রুদ্র ময়মনসিংহে আসে দেখা করতে। যেদিন আসার কথা থাকে আসতে পারে না। আমি দীর্ঘক্ষণ প্রেস ক্লাবের ক্যান্টিনে অপেক্ষা করে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরে আসি। কথা দেওয়া তারিখে সে যে সবসময় আসতে পারে, তা নয়। তবে যে করেই হোক, সে তারিখে না হোক, কাছাকাছি অন্য একটি তারিখ বেছে চলে আসে। কলেজ ক্যান্টিনে চা সিঙ্গারা ছাড়া অন্য কিছু পাওয়া যায় না তাছাড়া কলেজ ক্যান্টিন কলেজের ছাত্রছাত্রীর জন্য, ক্যান্টিনে রুদ্রর উপস্থিতি লোকে প্রথম প্রথম আড়চোখে দেখত, এখন বড় বড় চোখ করে দেখে। আসাদ আর আনোয়ারের সঙ্গে রুদ্রর জমে ওঠাটিও খুব ভাল চোখে দেখা হয় না। আসাদ আর আনোয়ারকে মেডিকেলের খারাপ ছাত্র তো বটেই গুণ্ডা ছাত্র বলে মনে করা হয়, মেডিকেলে ঘটা যে কোনও খারাপ কাজের জন্য ওদের দায়ি করা হয়। ওরা মদ খায় বলেও গুঞ্জন আছে। রুদ্রকে কলেজের ক্যান্টিনে দেখে একদিন কথা বলতে এল আসাদ, দুজন নাকি একই কলেজে লেখাপড়া করেছে, একই ক্লাসে। ব্যস, হয়ে গেল। জমে গেল। ত্রাস দুটিকে যথাসম্ভব এড়িয়ে চলে ছাত্রছাত্রীরা, এক পথে ওদের আসতে দেখলে, বিশেষ করে ছাত্রীরা, অন্য পথ ধরে। কিন্তু ত্রাসদুটি আমাকে রুদ্রর সঙ্গে জমে ওঠার পর খাতির করে, কি নাসরিন কেমন আছো বলে এগিয়ে আসে দুজনই। আমারও হেসে বলতে হয় ভাল। ধীরে ধীরে একটি জিনিস আমি উপলব্ধি করি, ওরা আমার জন্য ত্রাস নয়, আর যার জন্যই হোক। রুদ্র না থাকলেও ওদের সঙ্গে বসে ক্যান্টিনে চা খেয়েছি, আসাদের হাতের কব্জিতে ব্যান্ডেজ বা আনোয়ারের কপালে কাটা দাগ হয়ত থাকে, কিন্তু কখনও মনে হয়নি ওরা খারাপ লোক, বরং অনেকের চেয়ে অনেক আন্তরিক আর সৎ মনে হয় ওদের। মাঝে মাঝেই ওরা বুক ফুলিয়ে বলে কেউ তোমারে ডিসটার্ব করে কিনা জানাইও, নাকের হাড্ডি ভাইঙ্গা দেওয়ার জন্য আমরা রেডি আছি। আসাদ আর আনোয়ারের সঙ্গে রুদ্রর আড্ডা দেওয়া অন্য ছাত্রদের চোখ আরও বড় করে। দুপুরবেলা চা সিঙ্গারা খেয়ে আমাদের দুপুরের পেট কামড়ে ধরা ক্ষিধেও মরে না, একসময় উঠতেই হয়। কলেজে আসা যাওয়ার পথে সি কে ঘোষ রোডের প্রেস ক্লাবের ক্যান্টিনটি আবিস্কার করে ওতেই আজকাল দেখা করি রুদ্রর সঙ্গে। প্রেসক্লাবের ক্যান্টিনে যে হলুদ রঙের বিরানি পাওয়া যায়, তা রীতিমত বিখ্যাত। রামপ্রসাদ বাবু মারা যাওয়ার পর তার ফটো টাঙিয়ে ফটোর ওপর মালা ঝুলিয়ে বাবুর ছেলে হরিপ্রসাদ নিজেই এখন সেই বিখ্যাত বিরানিটি রাঁধে। দুপুরে গিজগিজ ভিড়ের মধ্যে খাওয়া হয়, খেয়ে দেয়ে সব চলে যায়, আমরা বসে থাকি, আমাদের কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই বলে। প্রেস ক্লাবের কর্মচারি আমাদের আড়ে আড়ে দেখে, দেখে যে আমরা যাচ্ছি না, একটু পর পর চা খেয়ে খেয়েও থেকে যেতে চাইছি। কোথাও কোনও নির্জন ঘরের ব্যবস্থা আমি করে রাখি না বলে রুদ্র অনুযোগ করে, মখু গোমড়া করে বসে থাকে। কর্মচারিরা ক্রমাগত আমাদের ইঙ্গিত করে উঠে যেতে, চেয়ারগুলোকে শব্দ করে করে টেবিলের ওপর উপুড় করে রাখে, ওতেও যখন কাজ হয় না, মুখেই বলে দেয় ক্যান্টিন বন্ধ এখন। আমাদের