তাদের চব্বিশ ঘণ্টা ডিউটি এখানেই। আমার ঘরের লাগোয়া ঘরগুলোয় থাকে। একদল আজ আসে কাল চলে যায়, আরেক দল কাল যারা আসে পরশু চলে যায়। কারও দিনে, কারও রাতে। তাদের প্রায় সবার সঙ্গেই আমার খুব ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সবাই খুব আন্তরিক, সহানুভূতিশীল, নম্র, ভদ্র। সবাই আমার মতোই তো মানুষ। তাদের জীবনের সুখ দুঃখের সব কাহিনী আমি জানতে পারবো, শুধু পিরবোনা জানতে কী চাকরি করছে তারা, কোন পদে করছে, নামের পদবীই বা কী।
আজ অঝোরে আবার কাঁদলাম। কেঁদে কেটে শান্ত হয়ে গাফফার চৌধুরীকে ফোন করলাম। তাঁকে বললাম, দেশের সরকারের কারও সঙ্গে পরিচয় থাকলে তিনি যেন আমার হয়ে একটু বলেন ওঁদের, আমাকে যে করেই হোক দেশে ফেরাতে যেন বলেন। যে কোনও শর্ত মেনেই আমি দেশে ফিরতে চাই। হাতের কাছে নিজের দেশ, যে দেশে জন্মেছি, বড় হয়েছি, যে দেশে বাবা মা, যে দেশে আত্মীয় স্বজন, যে দেশে শৈশব কৈশোর, যে দেশে স্মৃতি, সে দেশে যাওয়ার অধিকার আমার নেই। কেন থাকবে না আমার অধিকার? আর কত দিন এভাবে এ দেশে ও দেশে ঘুরবো! এবার ফিরতে দিন আমাকে। গাফফার চৌধুরী আমাকে কোনো আশার বাণী শোনান না।
এই বন্দি জীবন আমার আর সইছে না। আমার পক্ষে আর সম্ভব নয় এখানে থাকা। ফোন ট্যাপড হয়। কারা আড়ি পেতে শোনে আমার কথা মনে মনে নিশ্চয়ই খুশি হয় শুনে যে আমি কাঁদছি, নিশ্চয়ই খুশি হয় যে এ দেশ থেকে চলে যেতে চাইছি। হৃদয় বলে কারও কিছু নেই। কিছু নেই কেন? একটা অসহায় মানুষের জন্য সামান্য করুণাও কেন কারওর হয় না?
আমি ভেঙে পড়তে থাকি। আমার স্বপ্ন সাধ সব ভেঙে পড়তে থাকে। পায়ের তলার মাটি নাকি সরে যাচ্ছে আমার। কোথায় যাবো? দেশ ছাড়া, আর এই ভারত ছাড়া আমার আর কোনো মাটি নেই দাঁড়াবার।
শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে কথা বললাম। কান্না রোধ করতে পারি না। এত কাঁদছি কেন আমি? কোনওদিন তোএত কাঁদিনি। কোনওদিনই এত কাঁদিনি। মার অসুখের খবর পেয়ে কিছুদিন কেঁদেছিলাম। সেই তো মনে হয় শেষ কাদা। শঙ্খ ঘোষও কোনো আশা দেন না।
দীর্ঘ দীর্ঘ দীর্ঘ দিন পর পাচু ফোন করলো। বললো, কী ভাবে আমাকে রাখা হয়েছে, বাইরের কেউ জানে না। সবাই ভাবছে ভালোই আছি। আমি যে কীভাবে বাস করছি, কতটা পরাধীনতার শৃঙ্খল আমার গায়ে পায়ে জড়ানো, তা কল্পনাও কেউ করছে না।
পাচু বললো, বর্বরতা ছাড়া এ আর কিছু নয়। বললো, তুমি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার, মৌলবাদের নয়।
কী রকম ভয় হতে থাকে আমার। মৌলবাদীরা যদি না চেঁচাতে, রাষ্ট্রের কেউ আমাকে নিয়ে মাথা ঘামাতো না। ওপরওয়ালা যদি ইচ্ছে করেন মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারেন, আবার ইচ্ছে করলে মৌলবাদীদের তোষণ করতেও পারেন। তোষণ করতে গেলে ক্ষতিটা অবশ্য আমার হয়। এ পর্যন্ত যত ক্ষতি আমার করেছে, আমাকে গৃহহীন, সমাজহীন, স্বজনহীন, বন্ধুহীন করেছে রাষ্ট্রের লোকই, মৌলবাদীরা নয়। রাষ্ট্রের লোকই আমাকে রাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করেছে, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগিয়েছে, ছুঁড়ে দিয়েছে শূন্যে, মহাশূন্যে।
মৌলবাদীদের এবং মৌলবাদী তোষণকারীদের অত্যাচারে কোনও সত্যিকার পার্থক্য আছে কি না আমার জানা নেই।
.
