বি–অসুবিধে আছে।
ত–কী অসুবিধে? আপনারা আছেন, নিশ্চয়ই ওরা বাড়িতে আসার সাহস পাবে না।
বি–আমরা ওদের কিছু করতে পারবো না।
ত–কেন?
বি–মুসলমানদের গায়ে হাত দেওয়া যাবে না। রায়ট লেগে যাবে।
ত–হিন্দু মুসলমানের ব্যাপার নয়, টেরোরিস্ট হল টেরোরিস্ট। কেউ অন্যায় করলে তাকে শাস্তি দেবেন। রায়ট লেগে যাবে, এ কোনও যুক্তি হল কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার?
বি–রায়টের রিস্ক নিতে পারবো না। ত তাহলে কী করতে হবে?
বি–আপনাকে দু’দিনের জন্য জয়পুরে যেতেই হবে।
ত–দু’দিন?
বি–হাঁ, ঠিক দু’দিন।
ত–দু’দিনে সব ঠিক হয়ে যাবে?
বি–সিওর।
ত–জয়পুরে কেন?
বি–জয়পুরে লাক্সারি রিসর্ট আছে আমাদের। ওখানে দু’দিন একটু বিশ্রাম নিন। আমরা দুদিন পর আপনাকে ফেরত নিয়ে আসবো।
ত–আমি জয়পুর যাবোনা। আপনারা যদি আমার বাড়িতে আমাকে নিরাপত্তা দিতে পারেন, তাহলে আমি বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে শুক্রবার দিনটা কাটাই।
বি–কোথায়?
ত–বেহালায়।
বি–না, বেহালায় সিকিউরিটি ছাড়া আপনাকে থাকতে হবে। যেখানেই যাবেন, নিজ দায়িত্বে।
ত–সল্টলেকে?
বি–আমাদের পক্ষে সিকিউরিটি দেওয়া সম্ভব নয় সল্টলেকে। আপনার নিজ দায়িত্বে থাকতে হবে।
ত–আমি বেলঘরিয়া যাবো। একদিনের তো ব্যাপার। আমার পাবলিশারের বাড়ি ওখানে।
বি–হবে না।
ত–দুর্গাপুরে, বোলপুরে?
বি–সবখানেই আপনার সিকিউরিটির দায়িত্ব আপনার।
ত–আপনারাই বলছেন আমাকে মেরে ফেলার জন্য দল তৈরি হয়ে গেছে। আবার বলছেন কোথাও সিকিউরিটি দেওয়া সম্ভব নয়! এতদিন যে নিরাপত্তা দিলেন, কেন দিলেন! হঠাৎ বিপদের সময় বন্ধ করে দেবেন কেন? বিপদের কথা তো আমার জানা ছিল না। আপনারাই জানাচ্ছেন, এখন সবচেয়ে বেশি বিপদ। আর আপনারাই এখন বলছেন, নিরাপত্তা দেবেন না। কী করবো আমি, কিছু তো বুঝতে পারছি না।
বি–আপনি আমাদের কথা শুনুন। আপনি জয়পুর যান। আপনার ভালোর জন্যই বলছি।
ত–আমি অবাক হচ্ছি, এত বড় পুলিশ বাহিনী গোটা কয় লোকের মার্ডার প্ল্যানএর বিরুদ্ধে কিছু করতে পারবে না। যদি আচমকা কিছু ঘটতো, সে না হয় বুঝতাম। এ তো আপনাদের নলেজের মধ্যে। কেন আমাকে বাঁচাতে পারবেন না?
