নাই।
আইচ্ছা, আমার পুকুরের মাছ চাইরটা রাখেন। বলে চারটে বড় রুই মাছ আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে এক অচেনা লোকটি চলে গেল।
আমি খুশিতে বাগ বাগ চারটে রুই মাছ নিয়ে দৌড়ে রান্নাঘর, মা ধর, এক বেটা মাছ দিয়া গেল।
কে দিল, চিনস?
না।
রাখলি কেন?
বাহ দিল যে।
দিলেই রাখবি?
কেন কি হইছে? মাঝে মাঝে বাবার রোগীরা ত দিয়া যায়।
আর মাছ টাছ রাখবি না। শত সাধলেও না।
মার মখু থমথম করে। মাছগুলো থেকে দুহাত দূরে সরে বলেন,এইসব মাছ খাওয়া অন্যায়।
অন্যায় কেন?
পোস্ট মর্টেমের রিপোর্ট পাল্টাইতে তর বাবার কাছে তদবির করতে আসে এইসব লোক।
আমার মাথার ভেতর ঘুরপাক খায় শতরকম ভাবনা।
কোন দল আসে? যারা অন্যায় করে, না যারা নির্দোষ?
তা জানি না।
মা কি কোনও কথা লুকিয়ে রাখছেন পেটে! মার তো লুকোনোর পেট না মোটে।
যারা নির্দোষ, তারা খুশি হইয়া কিছু দিলে ত ক্ষতি নাই, মা শ্লথবেশে শ্লথ পায়ে কলপারের দিকে যেতে যেতে শ্লেষকণ্ঠে বলেন, দুই দলই আসে।
বাবা কি মিথ্যা রিপোর্ট দেন?
তা আমি কি কইরা জানব? আমি কি কোটের্ যাই দেখতে?
মাছ শেষ পর্যন্ত রাধাঁ হয়েছে। মা ওসব ছুঁয়েও দেখেননি। বাবা খেতে বসে,পাতে মাছের বড় বড় টুকরো নিয়ে বললেন, মাছ কোথেকা পাইলা?
মা বললেন ,এক লোক আইসা দিয়া গেছে।
শুনে কেশে পরিষ্কার গলা আরও পরিষ্কার করে বাবা বলেন, মাছটায় ধইন্যা পাতা না দিলে স্বাদ হইত বেশি।
আমি তখনও ভাবছি, আত্মহত্যার পক্ষের লোকগুলো কি ঘুষ দিয়ে বাবাকে খুন বাদ দিয়ে আত্মহত্যা লিখে দিতে বলে? বাবা কি কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঘুষ খান। আমার কিছুতে বিশ্বাস হয় না, বাবা এমন অসৎ হতে পারেন।
কিন্তু শরাফ মামা যেদিন মার পরনে ছেঁড়া শাড়ি দেখে বললেন, এত ফকিরনির মত থাকো বড়বু। আর এইদিকে দুলাভাই ত হেভি টাকা কামাইতাছে। দেখলাম এক লোক টাকার বুন্দা দিয়া গেল। পোর্স্ট মর্টেম করে ত! এখন ত টাকার পাহাড় হইয়া গেছে। আর তোমারে একখান শাড়ি কিইন্যা দেয় না!
আমি বললাম, পোস্ট মর্টেমের রিপোর্ট মিথ্যা লেখা যায় না শরাফ মামা, হুদাই বাবারে দোষ দিও না।
শরাফ মামা কাষ্ঠহাসি ছড়িয়ে বললেন, আরে ঘুষ দিয়া ডাক্তারেরা এই চাকরি লয়, পোস্ট মর্টেম করা মানে কোটিপতি হইয়া যাওয়া। ডাক্তারের কলমের ডগায় মাইনষের জীবন মরণ।
টাকাটা দেয় কেডা?
টাকা দেয় দুই দলই। মামলায় ফাঁসছে যে, মামলা করছে যে। দুলাভাই নান্দাইল ত পুরাডাই কিনা ফেলল।
বাবার ওপর আমার ঘণৃা জন্মাতে থাকে। যে লোকটি একশ একটা মনীষীদের বাক্য আওড়ান সারাদিন, আর ছেলেমেয়েদের মানুষ করার জন্য হেন কাজ নেই যে না করছেন, আর তিনি বাদি বিবাদি দু পক্ষ থেকে টাকা নিয়ে আদালতে যাচ্ছেন!
দাদকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি জানো কিছু ?
দাদা বলে দিলেন, আজে বাজে কথায় কান দিস না। বাবা ঘুষ খায় না।
জানো কি কইরা ঘুষ খায় না? ওইদিন যে মাছ দিয়া গেল, মাছ ত ঘুষ ছিল।
কোন মাছ?
কোন মাছ জানো না? রুই মাছ। খাইলা ত মজা কইরা।
আহ খুব স্বাদ ছিল মাছটা। আসলে মাছটা ভুনা করলে ভাল হইত আরও।
বাবার ঘুষ খাওয়া না খাওয়ার ব্যাপারটি আমার কাছে রহস্য থেকে যায়। এত কাছের মানুষ, এক বাড়িতে জীবন যাপন, অথচ বাবাকে আমার সবচেয়ে বেশি দূরের মানুষ মনে হয়। আসলে বাবার কিছুই আমার জানা হয় না। জানি বা জেনেছি বলে মাঝে মাঝে ভুল করি। বাবা কখন কাকে কাছে টানবেন, কখন দূরে সরাবেন, আমি কেন, বাড়ির কেউ জানে না, মাও না। মা হয়ত কখনও কুঁচি কেটে শাড়ি পরে পানের রসে ঠোঁট লাল করে মিষ্টি মিষ্টি হেসে বাবার সামনে গেলেন, বাবা ধমকে মাকে সরিয়ে দিলেন। এমন অনেক হয়েছে, যে বাবার কাপড় চোপড় ধুয়ে, আলনায় ভাঁজ করে রাখলেন মা, সারাদিন ধরে ঘর ধুয়ে মুছে, বন্ধ দরজা জানালা খুলে আলো বাতাস ঢুকিয়ে, দেয়ালের কোণ থেকে খাট সরিয়ে জানালার কাছে রাখলেন, ধোয়া চাদর বিছিয়ে দিলেন বিছানায়, দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন বাবার, বাবা আসবেন, দেখবেন, ভাল লাগবে। বাবা বাড়ি ফিরে, ঘরের অবস্থা দেখে চেঁচিয়ে বলেন, আমার ঘর নষ্ট করছে কে? টেনে খাটখানা সরিয়ে আগের জায়গায় রাখেন। খটাশ খটাশ করে জানালাগুলো বন্ধ করে দেন। বিছানার চাদর একটানে সরিয়ে দেন।
আমার ঘর আমি যেমনে রাখি, ঠিক তেমন ভাবেই যেন থাকে।
মা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন দেখে। মার কিছুই বাবার পছন্দ হয় না।
কখনও হয়ত তিরিক্ষি মেজাজ নিয়ে মা একে গাল দিচ্ছেন, ওকে গাল দিচ্ছেন। বাবা নরম গলায় ডাকলেন, ঈদুন আসো তো, কথা শুইনা যাও। ঈদুনের তখন কারও কথা শুনতে ভাল লাগছে না। বাবা আরও নরম গলায় ডাকেন ঈদুন ঈদুন।
বাবা আচমকা অসময়ে বাড়ি ঢুকে দেখলেন, আমি লেখাপড়া করছি, আর ইয়াসমিন ধুলোয় খেলছে। ইয়াসমিন তটস্থ হয়ে রইল, আমি দিব্যি নিশ্চিন্ত যে বাবা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দেবেন। কিন্তু বাবা আমাকেই দাঁত খিঁচিয়ে বললেন খালি বইয়ের দিকে গাধার মত চাইয়া থাকলে হইব না, মাথায় যেন ঢুকে যা পড়তাছস। আর ইয়াসমিনকে বলে গেলেন, লিচু খাইবা মা? তোমার জন্য এক্ষুনি লিচু পাঠাইয়া দিতাছি।
রহস্যে ঘেরা বাবা দূরেই থেকে যান, তাঁকে আমার চেনা হয় না, বোঝা হয় না। বাবার বিয়ের ব্যাপারটিও রহস্যময়। মা বলেন, লোকে বলে বাবা বিয়ে করেছেন রাজিয়া বেগমকে। বাবা কিন্তু কখনও রাজিয়া বেগমকে বাড়ি এনে বলেননি, এই আমার বউ। আর কখনও বাড়ি ছাড়া বাবা অন্য কোথাও রাতও কাটাননি, যখন ময়মনসিংহে থাকেন। কী করে বুঝি!
