আমার দুঃস্বপ্নের মধ্যে কখনও এমন ছিল না যে ভারতেও আমাকে বাংলাদেশের মতো ভুগতে হবে। এক দেশে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ, আরেক দেশে সংখ্যালঘু, কিন্তু দাপট প্রায় একই। ধর্মান্ধতা, অসহিষ্ণুতা, মেরে ফেলা, কেটে ফেলা, মুণ্ডু চাওয়া, প্রগতি, বিজ্ঞান ইত্যদিকে বাজে কাগজের মতো উড়িয়ে দেওয়া সব এক। আমাকে মেরে তাদের লাভ কী হবে, মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে। মৌলবাদী নেতারা ভালো করে জানে যে এতে তাদের লাভ থাকলেও থাকতে পারে, ইসলামের কোনও লাভ নেই। ইসলাম যেমন আছে, তেমনই থাকবে। ইসলামকে স্পর্শ করার সাধ্য আমার কেন, কোনও প্রাণীরই নেই। ধর্ম ধর্মের মতো থাকে, মানুষ ধর্ম আঁকড়ে ধরে নয়তা ধর্ম থেকে দূরে সরে। মৌলবাদের চেহারা পৃথিবীর সব দেশে এক। তাদের ভাষা এক, তাদের ক্রুরতা এক, চরিত্র এক, তাদের স্বপ্ন এক। সমাজকে কয়েক হাজার বছর পেছনে ঠেলে দেওয়ার আরামটা পেতে চায়, ও থেকে বঞ্চিত হওয়ার আদৌ কোনোও ইচ্ছে নেই কারও।
ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে আমার পৃথিবী। শহর জুড়ে যেমন ইচ্ছে ঘুরে বেড়ানোর মানুষ আমি। এখন আমার হাতে পায়ে শেকল। সব বলে ফেলার মানুষ আমি, এখন আমার জিভে সেলাই। বাইরে নৃশংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিল, আমি অংশ নিতে পারছি না। বাইরে চলচ্চিত্রের, নাটকের, গানের উৎসব, আমি উপভোগ করতে পারছি না। আমাকে একটি দরজা জানালা সাঁটা ঘরে দমবন্ধ অবস্থায় বসে থাকতে হবে। না, একে আমি আমার নিয়তি মানছি না। আমি এখনও বিশ্বাস করছি, আমি স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবো। এখনও বিশ্বাস করছি, ভারত আমাকে সেই শাস্তি দেবে না, যে শাস্তি মৌলবাদ অধ্যুষিত বাংলাদেশ দিয়েছে। এখনও বিশ্বাস করছি, এ দেশই আমাকে নিরাপত্তা দেবে। মানুষের ভালোবাসাই আমার নিরাপত্তা হবে। আমি এ দেশেই বাকি জীবন নিশ্চিন্তে নির্বিঘ্নে কাটাতে পারবো। এই দেশকে আমি ভালোবাসি। এই মাটিকে আমি নিজের মাটি বলে ভাবি। এই দেশও যদি আমাকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়, তবে আমার শেষ ভরসা, শেষ অবলম্বন, আমার শেষ স্বপ্নকে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করা ছাড়া আর কিছু নয়।
আমার তো যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। কোনো দেশ নেই, কোনো ঘর নেই, এক ভারতবর্ষই দেশ আমার। এখানেই আমার ঘর। সত্য বলার অপরাধে আমাকে আর কত শাস্তি দেবে ধর্মবাদীরা আর ধর্ম ব্যবহার করে ভোট পেতে চাওয়া রাজনীতিকরা? এই যে এত ভোগান্তি, এত লাথি, এত গুঁতো, এত ঘাড় ধাক্কা। এত কিছুর পরও আমার স্বপ্ন আমি সম্পূর্ণ ত্যাগ করতে পারি না। এখনও স্বপ্ন দেখি যে উপমহাদেশের একজন সৎ, সত্যবাদী, সেকুলার লেখকের জন্য ভারতবর্ষই দেশ, সবচেয়ে নিরাপদ দেশ।
