তুমি ব্যস্ত মানুষ। তোমাকে প্রতিদিন লিখতে বলবো, এমন সাহস আমার নেই। এই কথা বলে রোজ আমাকে লেখার হাত থেকে নিস্তার চাইছো! সেটি হচ্ছে না। যতো ব্যস্তই থাকি না কেন, রোজ তোমাকে লেখার মত সময় আমার আছে। কাছে থাকলে রাতে যেটুকু সময় আমি তোমাকে দিতে পারতাম, চিঠি লিখতে তার চেয়ে অনেক কম সময় নেয়। যেহেতু তুমি কাছে নেই, কাজেই আমি রোজই তোমাকে লিখতে পারি, এবং লিখব। তোমার অত রাতটা কোথায়? সাড়ে দশ কি রাত? সে তো সন্ধ্যা। এইটুকু রাত্রি জাগার অভ্যেস এখন থেকে না করলে পরে বিপদে পড়বে তো! একেবারে নির্ঘুম প্লাবনের রাত তো আসবে, সেই সব জলোচ্ছঅ!সের রাতে কি করবে? চন্দনাকে আমি একটি বণর্ও মিথ্যে লিখিনি, বরং অনেক কম করে বলেছি। কেন, আমি কথা না বল্লে কথা বলা যায় না? আমি মখু না তুল্লেও তুমি মখু তুলতে পারো না? সম্পর্কের সবটুকু দায়িত্বই কি আমার? ভাগাভাগি তো সবকিছুর আধাআধি করা হয়েছে। এখানে কেন তবে পুরোটা আমার হবে? তুমি গাল ফুলিয়ে রাখো, চোখ রাঙিয়ে রাখো, আমি আমার আদরের হাত সঙ্কুচিত করি। প্রশ্নই আসে না। তোমার আদরের হাত কি কখনো প্রসারিত থাকে? যে হাত প্রসারিত নয় তার আর সংকোচন কি? কেন, আমি তোমার অভিমান ভাঙাই না? তুমি না ডাকলেও আমি কাছে যাই না? তুমি কথা না কইলে আমি কথা কইনা? তুমি মুখ না তুল্লেও কি আমি আদরের ছোঁয়ায় তোমার মখু তুলি না? তোমার নিরুত্তাপ চোখ জোড়াকে আদরে ভেজাই না? তাহলে তুমি পারো না কেন? আজো আমি অভিমানের ভাষা বুঝতে পারি না। যে বুঝেও সবকিছু না বোঝার ভান করে পৃথিবীর কোন শক্তি আছে তাকে বোঝায়! আজ আশ্বিনের আট। পরিচয়ের আজ তিন বছর চার দিন। কি রকম মনে হয় জানো? মনে হয় হাজার বছর ধরে আমি তোমাকে চিনি। হাজার বছর আগে আমাদের দেখা হয়েছিল। কখন কি ভাবে দেখা হয়েছিল মনে নেই। শুধু মনে আছে এক রোদে পোড়া মন একখানি শ্যামল করতল পটে কোনও কথাহীন নিঃশব্দে এসে লিখেছিলো একখানি কথা—আমি। যেন আমরা অনন্ত সময় ধরে পরস্পরকে খুঁজে ফিরছিলাম। একদিন দেখা হল। আর প্রথম দেখায় আমরা চিনে ফেল্লাম একজন আরেকজনকে। কোনো ভূমিকার প্রয়োজন হল না। দুজনেই মিলিয়ে নিলাম ভেতরে যে ছবি ছিলো তার সাথে। হ্যাঁ এই তো সে। যাকে বেদনার রঙ দিয়ে এঁকেছি। হৃদয়ের রক্ত দিয়ে লিখেছি যার নাম। নিভৃত কষ্ট আর নির্জন স্বপ্ন দিয়ে যাকে নির্মাণ করেছি এই তো সে। কোনো কথাহীন তাই এসে আমরা পরষ্পরের করতলে একটি কথা লিখলাম, আমি। অর্থাৎ আমি সেই যাকে তুমি নির্মাণ করেছো নিজের ভেতর।
নির্জন একটি ঘর, যেটি ময়মনসিংহে পাওয়া সম্ভব হয় না, তা যে ঢাকায় আছে তা রুদ্র বার বার বলে। আমাকে ঢাকায় যেতে বলে। কিন্তু ঢাকা যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হবে কি করে! একা একা ট্রেনে উঠে হয়ত ঢাকা যাওয়া সম্ভব হবে আমার, কিন্তু যেতে কে দেবে? শেষ অবদি ছোটদা ময়মনসিংহে এলে আমি গোঁ ধরি ঢাকা যাবো। ঢাকা কেন? ঢাকা থেকে সার্টিফিকেট আনতে হবে ফ্রার্স্ট প্রফ পরীক্ষার। ছোটদার সঙ্গে ঢাকা যাওয়া হয়, গিয়েই আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীনিবাসে ইশকুলের এক পুরোনো বান্ধবীর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি বলে বেরিয়ে