আমি ভারতকে বাংলাদেশ বলে ভাবতে চাই না। যেটুকু নিরাপত্তা আমার দরকার, সেটুকু দিয়ে আমাকে স্বাভাবিক সামাজিক জীবন যাপন করতে দিতে, আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি, ভারত সরকার পারেন। আমার কারণে কোথাও দাঙ্গা বাধবে, মানুষ মরবে, এসব আশংকা সম্পূর্ণই অমূলক। এসব আতঙ্ক তৈরি করার পেছনে উদ্দেশ্য ছিল, আছে। আমার কারণে কোনওদিন পৃথিবীর কোথাও দাঙ্গা লাগেনি। কোনও লেখকের কারণে দাঙ্গা কোথাও লাগে না। কিছু মৌলবাদী আমার দ্বিখন্ডিত বইটির অংশ নিয়ে আপত্তি করেছেন। বইটি নিষিদ্ধ হওয়ার আগে, এবং নিষেধাজ্ঞা থেকে হাইকোর্ট বইটিকে মুক্তি দেওয়ার পর বইটি বাজারে বিক্রি হয়েছে, নির্বিঘ্নে, একটি দিনের জন্য বইএর বিরুদ্ধে কোনও বিক্ষোভ দেখায়নি কেউ। দাঙ্গার ভয় আমাকে অনেক দেখানো হয়েছে। ভয় দেখিয়ে আমাকে তাড়াবার চেষ্টা অনেক হয়েছে। আমি শুধু এই কথা বলতে চাই, আমি দোষী নই। আমি এও বলেছি, যে, আমি কারও অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার উদ্দেশ্যে কিছু লিখিনি, যদি কেউ আঘাত পেয়ে থাকেন আমি দুঃখিত। দ্বিখন্ডিত থেকে, নিজের লেখা বই থেকে দুটো প্যারাগ্রাফ বাদ দেওয়ার পর জামাতুল উলেমা হিন্দের প্রধান মৌলানা মাদানি, যিনি আমার বিরুদ্ধে বিষোদগার প্রচুর করেছেন, তিনিও বলছেন, ব্যস, ম্যাটার ক্লোজড, তসলিমা এ দেশে থাকতে পারেন, যে শহরে তার থাকার ইচ্ছে থাকতে পারেন, আমরা আর বিরোধিতা করছি না। তবে কোন বিরুদ্ধ-শক্তি আমাকে কলকাতায় যেতে বাধা দিচ্ছে?
ইমাম বরকতি আর ইদ্রিস আলী সেদিন আস্কারা পেয়ে চেঁচিয়েছেন। মনে আছে, সেই দুহাজার ছয় সালে, ইমাম বরকতি ফট করে মনের সুখে একটা ফতোয়া দিয়ে ফেলেছিলেন, মাথা নাকি কিসের যেন একটা দামও ঘোষণা করে ফেলেছিলেন, তারপর পুলিশ কমিশনার প্রসূন মুখার্জি তাঁর ঘরে ইমামকে ডেকে নিয়ে কিছু তাঁকে বোঝালেন, ঘর থেকে বেরিয়ে ইমাম বরকতি পুরো অস্বীকার করলেন ফতোয়ার কথা, তিনি নাকি আদৌ কোনও ফতোয়াই দেননি। ইমাম বরকতি বা ইদ্রিস আলীকে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, মত প্রকাশের অধিকার সম্পর্কে জ্ঞান দেওয়ার আজ কেউ নেই কেন? দাঙ্গা বাধাবার, ফতোয়া দেওয়ার, সন্ত্রাস করার অধিকার যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কারওরই থাকার কথা নয়, সে কথা তাদের বোঝাবার কেউ নেই আজ। সন্ত্রাস করার পর যদি তাদের সংবর্ধনা জোটে, তাহলে কেনই বা তারা বিরত থাকবে সন্ত্রাস থেকে? এও তো কথা।
