শীলার আরও উপদেশ, শ্যাম বেনেগালকে ফোন করো, তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চাও। আমি এসব বড় মানুষদের ফোন করে অভ্যস্ত নই, বিশেষ করে যাদের সঙ্গে আমার খুব বন্ধুত্বের সম্পর্ক নেই। কিন্তু শীলা অনেকটা মনোবিজ্ঞানীর মতো, কী করে কী করে যেন আমাকে একবারে তাঁর প্রায় মুঠোর মধ্যে নিয়ে নিয়েছেন। তিনি যা বলেন, তার অনেকটাই আমি মানতে না চাইলেও মানি। শ্যাম বেনেগালকে ফোন না করলে শীলা বলবেন, ”তুমি আসলে তোমার এই অবস্থা থেকে বেরোতেই চাও না। তাই চেষ্টাও করো না। এরকম আগে বলেছেন যখনই লক্ষ্য করেছেন তার উপদেশ আমি অক্ষরে অক্ষরে মানিনি। যেদিন উপদেশ দেন, তার পরদিন থেকে তিনি খবর নিতে শুরু করেন উপদেশের কটা এবং কতটুকু আমি মেনেছি।
শ্যাম বেনেগালকে ফোনে পেলাম না। উনি ফোন করলেন বোম্বে থেকে। ধন্যবাদ জানালাম সই করার জন্য পিটিশানে। বোম্বে থেকে দিল্লি আসতে আসতে তাঁর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি। তার মানে দেখা হচ্ছে না। বন্ধু আর শুভাকাঙ্গীদের সঙ্গে দেখা করার যে কথা ভেবেছি, তা আপাতত অন্যের সঙ্গে হলেও শ্যাম বেনেগালের সঙ্গে হচ্ছে না। না হোক, অন্তত এ ভেবে ভালো লাগছে যে তিনি আমার অবস্থা নিয়ে ভাবছেন। নিজে থেকে বললেন সরকারের কারও সঙ্গে তিনি কথা বলবেন। বলে কালই আমাকে জানাবেন। শ্যাম বেনেগাল জানান বা না-জানান, তিনি ভারতে আমার সবচেয়ে প্রিয় পরিচালক। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা আমার একইরকম রয়ে যাবে। এমএ বেবিও বলেছিলেন জানাবেন। এমএ বেবি ওই তৃতীয় বাড়িতে দেখা করেছিলেন আমার সঙ্গে। পুরোনো কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন, বুদ্ধবাবু আসলেই কেরালাতে আমাকে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। আর আমি যখন জানিয়েছিলাম আমি কোথায় আছি, ‘সেইফ হাউজ’এর জীবন ঠিক কী রকম জীবন, ভেবেছিলাম তিনি বলবেন যে যে করেই হোক আমাকে এই অবস্থা থেকে উদ্ধার করার সবরকম চেষ্টা তিনি করবেন। বলেননি, তবে বলেছেন গান শুনতে, ভালো লাগার গানগুলো শুনতে। এমএ বেবিও পরে আর জানালেন না, কেন জানালেন না! নাকি জানানোর, আশা দেওয়ার, আশ্বাস দেওয়ার কিছু নেই আর!
.
৫ জানুয়ারি
দুটো কবিতা লিখলাম আজ। বহুদিন পর কবিতা। গৌতম ঘোষ দস্তিদার কলকাতা থেকে একটা ইমেইল পাঠিয়েছে তার ‘রক্তমাংস’ লিটল ম্যাগের জন্য কবিতা পাঠাতে অনুরোধ করে। কেউ না চাইলে আজকাল আর দেখি লেখা হয় না। লেখা চাইলেই লেখা হয়। কবিতা লিখতে লিখতে চোখ বেয়ে জল ঝরে। ঝরতে থাকে, লিখতে থাকি। লং লিভ ডিমোক্রেসি!’ ‘কোনও কবিকে কি কখনও গৃহবন্দি করা হয়েছিলো কখনও?
.
