এর পর খুব বেশিদিন সময় নেয়নি নেপথ্যের সেনাঅধিনায়কের চেহারামোবারক প্রদর্শন করতে। আরেকটি শান্তশিষ্ট লেজবিশিষ্ট ক্যু। দেশে সামরিক শাসন জারি হয়ে গেল। জিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করে এরশাদের যাত্রা শুরু হল। এক সেনা আরেক সেনার পদাঙ্ক অনুসরণ করেই চলেন। মেজর জেনারেল মঞ্জুর এবং তার সঙ্গী সাথীকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়ে গেল। জিয়া যেমন জাতীয়তাবাদি দল তৈরি করে হ্যাঁ না ভোটের মাধ্যমে অবৈধ ক্ষমতা দখলকে বৈধ করেছিলেন, এরশাদও তেমন। এরশাদও একইরকম নিজের একটি দল গঠন করে রাজনীতিতে নেমে বৈধ করে নিলেন নিজের অবৈধ আগমন। উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ! সমাজতন ্ত্র না থাক,তাই বলে কি যৎসামান্য গণতনও্ত্র দেশটির ভাগ্যে নেই! দেশের জন্য মায়া হয় আমার, দুশ্চিন্তা বাড়ে। যেসব রাজনৈতিক নেতা এক দল থেকে আরেক দলে নাম লেখায়, তারা, ক্ষমতায় যেই আসে, তার প্রতিই আকৃষ্ট হয়। চরিত্রহীন ছাড়া এদের অন্য কিছু মনে হয় না আমার। একটি বিশ্বাস আমার ভেতর দিন দিন ঘনীভূত হয়, রাজনৈতিক নেতাদের এমন দুর্বল চরিত্রের কারণে সামরিক বাহিনীর স্পর্ধা হয় বন্দুকের নলের মুখে দেশের দখল নিতে।
রাজনীতি ভাবনা, কাব্য ভাবনা সব ভাবনা দূর করে আমাকে পরীক্ষার জন্য তৈরি হতে হয়। এ পরীক্ষায়, যেহেতু আমি পরীক্ষা দেব, বাবা পরীক্ষক হতে পারবেন না। পরীক্ষক হিসেবে তিনি অন্য কলেজে চলে গেলেন, এ কলেজে সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে আসা নতুন অধ্যাপক আবদুল্লাহ, যাঁর ক্লাসে ছেলেমেয়েরা বেশির ভাগই প্রক্সি মেরে কেটে পড়ে, সহকারি অধ্যাপককে নিয়ে ইন্টারনাল পরীক্ষক হিসেবে রইলেন। আমার ক্লাসের বন্ধুরা হায় হায় করছে খবর শুনে, আমাকে দেখেই বলছে, ধৎু , তোমার কারণে রজব আলী স্যাররে আমরা পাচ্ছি না। রজব আলী স্যার ইন্টারনাল হিসেবে ভাল, নিজের কলেজের ছাত্রছাত্রীদের পাশ করানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন, এ কথা কলেজের প্রায় সবাই জানে। কিন্তু নিয়ম তো পাল্টানো যাবে না, পুত্র-কন্যা পরীক্ষাথীর্ হলে পিতা বা মাতা পরীক্ষক হতে পারেন না। অসন্তুষ্ট ছাত্রছাত্রীরা কড়া এক্সটারনাল আর মেন্দামারা ইন্টারনাল এর সামনে মৌখিক দিল ভয়ে কেঁপে কেঁপে। কারওরই তখন মনে হয়নি বিষয়টি নিতান্তই গৌণ, পচা শামুক।
১৫. কাগজের বউ
ডালিয়া জাহানের ঠিকানায় রুদ্রর চিঠি আসতে থাকে নিয়মিত। কখনও মোংলা বা মিঠেখালি থেকে, কখনও ঢাকা থেকে। রুদ্রর চিঠি হাতে নিয়ে টের পাই বুকের মধ্যে কেমন করা।চঠি যেদিন পাই, এক অমল আনন্দ আমাকে সারাদিন ঘিরে থাকে।
