ত–আমার কোনো প্রোগ্রাম নেই।
পু–তবে কেন এসেছো কেন?
ত–আমাকে পাঠানো হয়েছে কলকাতা থেকে।
পু–কে পাঠিয়েছে?
ত–কলকাতার পুলিশ।
পু–কেন পাঠিয়েছে?
ত–জানি না। বলেছে দু’দিনের জন্য জয়পুরে থাকতে।
পু–ওরা আমাদের মুখ্যমন্ত্রীকে জানিয়েছে, কী একটা নাকি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসেছে।
ত–কোনো অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার ব্যাপার নেই।’
পুলিশের মধ্যে রাজস্থানী ভাষায় আলোচনা চলতে থাকে। একটু পর পর একজন আসে, কাল আমার ক’টায় প্রোগ্রাম জানার জন্য মরিয়া ওরা। প্রোগ্রাম কিছু নেই, এমনি এসেছি –এ কথা বারবারই বলছি, বারবারই শুনছে, বারবারই বিষম খাচ্ছে। ভড়কে গেছে হোটেলের সামনে সাংবাদিক আর ক্যামেরার ভিড় দেখে। আমার জানা হতো না ক্যামেরার ভিড় সম্পর্কে, যদি না হোটেল-ঘরের টেলিভিশনটা চালাতাম। টেলিভিশনে দেখি আমার খবর দেখানো হচ্ছে, আমি জয়পুরের কোন হোটেলে এখন আছি, কত নম্বর রুমে আছি, সব। আমি নিজেই জানতাম না হোটেলের নাম আর রুম নম্বর। টেলিভিশন থেকে জানা হয়, জানালার পর্দা সামান্য ফাঁক করে দেখাও হয় রাস্তার সারি সারি ক্যামেরা কী করে তাক করে আছে ঘরের দিকে। বুক কাঁপে আমার। মৌলবাদী সন্ত্রাসীরা আমার রক্ত চায় জানার পরও কোনও সুস্থ সাংবাদিক কি জানাবে আমি কোথায় আছি না আছি, এভাবে? এরাকি তাহলে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে সন্ত্রাসীদের যে তোদের শিকারের সন্ধান পাওয়া গেছে, আয় ছুটে আয়, এসে শিকারটাকে ইচ্ছে মতো ছিঁড়ে খা। ছিঁড়ে খা যেন আমরা সেটা ক্যামেরায় চমৎকার ধরে রাখতে পারি, আর সারাদিন ধরে প্রচার করতে পারি, আমাদের দর্শক বাড়বে, আমাদের চ্যানেলের নাম হবে!
ছটফট করি। একে ওকে ফোন করি। কলকাতার পুলিশেরা কেউ এখন আমার ফোন ধরছে না। জয়পুর পুলিশ না বোঝে ইংরেজি, না বোঝে হিন্দি। আমি প্রমাদ গুণতে থাকি। কী করে রাস্তায় ভিড় করা সাংবাদিকদের মিনতি করবো আমাকে প্রাণে মারার এই আয়োজন বন্ধ করতে! এক ফোঁটা ঘুম নেই। রাত একটার দিকে ঘরের দরজা ভেঙে ফেলছে এমন শব্দ। জিজ্ঞেস করি, কে?
পু–দরজা খুলুন।
ত–না, দরজা খুলবো না। কে আপনি?
পু–আমি পুলিশ সুপার। আপনাকে এক্ষুণি চলে যেতে হবে রাজ্য ছেড়ে।
ত–কিছু বুঝতে পারছি না কী বলছেন।
পু–দরজা খুলুন।
ত–আমি দুঃখিত, এত রাতে আমি দরজা খুলবো না। যা বলবেন সকালে বলবেন।
পু–সকালে বললে চলবে না। আপনাকে বেরিয়ে যেতে হবে। মুখ্যমন্ত্রীর অর্ডার।
ত–আপনি রিসেপশন থেকে ফোন করুন ঘরের ফোনে। আমি কথা বলছি।
রিসেপশান থেকে ফোনে আমাকে পুলিশের বড় কর্তা বললেন–আপনি এক্ষুণি। হোটেল ছাড়ুন।
ত–হোটেল ছেড়ে আমি যাবো কোথায় এত রাতে?
পু–সে আপনার ব্যাপার, আপনি কোথায় যাবেন।
ত–এখন তো কোনো ফ্লাইট নেই কলকাতায় যাওয়ার।
পু–আমরা অত কিছু জানি না। শুধু জানি আপনার রাজস্থানে থাকা চলবে না।
ত–কেন চলবে না?