৬ জানুয়ারি
বাংলাদেশ আমার কাছে ভুলে যাওয়া নাম। সম্ভবত। বাংলাদেশ আমার সুখের এবং কষ্টের স্মৃতি। আমি ভাবতে পারি না যে বাংলাদেশে আমার বাবা মা আর নেই। তাঁদের বাড়ি ঘর খালি পড়ে আছে। এইটুকু ভাবার সাহস আমার হয় না। আমি ভাবি না। ওই ভাবনাটা আসতে গেলেই আমি ভাবনাকে সজোরে আড়াল করি। বড় খালি খালি লাগে। বুক ফেটে যায়। আমি ধারণ করতে পারি না এই শূন্যতা। তাই কোনওদিনই বাবা মায়ের থাকার কথা স্মরণ করি না। না-থাকার স্মৃতি মুছে ফেলতে চাই।
আজ কী রকম যেন ঘটনা ঘটলো। নেটে আমার বিষয়ে নতুন খবর খুঁজতে গিয়ে সকালে দেখলাম, কে এম সোবহানের ওপর একটা লেখা ডেইলি স্টারে, লেখক লিখছেন, কে এম সোবহান তসলিমার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। ‘ছিলেন’ শব্দটি আমার গা কাঁপিয়ে দেয়। তাহলে কি এখন নেই তিনি?
সকালে কলকাতা থেকে ফোন এল। কে এম সোবহানের লেখা ছাপা হয়েছে দৈনিক স্টেটসম্যানে। কে এম সোবহান, বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের প্রাক্তন বিচারক, মারা গেছেন গত সোমবার। এটিই তাঁর জীবনের শেষ লেখা। জীবনের শেষ লেখাটি আমাকে নিয়ে। কণ্ঠে জমা হতে থাকলো কষ্টের মেঘ। হ্যাঁ বাংলাদেশে হাতে গোনা যে ক’জন বুদ্ধিজীবী আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে কেএম সোবহান অন্যতম।
লিখেছেন, তসলিমা নাসরিনকে বাংলাদেশ ধারণ করতে পারেনি, এ লজ্জা বাঙালির ধরে রাখার জায়গা নেই। এই বাঙালি লেখিকাকে বাংলাদেশ দিতে পারেনি তার সাংবিধানিক অধিকার।.. আপস করেছে বামফ্রন্ট সরকার জঙ্গি ধর্মান্ধদের কাছে নতজানু হয়ে।’
নিজের ওপর রাগ হয় কত বাজে কাজে সময় নষ্ট করেছি জীবনে, কোনওদিন এই মানুষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করিনি। পৃথিবীর কত কাউকেই তো কত ফোন করেছি, কোনওদিন কেন কেএম সোবহানকে ফোন করিনি। তারও নিশ্চয়ই খুব ভালো লাগতো, যদি হত কথা মাঝে মধ্যে। কার ওপর অভিমান আমার? এই মানুষগুলো তো ভীষণভাবে আমাকে সমর্থন করে গেছেন, তাদের তো ক্ষমতা ছিল না আমাকে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার। শামসুর রাহমানও নেই আর। ওয়াহিদুর রহমানও চলে গেলেন। ওয়াহিদুর রহমান খুব ভালোবাসতেন আমাকে। আমার কথা নাকি খুব বলতেন। জনকণ্ঠে কলাম লিখতেন। তাঁর শেষ লেখাটিও শুনেছি আমাকে নিয়ে ছিল। চোখ জলে ভরে যায় শুনলে। এত বড় উদার মানুষদের কাছ থেকে আমাকে দুরে সরিয়ে রেখেছে বাংলাদেশ সরকার। আমাকে আমার প্রাপ্য স্নেহ থেকে বঞ্চিত করেছে বাংলাদেশের ঘৃণ্য রাজনীতি।
চারদিকে শুধু শূন্যতা। জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, খান সারোয়ার মুরশিদ, কলিম শরাফী, কবীর চৌধুরী এঁদের তো বয়স হয়েছে অনেক। কবে চলে যান, ভয় হয়। আর থাকলেই বা কী! আমি তো যোজন যোজন দূরে। শামিম সিকদার, রুবি রহমান, ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর কথাও বড় মনে পড়ে। এত দূরে চলে এলাম! এত যে যেতে চাই দেশটিতে! কেউ কি বোঝে? কেউ কি বোঝে যে পারি না যেতে? কেন বেরিয়েছিলাম দেশ থেকে। মৃত্যু হত, ওখানেই হত। বিদেশে বিদেশে ঘুরে মৃত্যু কি আমার কিছু কম হয়েছে?
