আমার ডিএনএতে যে আমার মার চরিত্র। কী করে পালাবো এ থেকে। ক্ষমা করে দিতে দিতে গেছি দুনিয়ার সব বদমাশকে। ক্ষমা আর ভালোবাসা –এ দুটো রক্তে আমার। মা’র যেমন ছিল। মা কিন্তু দুঃখই পেয়ে গেছেন মানুষের কাছ থেকে, সারাজীবন। আমারও একই নিয়তি।
.
৩ জানুয়ারি
গতকাল অনুষ্ঠান হল, কোনও বাংলাপত্রিকায় তার কোনও খবর নেই শুধুদৈনিকস্টেটসম্যান ছাড়া। যেহেতু সিপিএমের নেতারা আমার ওপর অমানবিক আচরণ করেছেন, যেহেতু দৈনিক স্টেটসম্যান এখনও সিপিএম বিরোধিতা চালিয়ে যাচ্ছে, আমার পক্ষে লিখছে। এ ক্ষেত্রে এটি সাহসী ভূমিকাই। কারণ সিপিএম বিরোধী তো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। আমার পক্ষে তো একটি কথাও বলছেন না তিনি! সিপিএমের চুন থেকে পান খসলে তিনি তেড়ে আসেন। কই, সিপিএম আমার সঙ্গে যা করেছে তা নিয়ে একটি সমালোচনার বাক্যও তোত তিনি উচ্চারণ করছেন না! কেউ বলে, আনন্দবাজার আপস করেছে, কেউ কেউ বলে আতাঁত করেছে। আনন্দবাজার যা করেছে, তাকে আপস বলে নাকি আঁতাত বলে জানি না। তবে অনেককাল চুপ থাকছে। মহাবোধির অনুষ্ঠান নিয়ে একটি বাক্যও খরচ করেনি। আনন্দবাজারের ভূমিকা নিয়ে মানুষের সংশয় তৈরি হয়েছে সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম নিয়ে যখন মানুষের পক্ষে না দাঁড়িয়ে সরকার পক্ষে দাঁড়িয়েছিল।
প্রসূন ভৌমিক আমাকে ফোনে অনুরোধ করেছিল একটা যেন লেখা দিই সেদিন অনুষ্ঠানে পড়ার জন্য। তো লিখে ফেললাম তক্ষুণি। ওই যে, স্বভাব তো আছেই আমার, ফরমায়েশ থাকলে লেখা হয়, নয়তো নয়। লেখাটা, বারবার বলে দিয়েছি, পড়ার জন্য মঞ্চে। কোথাও ছাপাবার জন্য নয়। কিন্তু পড়ার পর শুনেছি মহাশ্বেতা দেবী ঘোষণা করে দিয়েছেন এটা দৈনিক স্টেটসম্যানে ছাপা হবে।
পত্রিকায় ছাপা হওয়া মানে হাওয়ার আগে ছড়িয়ে যাওয়া সর্বত্র। সরকারের কোনও সমালোচনা আমার মুখ থেকে বেরোনো মাত্র লুফে নেয় তাবৎ সাংবাদিক। একবারও ভেবে দেখে না এতে আমার ক্ষতি কিছু হবে কি না। মৌলবাদীরা আক্রমণ করতে পারে এই আশংকা থাকার পরও কি জয়পুরের হোটেলের নাম আর রুম নম্বর জানিয়ে দেয়নি পুরো পৃথিবীকে? দিয়েছে। সাংবাদিকরা ভালো হয়, খারাপও কম হয় না। পিটিআইএর এক ছেলে, খুব ভালো সম্পর্ক আমার সঙ্গে, বারবারই বলছে আমার জন্য দুশ্চিন্তায় দিন পার করছে, কিন্তু মহাবোধি সোসাইটি হলে যাবে না। দিল্লির অফিস থেকে চাপ এলে ডেস্কে বসে এর ওর কাছ থেকে শুনে খবর লিখবে। আর আমি তো শুধু ক’টি ডায়াল দূরত্বে, আমাকে সহজেই পাওয়া যায়। কিন্তু সেটা না করে এদিক ওদিক থেকে আমি কী বলেছি, কোনো সরকারবিরোধী কিছু বলেছি কি না, জেনে যাচাই করা নেই কিছু নেই, ঢুকিয়ে দেবে আমার নামে। আমি যে যুক্তির কথা বলছি, বুঝিয়ে বলছি, সেগুলোতে কান কেউ দিতে চায় না। খালি বিস্ফোরক কিছু দিয়েই ভরতে চায় খবরের শিরোনাম, খবর।