৩০ ডিসেম্বর
‘তসলিমাকে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে তিনি যেন সতর্ক হন, কাউকে যেন আঘাত দিয়ে কথা বলেন। কিন্তু এই সৎ পরামর্শ শুধু তসলিমাকে দেওয়া হচ্ছে, মৌলবাদী নেতাদের দেওয়া হচ্ছে না কেন? এসব পক্ষপাতিত্বের সুদূর এমনকী অনতিদূর পরিণাম কিন্তু ভয়ংকর। প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধে যারা সরব হন তাঁদের বাক্যে কিছু মানুষ অনিবার্যভাবে আঘাত পায়। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরছে, এই কথাটা একদিন ইউরোপের কিছু ধর্মবিশ্বাসী মানুষকে আঘাত দিয়েছিল। সব নতুন চিন্তাই কিছু মানুষকে আঘাত দেয়। তসলিমা নিজের মানবিক পরিচয়কে অকুণ্ঠভাবে স্থাপন করেছেন সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে। এই সাহসী প্রত্যয়ের জন্যই তিনি আজ বিশেষভাবে শ্রদ্ধার যোগ্য। তার জন্য রক্ষা করা হোক উদার আতিথ্যের আসন।‘ –অম্লান দত্ত
আমি যেভাবে বেঁচে আছি, সেভাবে বেঁচে থাকাকে বেঁচে থাকা বলে না। কোনও অন্যায় করিনি আমি। অথচ কলকাতায় আমার বাড়িতে আমাকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছিল। দীর্ঘ চার মাস আমাকে ঘর থেকে বেরোতে দেওয়া হয়নি। শুধু তা-ই নয়, বারবারই সরকার পক্ষ থেকে আমাকে জানানো হয়েছে দেশ ছেড়ে নয়তো রাজ্য ছেড়ে চলে যেতে কোথাও। আমি মাটি কামড়ে পড়ে ছিলাম। কলকাতা ছেড়ে, প্রিয় শহর ছেড়ে, দীর্ঘদিন ধরে সাজানো সংসারটি ছেড়ে, নিজের বাড়ি ছেড়ে, কোথাও যাইনি। যাইনি, কারণ যাওয়ার কোনও কারণ দেখিনি। আমি বিশ্বাস করিনি আমার কারণে শহরে দাঙ্গা লাগবে। বিশ্বাস করিনি আমার কারণে শহরে মানুষ মরবে। আমি তো জানি যে এই শহরেই আমি সবচেয়ে নিরাপদ বোধ করি। এই শহরেই কোনও নিরাপত্তারক্ষী ছাড়া দিনের পর দিন আমি নিশ্চিন্তে নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়িয়েছি। কোনওদিন কোনও মৌলবাদী এগিয়ে আসেনি সামনে, যারাই কাছে এসেছে, ভালোবেসে এসেছে। যে দুএকজন মুসলমান নেতা আমার বিরুদ্ধে মাঝে মাঝে কথা বলেন, তাঁদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে বলে বলেন। তারা যখন সাধারণ মানুষকে প্ররোচিত করেন, কোনও ধর্মীয় অনুভূতি থেকে করেন না। উদ্দেশ্য সম্পূর্ণই রাজনৈতিক। একুশে নভেম্বরের তান্ডবের সঙ্গে, আমি বিশ্বাস করি, আমার লেখার কোনও সম্পর্ক নেই। যদি সম্পর্ক থাকতো তাহলে ‘দ্বিখন্ডিত’ থেকে বিতর্কিত অংশ বাদ দেওয়ার