ক্যান্টিন থেকে বেরোতে হয়, কিন্তু যাওয়ার কোনও জায়গা নেই। একটু নির্জনতা খুঁজে বেড়াই সারা শহরে, জোটে না। অবশেষে মেডিকেল কলেজ চত্বর বিকেলে যখন নির্জন হয়ে আসে, বসি দুজন। দশ বছর বয়সী একটি পঙ্গু ছেলে পাশের বস্তি থেকে প্রায়ই হাঁটুতে হেঁটে এসে আমার পাশে বসে থাকে, ওর সঙ্গে কথা বলতে যত সহজ বোধ করি, রুদ্রর সঙ্গে নয়। ছেলেটির নাম দুলাল, বাবা নেই, মা আছে, অভাবের সংসার, নিজে ভিক্ষে করে সংসার চালায়, দুলালকে দু তিন টাকা যা থাকে পকেটে, দিই। জীবনের নানা রকম কথা রুদ্রর সঙ্গে বলি। চন্দনার কথা, চন্দনা ঢাকা এসেছে, স্বামীর বোনের বাড়ি উঠেছে, রুদ্রকে দেখা করতে বলি চন্দনার সঙ্গে, কেমন আছে ও, দেখে আসতে বলি, যদি দেখা করতে যায়, তবে তো কিছু আমি হাতে দিতে পারি, কি দিতে পারি, আমার ভাণ্ডারে যে একটি দামি জিনিস আছে, সেটিই দিই, দাদা তাঁর বিয়ের সময় যে হলুদ কাতান শাড়িটি দিয়েছিলেন, সেটি। চন্দনার জন্য মন কেমন করা, বিয়ের পর দাদার বদলে যাওয়া, ছোটদার না থাকার কারণে আমার একা হয়ে যাওয়া, পড়াশোনা ভাল না হওয়া ইত্যাদি কথা মৃদু স্বরে একটু একটু করে রুদ্রকে বলি। রুদ্র বার বার আমার কোমর জড়িয়ে ধরে কাছে টানে, চুমু খেতে চায়। বার বার তার হাত যায় বুকে। যে কোনও সময় যে কেউ দেখবে বলে রুদ্রর হাত সরিয়ে দিই। তাছাড়া নিজের লজ্জাটিও একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। দুজনের জন্য কোনও নির্জন ঘরের ব্যবস্থা করতে পারি না বলে সে অভিমান করে বসে থাকে, কথা না বলে। ইচ্ছে করে রুদ্রর ঠোঁটদুটো স্পর্শ করি আঙুলে, চোখের ওপর আলতো আঙুল রাখি। ইচ্ছে করে রুদ্রর উষ্ণ হাত ধরে হেঁটে বেড়াই খালি পায়ে। সবুজ ঘাসে খালি পায়ে হাঁটতে আমার বড় ভাল লাগে। ঘাসের ডগার স্পর্শ আর শিশিরের শীতলতা পেতে চায় পা। আমার সম্বোধনহীন আড়ষ্টতা, বিয়ের পরও এ রকম শুকনো দেখা হওয়ায় রুদ্র মন খারাপ করে ঢাকা ফিরে যায়। প্রতিদিন যেন চিঠি লিখি, বার বার অবশ্য বলে যায়। যেন লিখি রাত দশটার পর, ঠিক সে সময় সে আমাকে ভাববে, ভাববে যে আমি তাকে লিখছি, তাকে মনে করছি। রুদ্র চলে যাওয়ার পর আমি বাড়ি ফিরে লম্বা ঘুম দিই, পড়ে পড়ে আমার এমন ঘুমোনো দেখলে ইয়াসমিন সন্দেহ করে যে রুদ্র এসেছিল। ছোটদা ময়মনসিংহ ছাড়ার পর ইয়াসমিন ধীরে ধীরে আমার ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছে বাড়িতে। ওর সঙ্গে সখ্য আমার খুব, চুলোচুলিও কম নয়। আমার চেয়ে গায়ের শক্তি ওর বেশি থাকায় আমাকে বরাবরই রণে ভঙ্গ দিতে হয়। ইয়াসমিনকে আমি পেটের সব কথা বলি, অথচ রুদ্রর যত কাছে আসছি, তত আমি নিভৃত হয়ে উঠছি। রুদ্রর জন্য বাড়তে থাকা আমার বেয়াড়া আবেগের কথা ইয়াসমিনকে বলতেও সঙ্কোচ হয়। বাৎসায়নের একটি ইংরেজি পকেট বই রুদ্র আমাকে পড়তে দিয়ে গেছে, বইটি পড়া তো হয়ই না, বরং কোথায় লুকোনো যায়, কোথায় লুকোলে ইয়াসমিনের চোখে পড়ার আশঙ্কা নেই, এ নিয়ে আমার দুশ্চিন্তার ঘোড়া লাগাম ছিঁড়ে ছুটতে থাকে। বইটি নিজের কাছে রাখার বরাদ্দ সময় ফুরিয়ে যায় বইটি লুকোতে লুকোতেই।
