রাতে টিপু সুলতান মসজিদের ইমামের বক্তব্য পড়লাম নেটে। প্রেস কনফারেন্স করেছে ইমাম। ইমামের বক্তব্য, আমি কলকাতায় ফেরত গেলে আগুন জ্বলবে, এত বুলেট নেই পুলিশের শেষ করার, এত বড় জেলখানা নেই এত মুসলিমকে পোরার। জ্যোতি বসুর বক্তব্য তাদের ভালো লাগেনি। তারা কলকাতায় আমাকে চায় না। এই হল মোদ্দা কথা। আমার নাকি দ্বিখন্ডিতর পৃষ্ঠা বাদ দিয়ে সব শেষ হয়নি। ক্ষমা চাইতে হবে এতদিন যত ইসলামবিরোধী লেখা লিখেছি তার জন্য, তারপর কলমা পড়ে মুসলমান হতে হবে। অল ইণ্ডিয়া মাইনরিটি কমিটির ইদ্রিস আলীও ভিড়েছে দলে। হাউমাউখাউ করে জানিয়ে দিল, রাস্তায় নাকি মুসলমানের ঢল নামবে আমি কলকাতায় ফিরলে।
কোন দেশে বাস করছি। এ কি পাকিস্তান নাকি বাংলাদেশ।
ইচ্ছে করলেই কি সিপিএম আর কংগ্রেসের নেতারা সামাল দিতে পারতেন না এই মোল্লাদের! শুনেছি, ইমাম সিপিএমের দালাল, আর ইদ্রিস আলী কংগ্রেসের। কোনও দল থেকে কি এদের বালখিল্য উগ্রতার জন্য ধমক দেওয়া হয়েছে। কেউ এদের তো কিছু বলছেই না। কেউ কেউ বলছে, কানে আসছে, কোথাও কোথাও পড়ছি যে এদের দিয়ে নাকি করানোও হচ্ছে এই দাঙ্গা হাঙ্গামা। যেন এদের ধমকে হুমকিতে আমি কলকাতা যেতে না পারি। আর মুসলিম ভোট হারানোর কোনও ঝুঁকিও কারও রইলো না।
যে ইদ্রিস আলীকে ২১ নভেম্বরের কীর্তির জন্য কংগ্রেস বহিষ্কার করেছিল, সেই কুখ্যাত ইদ্রিস আলীকে দেখতে জেলখানায় গেলেন কংগ্রেস নেতারা। কংগ্রেসে তাকে ফিরিয়ে তো নেওয়া হলই, রীতিমত সংবর্ধনা দেওয়া হল। এই যদি হয়, এতই যদি আস্কারা ইদ্রিস আলীকে দেওয়া হয়, যা কিছু করার ছাড়পত্র তাকে যদি দেওয়াই হয়, তবে দেবে না কেন সে হুমকি!
২৯ ডিসেম্বর সারাদিন কী করে কাটলো? না, কিছু করে কাটলো না। কিছু না করে কাটলো। আমার এই অবস্থাকে আমি হাউজ অ্যারেস্ট বলি না। বলি না এই কারণে যে হাউজ অ্যারেস্ট হলে লোক আসতে পারতো দেখা করতে। হাউজ অ্যারেস্ট হলে দেশ থেকে বেরোতে দেয় না। আমি দেশ থেকে বেরোতে চাইলে এরা খুশিতে লাফিয়ে বিমান বন্দরে গিয়ে বিমানের সৰ্বোত্তম আসনে আমাকে বসিয়ে দিয়ে আসবে।
একে আমি জেলখানাও বলি না। বলি না কারণ জেলখানায় ভিজিটিং আওয়ার্স থাকে। আমার এখানে নেই। জেলখানার ঠিকানা আছে, আমার কোনও ঠিকানা নেই। জেলখানায় যারা আছে, তারা জানে কতদিনের জন্য তাদের জেল হয়েছে। তারা জানে কবে তারা বেরোবে। আমি জানি না আমার মুক্তি কবে।
এরকম জায়গায়, তথাকথিত ‘সেইফ হাউজ’এ রাখা হয় বড় ক্রিমিনালদের। গোয়েন্দারা পুঁতিয়ে, খুঁচিয়ে, লাথি মেরে, কিল মেরে, চুল টেনে, গায়ে গরম জল ঢেলে ক্রিমিনালদের পেটের কথা বার করে। কিন্তু এত দীর্ঘদিন কাউকেই রাখা হয় না। আমাকেই রাখা হচ্ছে। আমি ক্রিমিনাল নই, আমার পেটে কোনো গোপন কথা নেই খুঁচিয়ে বার করার। যখনই আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, কে ফোন করেছে, কী কথা হয়েছে, কোথায় কী হচ্ছে আমাকে নিয়ে, আমার মনে কী হচ্ছে, কী ভাবছি, কী ভাবছি না, সবই বলে দিই প্রভুকে।