যাই। বেরিয়ে সোজা রুদ্রর বাসাবোর ঘরে টোকা, ওরকমই কথা ছিল। রুদ্রর খুশির প্রকাশ নেই। আনন্দে লাফিয়ে ওঠা, কষ্ট পেয়ে চোখের জল ফেলা এসব রুদ্রকে দিয়ে হয় না। আপাদমস্তক একটি কাঠ। যা হচ্ছে যা ঘটছে ভেতরে। কাগজে তার প্রকাশ হয়। রুদ্র অবশ্য একই কথা বলে আমার সম্পকের্, আমি নাকি চিঠিতেই সহজসুন্দরস্বাভাবিক, সামনে নই। সামনে ওই একই, মরা কাঠ। রুদ্র আমাকে একটি শাড়ি দিল পরতে, শাদার ওপর ছোট ছোট ফুল পাতা প্রিন্ট শাড়ি, সঙ্গে সায়া ব্লাউজ, শাড়ি পরে বাইরে যেতে হবে। এ শাড়িটি রুদ্রর বোন বীথি পছন্দ করেছে। রুদ্র নিজে পছন্দ করে কখনও শাড়ি কেনেনি আমার জন্য, এর আগে সবুজ একটি সুতি শাড়ি কিনেছিল, সেটি কিনতেও সে তার বান্ধবী মুক্তিকে সঙ্গে নিয়েছে পছন্দ করতে। রুদ্রর জন্মদিনে আমি যা কিছু উপহার দিই, নিজে পছন্দ করে কিনি। কোন রঙের শার্টের সঙ্গে কোন রঙের প্যান্ট ভাল মানাবে, তা নিজেই বিচার করি। রুদ্র যখন অন্যকে আমার জন্য শাড়ি পছন্দ করতে বলে, আমার গায়ের রঙের কথা বলে, শ্যামলা রঙের মেয়েকে কোন রঙের শাড়ি ভাল মানাবে!মেয়েদের শাড়ি নাকি মেয়েরাই ভাল বোঝে। শাড়ির কথা জানাতে হয়েছে বলেই কি না জানি না রুদ্র বীথিকে জানিয়েছে আমাদের বিয়ের কথা, এমনকি মুক্তিকেও। সে রাতে আমাকে শাড়ি পরিয়ে একটি চিনে রেস্তোরাঁয় নিয়ে যায় সে। ওখানে রাতের খাবার খেয়ে ফিরে আসে বাসাবো। মুহম্মদ নূরুল হুদাকে সে আমাদের বিয়ের কথা জানিয়েছে, জানাতে হয়েছে, যেন রাতে ও বাড়িতে আমার থাকা অশোভন না দেখায়। আমার কাছ থেকে এ অবদি কেউ বিয়ের কথা জানেনি। রুদ্র জানাতে শুরু করেছে। এর আগেও দএু কজন বন্ধুকে সে জানিয়েছে। এই জানানোয় আমার উদ্বেগ হয় জেনেও জানিয়েছে। এ রাতটি রুদ্রর সঙ্গে থাকতে হবে। থাকতে হবেই। কিন্তু আমার তো যেতে হবে। যেতে হবে, ছোটদাকে বলে এসেছি ঘন্টাখানিক পর ফিরবো। গুল্লি মারো ছোটদা, তুমি আমার বউ, সেটিই তোমার সবচেয়ে বড় পরিচয়। কিন্তু এ পরিচয়ই নিয়ে, যে জীবন যাপন করছি আমি, তা করতে পারব না। বেশ পারবে। তবে কি আমি বাড়িতে বলব রুনুখালার ঘরে ছিলাম, যদি না ফিরি আজ রাতে! সে নিয়ে ভেবো না, আমি রুনুখালাকে বলে দেবক্ষণ ম্যানেজ করে নিতে। কিন্তু রুনুখালা কি মানবেন? মানবেন না কেন, তাকে জানিয়ে দেব যে বিয়ে করেছি। অসম্ভব। তোমার অসম্ভব নিয়ে পড়ে থাকো তুমি, আমি যা করার করব। আজ রাত রুদ্রর সঙ্গে কাটাতে হবে এ রুদ্রর আবদার অনুরোধ দাবি আদেশ সবই। রুদ্র বলে, আজ রাতে আমি তোমাকে সম্পণূর্ করে চাই। সম্পণূর্ মানে? সম্পণূর্ মানে সম্পণূ র্। কোনও বাকি রাখা নেই। এর অর্থ অনুমান করে আমার ভেতরে কোথাও কেঁপে ওঠে, সময় যত ঘনিয়ে আসে, তত আমার কোথাওএর কাপঁ নটি শরীরে ছড়াতে থাকে। দিন যত রাতের দিকে এগোয়, তত শ্বাস দ্রুত হয়। নিজেকে বোঝাই, আমি তো কোনও অন্যায় করছি না, আমি আমার স্বামীর সঙ্গে বৈধ ভাবে রাত কাটাবো, আমার বয়সী হয়ে হাসিনা যদি এ কাজটি পারে আমি কেন পারব না! আমার ক্লাসের মেয়ে মদিরা ক্লাসেরই এক ছেলে শওকতকে লুকিয়ে বিয়ে করেছে, অনেকে বলে লুকিয়ে নাকি মদিরা শওকতের হোস্টেলের ঘরে যায়, রাত কাটায়। ও যদি পারে, আমি কি এমন কচি খুকি রয়ে গেছি যে পারব না!