কী অন্যায় করেছি আমি? হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান সবাইকে আমি মানুষ হিসেবে দেখি। এ কি অন্যায়? মানুষের মধ্যে আমি সমতা চাই। মানবতার জন্য, সমানাধিকারের জন্য আমি নিরলস লিখে যাচ্ছি। মৌলবাদী, রক্ষণশীল, অনুদার, সংকীর্ণমন-লোকেরা আমার বিরুদ্ধে বলছে, তারপরও আমি লিখে যাচ্ছি মানুষের জন্য, মানুষের কথা। যে মানুষ দারিদ্রের শিকার, শিক্ষা স্বাস্থ্য থেকে বঞ্চিত, ভিন্ন ধর্মবিশ্বাসের কারণে যার মানবাধিকার লঙ্খন করা হয়, তার পাশে আমি চিরকাল দাঁড়াই। পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানের পাশে আমি ঠিক একইভাবে দাঁড়াই, যেভাবে দাঁড়িয়েছিলাম বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুর পাশে। ইসলাম নিয়ে রাজনীতি করার অসৎ উদ্দেশ্যে যে স্বার্থান্বেষী মৌলবাদীরা তাদের গলা চড়াচ্ছে, তারা কোনও কারণেই পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের প্রতিনিধি নয়।
এখনও কি চিহ্নিত করার সময় আসেনি কে সমাজের শত্ৰু, কে নয়? এখনও কি এই অযৌক্তিক বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাওয়ার আমার সময় আসেনি? মানবতার জন্য লিখে, চিন্তার স্বাধীনতার পক্ষে লিখে, নিজের মত প্রকাশ করে আমি কি তবে ভুল করেছি এই ভারতবর্ষে? কী অন্যায়ের শাস্তি আমাকে ভারত সরকার দিচ্ছেন? পুরো ভারতবাসী কি তাহলে দেখবে যে –যন্ত্রণায়, কষ্টে, স্বাসকষ্টে, হতাশায়, শূন্যতায় ভুগতে ভুগতে, অন্ধকারে, সবার চোখের আড়ালে পড়ে থেকে যেন ধীরে ধীরে আমি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাই? দেশহীন, রাষ্ট্রহীন, রাজ্যহীন, সমাজহীন, বান্ধবহীন হয়ে যেন আমি মরে যাই? কী অপরাধ করেছি আমি, যার শাস্তি এই সেকুলার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র আমাকে দিচ্ছে? রাজনীতি আমি কোনওদিনই করিনি। আমি রাজনীতি বুঝিও না। একজন লেখককে নিয়ে রাজনীতি, অনুরোধ করছি, বন্ধ করা হোক। একজন লেখককে দেওয়া হোক লেখার পরিবেশ, মুক্তচিন্তার পরিবেশ। একজন লেখককে দেওয়া হোক নির্ভয়ে লেখার অধিকার। আমার বিনীত অনুরোধ এই। এই দেশের কাছে, এই রাষ্ট্রের কাছে আমার এই একটিই চাওয়া। সেই আদিকাল থেকে যে মানুষই আশ্রয় চেয়েছে, ভারতবর্ষ তাকে আশ্রয় দিয়েছে। ভারতবর্ষের এই মহান উদার ঐতিহ্য নিয়ে আমি গৌরব করি। এই ভারতবর্ষ নিয়ে লেখক হিসেবেও আমি যেন বাকি জীবন গৌরব করতে পারি।
আপনারা যারা আজ আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন, যারা আজ অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে সমবেত হয়েছেন, তাঁদের আমি অন্তরের কৃতজ্ঞতা জানাই। আপনাদের কাছে করজোড়ে আমি বলছি, আমাকে উদ্ধার করুন আপনারা। নিরন্তর মানসিক যন্ত্রণা থেকে আমাকে বাঁচান। আপনারাই আমার আত্মীয়, বন্ধু। জগতে আপনারা ছাড়া আমার কোনও স্বজন নেই। শুভবুদ্ধির মানুষের চেষ্টায় আমি কোনও একদিন মুক্তি পাবো, এই বিশ্বাসে আমি এখনও এখানে শ্বাস নিচ্ছি। এই একটি আলোই, এই একটি আশাই এখন আমার সামনে। বাকি সব অন্ধকার।
০৯.২ ডায়রির পাতা (জানুয়ারি)
১ জানুয়ারি
