পর আমি কলকাতায় ফিরতে পারতাম।
আমি নিশ্চিত, যে ছেলেরা একুশে নভেম্বরে পথে নেমেছিল, তারা কেউ আমার লেখা পড়েনি। যে ঘৃণায় বা যে ক্রোধে তারা পুলিশের দিকে ইট ছুঁড়েছে, সেই ঘৃণা অন্য কারণে, সেই ক্রোধ অন্য কারণে, আমি কলকাতা শহরে বাস করি বলে নয়। উত্তেজনা তাদের মধ্যে যা ছিল, তা আরোপ করা।
দেশ থেকে বা রাজ্য থেকে আমাকে বের করে দেওয়ার যে ষড়যন্ত্র দীর্ঘদিন থেকে চলছিল, তা বাইশে নভেম্বর যে করেই হোক সফল করা হল। কিন্তু কী দোষ আমি করেছি? কী দোষে কলকাতায় আমাকে গৃহবন্দি থাকতে হল, কী দোষে আমাকে কলকাতা থেকে বের করে দেওয়া হল, কী দোষে চরম অনিশ্চয়তা, হতাশা আর শূন্যতা নিয়ে পড়ে আছি দিল্লির কোনও একটি ঠিকানাহীন ঘরে, যে ঘর থেকে বাইরে বেরোনোর কোনও অধিকার আমার নেই! যে ঘরে আমার কোনও আত্মীয় বা কোনও বন্ধু কোনওদিন ঢুকতে পারবে না! কী দোষে আমাকে প্রতিদিন দম বন্ধ হয়ে যাওয়া পরিবেশে ফেলে রাখা হয়েছে? কী দোষ আমি করেছি? কেন্দ্রীয় সরকার বলেছেন, আমাকে নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর নাম কি নিরাপত্তা? আমাকে বন্দি করে কি নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে আমাকে নাকি নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে অন্য কাউকে? জেলখানাতেও ভিজিটিং আওয়ার্স থাকে, আমার এখানে নেই। জেলখানাতেও কয়েদিরা জানে কবে তারা মুক্তি পাবে। আমি জানি না কবে এই দুঃসহ একাকীত্ব থেকে, ভয়াবহ অনিশ্চয়তা থেকে, মৃত্যুময় নিস্তব্ধতা থেকে আমার মুক্তি জুটবে। কলকাতায় আমাকে গৃহবন্দি করার পেছনে উদ্দেশ্য ছিল যেন দেশ ছেড়ে বা রাজ্য ছেড়ে কোথাও চলে যাই। আর দিল্লির এই ঠিকানাহীন জায়গায় এভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য আমাকে পুরে রাখার কারণ কি এই, যে, অতিষ্ঠ হয়ে নিজেই যেন এ দেশ ছেড়ে কোথাও চলে যাই? যদি তা না হয়, তবে কেন আমাকে পরাধীনতার শেকলে বাঁধা হয়েছে? কী কারণে শত অনুরোধ করার পরও আমাকে কলকাতায় যেতে দেওয়া হচ্ছে না? কী কারণে আমাকে দিল্লিতেও কোনও স্বাভাবিক সামাজিক জীবন যাপন করতে দেওয়া হচ্ছে না?
না, দিল্লির কোথাও আমার বিরুদ্ধে কোনও সভা হয়নি, কোনও মিছিল হয়নি। আমার জীবনের ওপর কোনও হুমকি নেই। বরং সুশীল সমাজের সত্যিকার সেকুলার, সচেতন মানুষই আমার পক্ষে সভা করেছেন, মিছিল করেছেন, বুদ্ধিজীবীরা লিখছেন, লিখেছেন। তারপরও কেন বন্দি জীবন যাপন করতে হবে আমাকে? যদি হুমকি দেয় কেউ, তবে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হয়। যেমন এ দেশের প্রচুর মানুষের জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা আছে। (বিদেশে প্রতিটি দেশেই আমার জন্য নিরাপত্তা দেওয়া হয়, ওসব দেশের আমি নাগরিক নই, তবুও। ভারত তো জাতিসঙ্রে বা রাষ্ট্রপুঞ্জেরই একটি দেশ।) জীবন যাপন স্তব্ধ করে কি কেউ বসে আছে? আমার কেন তবে সব স্তব্ধ হবে? কী যুক্তি এর পেছনে?
