মাকে বলেছিলাম, মা এই যে কও বাবা বিয়া করছে, কই বাবা তো ওই রাজিয়া বেগমের বাড়িতে কখনও থাকে না।
রাইতে এই বাড়িতে থাকে, কারণ তর বাবা না থাকলে এই বাড়িতে চুরি হয়। যতবারই এই বাড়িতে চুরি হইছে, তর বাবা ছিল না বাড়িত। চোর খেদানোর লাইগা তর বাবা রাইতে বাড়িত ফিরে।
তাইলে রাজিয়া বেগমের বাড়িতে চোর খেদায় কে?
মা হেসে বলেন ওই বেটিরে দেখলে চোর নিজেই ডরাইব!
বাবার রহস্য যতই দেখি, ততই ইচ্ছে করে তাঁর ঘরের মতই অন্ধকার তাঁর রহস্যের চাদরখানা সরাই। মার ছোটখাট দুঃখগুলো, সখু গুলো এত চেনা, মার ঠোঁটের হাসি, বিরক্তি, এসবের কারণ এত স্পষ্ট, মা যেন পড়ে ফেলা বই, লিখে ফেলা খাতা। মা আমাকে কৌতূুহলি করে না, করে বাবা। মার ভালবাসা না চাইলেই পাওয়া যায়, বাবার ভালবাসা পেতে সাধনার প্রয়োজন। এরপরও নিশ্চিত হওয়া যায় না যে পাবই। জীবন নিয়ে অনেকটা জুয়ো খেলার মত। মার অঢেল ভালবাসা চোখে পড়ে না, বাবার দু মুহূর্তের নরম সুরের ডাক সারাদিনের জন্য মন ভাল করে দেয়।
মা বলেন মেয়েদের একটু বাবার দিকে টান বেশিই থাকে।
আমি জিজ্ঞেস করি, তাহলে কি ছেলেদের মায়ের দিকে বেশি?
মার মুখে আজকাল উত্তর নেই এর।
ছোটদা এ বাড়িতে বউ নিয়ে বেড়াতে এলে, বউ নিয়েই ঘরে শুয়ে থাকেন, অথবা বেরিয়ে যান একসঙ্গে। মার বড় শখ, ছোটদাকে পাশে বসিয়ে গল্প করেন, ছোটদার সময় নেই। বিয়ে করার পর দাদারও সময় হয় না।
বাবা যে বিষয়গুলোয় মন দেওয়ার জন্য বলেছেন, সে বিষয়গুলোর ক্লাস হয় রাতেও, হাসপাতালে। আমাকে প্রতি সন্ধেবেলা তিনি দিয়ে আসেন, আবার নিয়েও আসেন। রোগী বসে থাকে চেম্বারে, সেসব ফেলেই তিনি চলে আসেন এই কাজটি করতে। রহস্যে মোড়া বাবার ভালবাসা আমি টের পাই। তিনি আমাকে বলেন, আমি তাঁর স্বপ্ন পুরণ করছি, আমিই তাঁর মান সম্মান রাখছি, আমিই তাকে পিতা হিসেবে গৌরব দিচ্ছি। শুনে মন থেকে ঘুষের কারণে বাবার জন্য জন্মানো ঘৃণার পিণ্ডটি হৃদয় ফসকে পড়ে যায় ধুলোর রাস্তায়। আমার কষ্ট হতে থাকে বাবার জন্য। কষ্ট হতে থাকে কারণ একদিন তাঁকে বলতে হবে যে কাউকে না জানিয়ে আমি এক দাড়িঅলা লোককে বিয়ে করেছি, লোকটি লম্বায় আমার চেয়ে খাটো, লোকটি সাধারণ এমএও পাশ করেনি, কবিতা লেখা লোকটির পেশা, যে পেশায় মাসে দুশ টাকাও লোকটির আয় হয় না। কোন আবর্জনার স্তূপে ছুঁড়ে দেব বাবার মান সম্মান, বাবার গৌরব! আমি যত মনোযোগী হই লেখাপড়ায়, বাবার স্বপ্নের গোড়ায় তা জল সারের মত হয়ে চারা লকলক করে বড় হয়, বৃক্ষ হয়। যত বেশি বৃক্ষ হয়, তত আমার ভয় হয় যে নিজ হাতে এই বৃক্ষটি আমাকে উপড়ে ফেলতে হবে একদিন! দাদা বা ছোটদা কেউ বাবাকে সুখী করতে পারেনি। এক আমিই আছি সুখী করার। কিন্তু সুখের মাথায় পেছন থেকে যেদিন আমাকে কোপ বসাতে হবে! স্বস্তির গলা ফাঁস লাগিয়ে যেদিন ঝুলিয়ে রাখতে হবে! কি করে এই কাজটি আমি করব! নিজের ওপর বড় রাগ হয় আমার। বাবা যত আমাকে ভালবাসেন, তত নিজের ওপর ভালবাসা আমার উবে যেতে থাকে! বাবা আমাকে সারাপথ, মেডিসিনের লিভার সিরোসিস আজ যদি পড়ানো হয়, সেটি নিয়ে এমন চমৎকার বলতে থাকেন যে রিক্সায় বসে বাবার কাছ থেকে শুনে আমার যা শেখা হয়, সে শেখা বইপড়ে বা অধ্যাপকদের বড় বড় লেকচার শুনে হয় না। বাবার দোষগুলো আমি ছুঁড়ে দিতে থাকি গাঢ় অন্ধকারের দিকে যেন কেউ দেখতে না পায়। বাবাকে আমি বাবা বলে ডাকি না, তুমি বা আপনি কোনও সম্বোধনই করি না। তবু বাবাকেই মনে হতে থাকে আমার সবচেয়ে আপন। সম্বোধন না করার এই রোগটি বড় অদ্ভুত আমার। নানা নানি বড় মামা ফজলিখালা রুনখুালা রুনুখালা হাশেমমামা ফখরুল মামা কাউকে আমি কোনও সম্বোধন করি না। সবার সঙ্গেই কথা বলি, বলি ভাববাচ্যে। ভাববাচ্যে কথা বললে অনেক সময় কথা খোলসা করে বলা হয় না, সম্ভব নয়। আমি অনেক চেষ্টা করেছি ভাববাচ্য থেকে নিজেকে মুক্ত করতে, পারিনি। বড় হয়ে অনেকদিন ভেবেছি, কেন আমি ওঁদের সঙ্গে ভাববাচ্যে কথা বলি, কি কারণে! যখন ছোট ছিলাম, ওঁরা কি আমাকে ধমক দিতেন বা চড় কষাতেন, বা আড়ালে নিয়ে গিয়ে কান মলে দিতেন যে অভিমান করে কিছু ডাকিনি, আর না ডাকতে ডাকতে অভ্যেস হয়ে গিয়েছে না ডাকা! বড় হয়ে চাইলেও আর ডাক ফিরিয়ে আনতে পারিনি! মাকে দাদাকে ছোটদাকে সম্বোধন করি, তুমি বলি। বাবাকে চিরকালই দূরের মানুষ বলে মনে হত, বাবাকে সম্বোধন করি নি। কিন্তু নানিবাড়িতে বেড়ে ওঠা মেয়ে আমি, শরাফ মামাকে, ফেলু মামাকে ছটকুকে সম্বোধন করি, তুমি বলি। বাকিরা যাঁরা কাছে ছিলেন, তাদের কেন সম্বোধন করা হয়নি আমার, কাছে থাকলেও ওঁদের খুব দূরের মনে হত কি!
যে বিষয়গুলোকে জরুরি বলে বাবা আমাকে মন দিয়ে পড়তে বলেছেন, সেগুলোর জন্য সামনে আরও বছর পড়ে আছে বলে আমি রুদ্রে মন দিই। রুদ্র একটি নিষিদ্ধ ঘটনা আমার জীবনে, গভীর গোপন নিভৃত আনন্দ। রুদ্রর প্রতি আকর্ষণ এত তীব্র যে রুদ্রর চিঠি হাতে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সুখের রিনরিন সুর বাজে প্রাণে, সেদিন আমি সারাদিন ভাল থাকি। ফিরে চাই স্বণর্গ ্রাম, রুদ্রর দ্বিতীয় বই, মুহম্মদ নুরুল হুদার দ্রাবিড় প্রকাশনী থেকে বের হওয়া বই। দ্রাবিড় থেকে আরও কয়েকটি বই বের হয়েছে। রুদ্রর সঙ্গে মুহম্মদ নুরুল হুদার সম্পর্কে বেশ ভাল, ভাল বলেই রুদ্র এখন হল ছেড়ে বাসাবোতে নূরুল হুদার বাড়িতে একটি ঘর ভাড়া নিয়ে থাকে। আগে ছিল সিদ্ধেশ্বরীতে তার এক বন্ধুর বাড়ি, সেটি ছেড়ে উঠেছিল ফজলুল হক হলে, হল থেকে এখন ঘরে। সিদ্ধেশ্বরীর বাড়িটি কেন ছেড়েছিল! ছাড়তে হয়েছিল কাজী রোজির কারণে। কাজী রোজি কবি সিকান্দর আবু জাফরের বউ, রুদ্রকে নাকি বিরক্ত করত। রুদ্রর মত প্রতিভাবান তরুণের সঙ্গে ওই মধ্যবয়সী কাজী রোজি আগ্রহী ছিলেন হয়ত, কিন্তু তাই বলে রুদ্রর বাড়ি ছাড়তে হবে কেন? ব্যাপারটি বুঝিনি।