বি–সরি। আমরা পারবো না।
সাফ সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, আমাকে মেরে ফেলবে মৌলবাদীরা কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ কোনো নিরাপত্তা আমাকে দিতে পারবে না। আমি স্তম্ভিত বসে থাকি। এ কী ঘটছে! কোনোদিন নিরাপত্তা চাইনি সরকারের কাছে। কিন্তু ভারতে যখনই এসেছি বা থেকেছি, সেই তিরানব্বই সাল থেকে আমার নিরাপত্তার জন্য পুলিশ মোতায়েন করেছে সরকার। আমাকে একদিনের জন্যও নিরাপত্তাহীন অবস্থায় রাখেনি। আর আজ কি না আমাকে বলা হচ্ছে আমাকে আক্রমণ করা হবে, পুলিশ কোনো নিরাপত্তা আমাকে দেবে না, আমাকে পশ্চিমবঙ্গ ত্যাগ করতে হবে, তাহলেই সরকার আমার পাশে দাঁড়াবে, নয়তো দাঁড়াবে না। এমন অদ্ভুত যুক্তি আগে শুনিনি, এমন অদ্ভুত ব্যবহার আজ অবধি কোথাও পাইনি। কস্মিনকালেও নিরাপত্তাব্যবস্থা আমি চাইনি, সবসময় যা চেয়েছি, তা হলো, আর দশজন মুক্ত মানুষের মতো চলাফেরা করতে। আমি চাইনি আমার জন্য সরকারের কোনো টাকা খরচ হোক। আমি সাধারণ মানুষ, সাধারণ মানুষের মতো জীবন যাপন করতে চেয়েছি। প্রথম দিকে প্রচুর পুলিশ থাকতো ঠিকই, ধীরে ধীরে কমে গিয়ে মোটে দুজনে এসে দাঁড়িয়েছিল। বাড়ির বাইরে কোথাও যেতে হলে একজন সাদা পোশাকের কেউ যেত আমার সঙ্গে। আমি বাড়ি ফিরলে সেই সাদা পোশাক চলেও যেত নিজের বাড়ি। দু’শ থেকে দু’জন হওয়ার অর্থ এ শহরে আমার জীবনের ঝুঁকি নেই। আমিই চাইছিলাম রক্ষীর সংখ্যা কমে কমে যেন শূন্যতে চলে আসতে পারে। মানুষের ভালোবাসাই যেন আমার নিরাপত্তা হয়। কিন্তু আশ্চর্য! এই শহরই আজ আমার নিরাপত্তা ব্যবস্থা বন্ধ করে দিতে চাইছে, এই খবরটি দিয়ে, যে, আমাকে আজ বা কাল মেরে ফেলা হবে, মেরে ফেলার সব ব্যবস্থা পাকা হয়ে গেছে। আমাকে আমার আততায়ীদের খবরটা জানিয়ে নিরাপত্তা বন্ধ করা কেন? না জানিয়েই বন্ধ করলে আমি অন্তত দুশ্চিন্তামুক্ত থাকতে পারতাম!
দুপুরে পুলিশের লোক এসে আমাকে নিয়ে গেল কলকাতা বিমান বন্দরে। দাদা ছিল আমার সঙ্গে। আমার হাতে দুটো ওয়ান ওয়ে টিকিট দিল ওরা। কোথায় যেতে হবে? জয়পুর। একগাদা পুলিশ আমাকে এয়ারক্রাফটের ভেতর বসিয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল বাইরে। উড়োজাহাজ উড়লো, তারপরও দাঁড়িয়ে রইল। কলকাতার আকাশে যতক্ষণ উড়োজাহাজের চিহ্ন দেখা যায়, রইল। ফেয়ারওয়েল ওরা এমন নিঃশব্দেই জানালো। আমি তখনও জানি না আর কলকাতায় ফিরতে দেওয়া হবে না আমাকে। তখনও জানি, আমাকে বাংলা থেকে চির জীবনের জন্য দূর করতে যে চক্রান্ত চলেছে, তা সেদিন সার্থক হল।
জয়পুর নামার পর দেখি পুলিশে ছেয়ে আছে বিমান বন্দর। তারা নাকি মাত্র কিছুক্ষণ আগে খবর পেয়েছে যে আমি আসছি। কলকাতার পুলিশ বলেছে, আমি নাকি এখানে কোন সাহিত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসেছি। পুলিশ নিয়ে গেল আমাকে একটা সস্তা হোটেলে। এই হোটেলই নাকি আমার জন্য ঠিক করা হয়েছে কলকাতা থেকে। অথচ বলা হয়েছিল, লাক্সারি রিসর্ট। লাক্সারি তোদূরের কথা, এঅনেকটাময়মনসিংহের নদীর পাড়ের দেড়টাকা দামের চিৎ কাত হোটেলের মতো। এমন হোটেলে কখনও থাকিনি আগে। অভিজ্ঞতাও বটে। পুলিশেরা জিজ্ঞেস করতে লাগলো, তোমার প্রোগ্রাম কাল কখন?