তপন রায় চৌধুরী কলকাতা থেকে দিল্লি এসেছেন। আমার সঙ্গে দেখা করতে চান। দেখা করার ব্যবস্থা করলেন প্রভু, সেই গোপন জায়গাতেই। তবে এই দেখা করার ব্যাপারটিতে আমার চেয়েও বেশি উৎসাহ প্রভুর। তপন রায় চৌধুরীকে দেখে কী যে ভালো লাগলো। আমাকে বড় ভালোবাসেন। না হলে দেখা করতে চাইবেন কেন! দিল্লিতে এসে নাকি প্রথম। ভ’বাবুর সঙ্গে দেখা করেছেন, দ্বিতীয় কাজ আমার সঙ্গে দেখা করা। কলকাতা থেকে ছুটে এসেছেন শুধু এক কারণেই। আমার ব্যাপারে ভ’র সঙ্গে কথা বলতে। আমি উন্মুখ বসে রইলাম শোনার জন্য, বারবারই জিজ্ঞেস করলাম, ভ’বাবু কী বলেছেন? আমাকে কবে যেতে দেবেন কলকাতায়?
এর উত্তর না দিয়ে প্রভুর দিকে দূর থেকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে বললেন, মনে হচ্ছে র’ এর লোক।
–র’এর লোক? মনে হয় না।
–আমার মনে হচ্ছে এরা র’ এর লোকই হবে।
-এঁরা খুবই ভালোমানুষ। খুব যত্ন নিচ্ছেন। কিন্তু সবচেয়ে বেশি যা দরকার আমার, তা হল কলকাতায় ফেরা, স্বাধীন স্বাভাবিক জীবন যাপন করা, যা এতকাল করছিলাম।
আমি যতই কলকাতার কথা বলি, কবে যেতে পারবো, সেই দিন তারিখটি শুনতে চাই। তপন বাবু ততই এড়িয়ে চলেন আমার কথা। মৌলবাদীরা যে কত ভয়ংকর, তারা যে আমাকে মেরে ফেলার জন্য ছুরিতে শান দিয়ে রেখেছে, পিস্তলে গুলি ভরে রেখেছে, তলোয়ার খাপ থেকে বের করে এনেছে সে কথাই তিনি থেকে থেকে শোনান।
বহুকাল বিদেশের নিরাপদ জীবন যাপনে অভ্যস্ত মানুষগুলো সব কিছুতে বড় ভয় পান। তিনি ভাবছেন বিরাট কোনও সন্ত্রাসী মুসলিম মৌলবাদী দল বোধহয় আমাকে টার্গেট করেছে। নিরাপত্তার কথা ভাবছেন। ভ’র সঙ্গে কথা বলে, তিনি যা বুঝেছেন, খুব তাড়াতাড়ি আমার কলকাতা ফেরা হবে না।
.
৪ জানুয়ারি
দুপুরে একটুখানি রোদে বসা। গাছগাছালির দিকে বড় শূন্য চোখে তাকিয়ে থাকা। এ হল প্রতিদিনকার হু হু করা দুপুরের গল্প। আজ ওরকম দুপুরে শীলা রেড্ডিকে বললাম কাল তপন রায় চৌধুরীর সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা। আসলে আমি যে আগ বাড়িয়ে সব বলি, তা নয়। শীলাই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চান সবকিছু, কী ঘটছে, কী হচ্ছে, কী করছি, কী ভাবছি। শীলা বললেন, ”তুমি ওঁকেই বলো সাহায্য করতে। তোমাকে কলকাতায় পাঠানো যদি না-ই হয়, অন্তত এখানে, এই দিল্লিতেই যেন কিছুটা স্বাভাবিক জীবন দেওয়া হয়, তার জন্য তুমি কেন, তপনবাবুই ভ’কে বলুন।