এ অবধি আমার সঙ্গে যে কাউকেই দেখা করতে দেওয়া হয়নি তা নয়। দেওয়া হয়েছে, তবে যেভাবে দেওয়া হয়েছে তা ভয়ংকর। ফাঁসির আসামি বা বড় কোনও ক্রিমিনালের বেলায় সম্ভবত এমন করা হয়। আমি যদি কারও সঙ্গে দেখা করতে চাই, যারা আমাকে এই জায়গায় রেখেছেন, তাঁদের কাছে বলতে হবে, একজনের সঙ্গে দেখা করতে চাই আমি। সেই একজনটি কে, কোথায় বাড়ি, কী করেন, ইত্যাদি নানা কিছু জেনে তারা যথাস্থানে আমার লিখিত বা মৌখিক আবেদন জানিয়ে দেবেন। ওখানে আমার ব্যাপারে। যারা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তাঁরা কারা আমি জানি না, কয়েকদিন সময় নেবেন। দিন কয় পর আমার আবেদনের উত্তর তারা জানিয়ে দেবেন, দেখা হবে অথবা দেখা হবে না। বেশির ভাগ আবেদনকেই দেখা না হওয়ার কাতারে ফেলে দেওয়া হয়। যদি তারা দেখা করানোর সিদ্ধান্ত নেন, তবে কবে কখন কোথায় কতক্ষণের জন্য দেখা হবে, তার নির্দেশ তারাই দেন। এসবে কোনও স্বাধীনতা আমার নেই। তারপর দেখা করার যে দিনক্ষণ যা তাঁরা নির্ধারণ করেন, সেই অনুযায়ী আমাকে একটি কালো কাঁচ গাড়িতে ওঠানো হয়, গাড়িকে একটি তৃতীয় জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়, ওখানে আমাকে বসানো হয়। আমার যে বন্ধুর সঙ্গে আমি দেখা করবো, তার জায়গা থেকে তাকেও একই ভাবে আরেকটি কালো কাঁচ গাড়ি করে তৃতীয় জায়গায় নিয়ে আসা হয়। সেখানে তাদের বেঁধে দেওয়া সময় পর্যন্ত আমি বন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে পারবো। কী কথা বলবো, কী করবো তা লক্ষ্য রাখা হবে। রোমহর্ষক এই দেখা হওয়া। কী অর্থ এসবের? যেন আতঙ্কে, যেন ভয়ে, যেন কুণ্ঠায় আমি কুঁকড়ে থাকি। যেন মরে যাই? যেন দেশ ছেড়ে চলে যাই এসব আর সইতে না পেরে? এ ছাড়া আর কী? এ ছাড়া আর কিছুই না।
কিন্তু এ দেশ ছেড়ে আমি যাবো না। যাবো না কারণ এ দেশ ছাড়া পৃথিবীতে অন্য কোনও দেশ নেই যে দেশকে আমি নিজের দেশ বলে ভাবতে পারি। এ দেশে সবচেয়ে বড় হুমকি পাওয়া মানুষ আমি নই। হুমকি পৃথিবীর যে কোনও দেশেই যে কেউ দিতে পারে। আজ তেরো বছর আমাকে এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। যতনা আমি মৌলবাদের হুমকির শিকার, তার চেয়ে বেশি আমি মৌলবাদ -তোষণের রাজনীতির শিকার। আমাকে মৌলবাদীরা বাংলাদেশ থেকে বের করেনি, বের করেছিল বাংলাদেশ সরকার। আমাকে আজও যে দেশে ফিরতে দেওয়া হচ্ছে না, তা কার নির্দেশে? কোনও মৌলবাদীর নির্দেশ এ নয়, এ সরকারের নির্দেশ। আমি বিশ্বাস করি না সরকার আমার নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত। বাংলাদেশ সরকার নিজেদের নিরাপত্তার কথাই ভেবে এসেছেন বরাবর।