ফোনে আড়ি পাতার ব্যাপারটা আমি ধারণা করতে পারি না। কিন্তু কয়েকজন বন্ধু কোনো রকম প্রমাণ ছাড়া এবং দ্বিধা ছাড়া বলেছে আমার ফোনে আড়ি পাতা হয়। বলার পর আমি বুঝতে চেষ্টা করেছি আড়ি পাতা ব্যাপারটা ঠিক কেমন। বেশ কিছুদিন পর লক্ষ্য করেছি যে ওদের দেওয়া ফোনটায় কেউ ফোন করলে কথা খুব আস্তে শোনা যায়। প্রভু কথা বললে কিন্তু অত আস্তে শোনা যায় না। আমি জানি না আড়ি পাতা ফোনের এমনই চরিত্র কি না।
আমি নজরবন্দি নাকি আমি গৃহবন্দি। ওপরওয়ালারা বলে দিয়েছেন, আমি গৃহবন্দি নই। কেউ তো এসে দেখে যেতে পারবে না, আমার বন্দিত্বের ধরন। কেউ আমার ত্রিসীমানায় আসতে পারবে না। কেউ জানবে না কোনওদিন কেমন আছি, কীভাবে আছি। একা একা এখানেই আমি পচে মরবো। এই বন্দিত্ব ঠিক কী কারণে, এর ধরনটাই বা কী, কাউকে আমি বোঝাতে পারি না। নিজেও কি খুব বুঝি আমি! মেইনস্ট্রিম পত্রিকার সম্পাদক সুমিত চক্রবর্তী, শীলা রেড্ডি এবং আরও কয়েকজন আমাকে নিয়মিতই ফোন করেন। এরা আমার চেয়ে অনেক কিছুই অনেক বেশি বোঝেন। শীলা রেড্ডির কাছে একবার জানতে চেয়েছিলাম আমাকে কলকাতায় না যেতে দিয়ে এ জায়গাটায় রেখেছে কেন, শীলা রেড্ডি দিব্যি বলল, তোমাকে মানসিক অত্যাচার এমন করবে যেন তুমি বাধ্য হয়ে এ দেশ ছেড়ে চলে যাও।
কিন্তু সংসদে তো বলা হয়েছে অতিথিকে বাস করতে দেওয়া হবে, এ ভারতের ঐতিহ্য!’ ভাঙা কণ্ঠ আমার, ‘আমি তো কোনো দোষ করিনি।’
‘দোষ করেছো তুমি।‘
‘কী দোষ?’
‘মৌলবাদী ক্ষেপিয়েছো, ওটাই দোষ।’
শীলা রেড্ডি রহস্যের হাসি হাসেন।
তাহলে মানসিক কষ্ট দেওয়া কেন? এত কিছুর দরকার কী। টেনে হিঁচড়ে বিমানবন্দরে ফেলে এলেই হয়। চলে যেতে তো বাধ্যই হব। আর এই আসছে ফেব্রুয়ারিতে যদি ভিসা বাড়ানোনা হয়, তা হলে তো চলেই যেতে হবে আমাকে।
সিগারেট আনানোর ব্যবস্থা করলাম। যে সিগারেট চার বছর আগে ছেড়ে দিয়েছি, সেই সিগারেট। আনার ব্যবস্থা করা মানে যে প্রভুর অফিসারের কাউকে আমার ইচ্ছের কথাটা জানাবো, সেই অফিসার যে লোকটা খাবার দিতে আসে, তাকে পয়সা দিয়ে দেবে, সে যখন আবার খাবার দিতে আসবে, সিগারেট নিয়ে আসবে। যে সিগারেটের গন্ধ পর্যন্ত সইতে পারিনি এই চার বছর, সেই সিগারেট। জীবন অর্থহীন লাগছে। জীবন ফুরিয়ে যাচ্ছে। সিগারেট কি আমার দুঃখ কমাবে? কমায় যদি, দেখি না! সিগারেট আনিয়েছি, এই ঘটনাও অফিসারদের জানাতে হয় ওপরে। আমার প্রতিমুহূর্তের নড়াচড়া, কথাবার্তা, দাঁড়ি কমা, সব। কিছুই এখানে প্রভুর অফিসারদের আড়ালে হতে পারে না, যা হবে, সবই ওদের সামনে হতে হবে। শুধু আমার ভাবনাগুলো ওরা না পারে দেখতে, না পারে শুকতে, না পারে স্পর্শ করতে, না পারে অনুমান করতে, না পারে নথিবদ্ধ করতে।