০৭. ফেয়ারওয়েল, ২২ নভেম্বর, ২০০৭
গতকাল সকালে ছোট একটা মিছিল বেরিয়েছিল পার্কসার্কাসে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘নন্দীগ্রাম তাণ্ডব’, ‘রিজওয়ান হত্যা’, আর ‘তসলিমা হঠাও’ নিয়ে কিছু একটা হবে। গোটা পঞ্চাশেক মৌলবী রাস্তায় ঘোরাঘুরি করছিল। এরা কেউই আন্দোলনের মতলব নিয়ে এসেছে বলে মনে হয়নি। বাড়িতে ঘুমোচ্ছিল হয়তো, ঠেলে রাস্তায় নামানো হয়েছে। পুলিশ সবাইকে ভ্যানে উঠিয়ে নিয়ে চলে গেছে। এদের মাতব্বরটিকেও। মাতব্বরটি ‘অল ইণ্ডিয়া মাইনরিটি ফোরাম’এর নামে প্রায়ই এ ধরনের গণ্ডগোল সৃষ্টি করার উদ্যোগ নেয়।
কিন্তু এর পর পরই দেখা গেল পার্কসার্কাসের এক গলি থেকে অল্প বয়সের কিছু ছেলে বেরিয়ে পুলিশের দিকে ঢিল ছুঁড়তে লাগলো। ছুঁড়ে মারতে লাগলো কোক খেয়ে কোকের বোতল, আর হিহি হাসি। পুলিশেরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওদের মার খেলো আর মাঝে মাঝে কাঁদানে গ্যাস ছুড়লো। লুঙ্গি আর স্যাণ্ডো গেঞ্জি ছেলেরা হুল্লোড় করতে করতে গাড়ি পোড়াতে লাগলো, বাস ট্রাক পোড়াতে লাগলো, সাংবাদিকদের ক্যামেরা ভাঙতে লাগলো। এই ভাংচুর, এই জ্বালাও পোড়াও, এই হৈ-হল্লা অনেকটা সংক্রামক, এর পেছনে কোনও উদ্দেশ্য থাকার প্রয়োজন হয় না। অনেকটা পকেটমারকে পেটানোর মতো। পিটিয়ে আনন্দ। পার্কসার্কাসের রাস্তায় পুলিশ আর গাড়ি বা কিছু চলতে দিচ্ছে না। সারা শহরে ট্রাফিক জ্যাম শুরু হয়ে গেল। দুতিনটে ছেলে গলির ভেতর কাগজে ‘তসলিমা গো ব্যাক’ লিখে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালো। কলকাতার কয়েকজন বন্ধুকে ফোনে জিজ্ঞেস করি, ‘কারা ওরা?’ প্রায় সবাই বললো, ‘ওরা জানে না তসলিমা কে, কী জিনিস, তসলিমার বই কোনোদিন পড়েনি, উর্দুভাষী অশিক্ষিত বা অল্পশিক্ষিত মুসলমান, পকেটমার, ছিচকে চোর, মুদির দোকানি, ফেরিঅলা। ওদের নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই। ওদের পথে নেমে ঠিক যা যা করতে বলা হয়েছে, সব করছে ওরা। আমি হতবাক বসে থাকি। টেলিভিশনে যা দেখলাম, নীল পোশাকের অভিজ্ঞ পুলিশ র্যাফ নামলো, সেনা নামলো। শহরময় টহল দিল। কাফু জারি হল। আর রাতে সিপিএমএর রাজ্য সম্পাদক বিমান বসু বললেন, ‘তসলিমাকে নিয়ে ঝামেলা হলে তসলিমার এ শহর ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত।’
পুলিশের নিরাপত্তা প্রধান আগেও যেমন জানিয়েছিলেন, সেদিনও এবং পরদিনও জানালেন আমাকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত একেবারে পাকা। মৌলবাদীরা আসছে আমার বাড়িতে, শুক্রবার নামাজের পর। আগেও জিজ্ঞেস করেছিলাম, এবারও করি, ওদের অ্যারেস্ট করছেন না কেন?
