃখ করতাম। এখন নিজের জন্য করি। নিজের দুর্ভাগ্যের জন্য করি।
একটা অতি সাধারণ জন্ম, অতি সাধারণ বড় হওয়া, অতি সাধারণ জীবন যাপন করা মানুষের এ কী হাল! সে নাকি হয়ে গেল লোকের রাজনীতি করার বস্তু? তা-ও আবার এত বড় দেশ ভারতে? না, এই বস্তুটি হওয়ার যোগ্য নই আমি। এই বস্তু হতে গেলে আরও হয়তো যোগ্যতা থাকতে হয়। যারা অতি প্রশংসা করেন আমার, সেটা পাওয়ারও যেমন যোগ্য আমি নই, যারা অতি নিন্দা করেন, তা পাওয়ারও যোগ্য নই।
আজ টাইমস নাও টেলিভিশন প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির মন্তব্যের পর বললো যে যেদিন থেকে তসলিমাকে তাড়ানো হল কলকাতা থেকে, সেদিন থেকেই তসলিমা হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে অস্পৃশ্য। যাকে বলে আনটাচেবল। তা ঠিক। তসলিমা এখন এই ভারতবর্ষে আনটাচেবল একজন। কলকাতায় এখন ফেরা সম্ভব হত, যদি বড় একটা গণআন্দোলন হত। কিন্তু আমার পক্ষে কোনও গণআন্দোলন হওয়া সম্ভব নয় কোনও দেশে। কোনও জনমত গড়ে তোলার কাজও কেউ করবে না। আমি একজন লেখক। আমার কোনও দল নেই, সংগঠন নেই। আমি আগাগোড়াই একা একজন মানুষ। ভালোবেসে লিখি। তাগিদে লিখি। লিখে বাঁচি। শরীর বাঁচানোর চেয়ে বড়, মন বাঁচানো। বড় নিরীহ, বড় নিরুপদ্রব একটা মানুষ আমি। কিছু ধর্ম ব্যবসায়ী আর রাজনীতিক আমাকে ব্যবহার করছে নিজেদের স্বার্থে, এ আজ থেকে নয়, শুরু হয়েছে বহুকাল। আজও শেষ হয়নি। বিনা অপরাধে শাস্তি কী আর কোনও লেখক এমন পেয়েছে? অনেক লেখকের জেল ফাঁসি হয়েছে অনেক দেশে। কিন্তু এত দুর্ভোগ আর কাকে পোহাতে হয়েছে! যে লেখক নির্বাসনে আজ আছে, কাল সরকার বদল হলে তার নির্বাসন জীবনের ইতি ঘটে। আমার জীবনে নির্বাসনের কোন কূল নেই, কিনার নেই।