পু–আমাদের এখানে মুসলমানরা অসন্তুষ্ট হতে পারে। ল এণ্ড অর্ডার প্রবলেম হতে। পারে। সে কারণে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন আপনাকে রাজস্থান ছাড়তে।
ত–কিছু কি প্রবলেম হয়েছে এর মধ্যে?
পু–হয়নি। কিন্তু যে কোনও সময় হতে পারে।
ত–মানে ‘হতে পারে’ অনুমান করে আমাকে চলে যেতে বলছেন।
পু–হ্যাঁ।
ত–সে আমি ছাড়বো হোটেল। সকালটা হতে দিন। আমি এয়ারপোর্টে চলে যাবো কলকাতার ফ্লাইট ধরতে।
পু–সকাল হতে দিতে পারছি না। সকালের আগেই যেতে হবে। সূর্য ওঠার আগে।
ত–সূর্য ওঠার ঠিক কত আগে বলুন।
পু–আপনাকে পাঁচটার আগেই বেরিয়ে যেতে হবে।
ত–ঠিক আছে।
পু–পাঁচটার পাঁচ মিনিট আগেই আপনি রুম ছেড়ে নিচে নেমে আসবেন। গাড়ি অপেক্ষা করবে আপনাকে এয়ারপোর্টে নেওয়ার জন্য।
ঠিক আছে বলে ফোন রাখলাম। সত্যি বলতে কী, স্বস্তি পেলাম অনেক। এই রাষ্ট্র হয়ে যাওয়া ঠিকানা যত শীঘ্র সম্ভব ত্যাগ করা উচিত। রাজস্থান ছাড়তে হবে, কলকাতায় ফেরার জন্য এ চমৎকার একটি কারণ। আমি হয়তো একটুখানি ঘুমিয়ে নেওয়ার সময় পেলাম, দাদা একেবারে ঠায় বসে রইলো বিছানায়। দাদাও বাবার মতো, ভোরে কোথাও যাওয়ার থাকলে সারারাত বসে বসে ভোর হওয়ার অপেক্ষা করে। ভোর পাঁচটায় নিচে নেমে দেখি পুলিশ আর সাংবাদিকদের ভিড়ে গিজগিজ করছে রাস্তা। ক্যামেরা আর সাংবাদিক ঠেলে সরিয়ে পুলিশ আমাকে গাড়িতে ওঠালো। এক সারি গাড়ি চললো। আমার গাড়ির পেছনে আরও পুলিশের গাড়ি, পুলিশের গাড়ির পেছনে সাংবাদিকদের গাড়ি। গাড়ি চলছে তো চলছেই। একসময় আমার খটকা লাগে, গাড়ি এত চলছে কোথায়! বিমান বন্দরে পৌঁছোতে তো এত সময় লাগার কথা নয়। জিজ্ঞেস করলাম, ‘এত সময় লাগছে কেন এয়ারপোর্টে যেতে?’
গোঁফওয়ালা ডাকাত-ডাকাত দেখতে কয়েকজন পুলিশ গাড়িতে। পেছনের সিটে কিছু, সামনের সিটে কিছু, মাঝখানের সিটে আমি আর দাদা। আমার প্রশ্নের কেউ কোনও উত্তর দিল না। আমি আবারও জিজ্ঞেস করি। কোনও উত্তর নেই। আবারও।
ত–এয়ারপোর্টে যেতে এত দেরি হচ্ছে কেন? এয়ারপোর্ট তো এত দূরে নয়।
পু–যাচ্ছি না এয়ারপোর্টে।
ত–তবে কোথায় যাচ্ছেন?
পু–দিল্লি।
ত–দিল্লি কেন?
পুলিশ চুপ।
ত–দিল্লি কেন যাবো আমি? আমি কলকাতায় ফিরবো। আমাকে এয়ারপোর্টে নিয়ে যান।
পুলিশ চুপ।
ইংরেজি বোঝে না। দাদাকে বললাম, হিন্দিতে বলতে। দাদা হিন্দি আমার চেয়ে ভালো জানে। কিন্তু হিন্দিতে জিজ্ঞেস করা প্রশ্নেরও কোনও উত্তর নেই। ওরা নিজেদের মধ্যে রাজস্থানী ভাষায় কথা বলতে থাকে। যেন আমাদের কোনও প্রশ্নই ওরা শুনতে পায়নি অথবা আমরা যে আছি গাড়িতে, সে বেমালুম ভুলে গেছে।