তুমিহীন একটি মুহূতর্ এখন যে কত দুঃসহ তা তোমাকে কোনো ভাবেই বোঝাতে পারলাম না। তোমাকে ছাড়া আমার দিনগুলো যে কি রকম বিশৃঙ্খল আর কি রকম অসংযত তুমি তো তা বুঝতেই চাও না। জানি, অনেক সমস্যা আছে, এ মুহূর্তে তোমাকে কাছে পেতে গেলে হাজার হাজার সমস্যা জেঁকে বসবে। পরেও কিন্তু এ সমস্যাগুলো আমাদের নিস্তার দেবে না। কাজেই যে সমস্যাকে একদিন না একদিন মোকাবেলা করতে হবে তাকে এখনই সামনে নিয়ে আসা উচিত। লুকোচুরি করে তো আর সমস্যার সমাধান করা যাবে না। এজন্যেই দাদার সাথে দেখা করতে চেয়েছিলাম। আমরা বিয়ে করেছি এটা জানাতে চেয়েছিলাম, তুমি শুনলে না। আমার দিন আর রাত্রিগুলোকে অসংযম আর অনিয়মের মধ্যে ছুঁড়ে দিয়ে তুমি খুব সুখে আছো। তোমার এই উদাসীন ভাল থাকা আমাকে ভীষণ ঈর্ষাকাতর করে তোলে। আমি পারি না। আমি কোনোভাবেই নিজেকে বাধ্য রাখতে পারি না।
আকাশে মেঘের মত প্রতিদিন স্বপ্ন জমে বৃষ্টি হয় না। তুমিহীন দিন যায়, রাত্রি যায়। তোমার স্পর্শহীন এই ঊষর প্রান্তর…। কতদিন তোমাকে দেখি না! কতদিন তোমার আনতচোখদুটিকে আদর করি না! ভীষণ কুয়াশাচ্ছত তোমার চোখ, ভীষণ মেঘলা আর ভীষণ সুদূরের। কবে আমি ওই কুয়াশা পার হয়ে তোমাকে ছোঁবো! কবে আমি ওই মেঘের মানে বুঝতে পারব! অপেক্ষায় ক্লান্ত হয়ে পড়ি। প্রতীক্ষা আর ফুরোয় না। প্রিয় স্পর্শ নেই, দিনগুলো প্রাণহীন! প্রিয় স্পর্শ নেই, রাত্রিগুলো কি শীতল আর ক্লান্তিময়! এই শীতল আধাঁরে তুমি রোদের উত্তাপ নিয়ে কবে আসবে? আজ মন ভাল নেই, নির্জন আর সেই খুব শান্ত কষ্টগুলো সারাদিন আজ আমার বুকের ভেতরে জমে উঠেছে। কোনও ভাষায় আমি এই কষ্টগুলো বোঝাতে পারি না। মেঘলা আকাশের মত ভারি, শীতল আর কি শান্ত এই কষ্ট আমার!আজ আমার মন ভাল নেই। আজ খুব শীতল কষ্ট।
রুদ্রর কষ্টগুলো উপলব্ধি করার চেষ্টা করি আমি। কিন্তু আমার পক্ষে তার ইচ্ছেকে পণূর্ তা দেওয়া সম্ভব হয় না। রুদ্র স্বামীর দাবি নিয়ে বলে, বাড়িতে বল যে বিয়ে করেছি, নিজে বলতে না পারো কাউকে দিয়ে বলাও। এও যে সম্ভব নয়, তা আমি বারবার বলি। কোনও কাউকে দিয়ে এ কথাটি উচ্চারণ করানো যাবে না, যে, আমি এক চালচুলোহীন কবি কে বিয়ে করে বসে আছি। রুদ্রর ধারণা বিয়ের কথা বাড়িতে জানালে বাবা আমাদের আড়ম্বর করে বিয়ে দেবেন, তারপর আমি রুদ্রর সঙ্গে সংসার করতে চলে যাব এ বাড়ি ছেড়ে অথবা রুদ্রই এ বাড়িতে জামাই আদরে থাকবে অথবা বাড়ি থেকে যদি আমাকে তাড়িয়েও দেয় তবে আমি হোস্টেলে থেকে লেখাপড়া চালিয়ে যাব, ছুটিছাটায় রুদ্রর কাছে ঢাকায় যাব অথবা এই কলেজ থেকে বদলি হয়ে অন্য কলেজে, যেন তার সঙ্গে সংসারও করতে পারি, কলেজেও যেতে পারি এমন অথবা অন্য কিছু অথবা লেখাপড়া ছেড়েই দেওয়া। সংসার করার জন্য রুদ্র উন্মাদ হলেও আমি হই না। রুদ্রই জীবনে একটি বড় অনিশ্চিতি, এরপর আরও একটি অনিশ্চিতিকে স্বাগত জানাতে আমার একবিন্দু সাহস হয় না।
