জুরিসপ্রুডেনন্স বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মানুষটি বাবা।তিনি ক্লাস নেন আমাদের। সকালে ক্লাস থাকলে প্রায়ই বাবা আর আমি এক রিক্সা করেই কলেজে যাই। নাম ডাকার সময় আর সবার মত বাবাকে আমিও ইয়েস স্যার বলি। আমার শিক্ষক-পিতা চমৎকার পড়ান। বাবার যে সহকারি অধ্যাপক আছেন, তিনি পড়াতে এলে অবশ্য ছাত্রছাত্রীসংখ্যা ক্লাসে থাকে হাতে গোনা। বাবাকে খুব সহজ সরল হাসিখুশি শিক্ষক হিসেবে বিবেচনা করে ছাত্রছাত্রীরা। কেউ কেউ অবশ্য বলে খুব কড়া। পরীক্ষার সময় বলা হয়, বাবা ইন্টারনাল হিসেবে খুব ভাল, নিজের কলেজের ছাত্রছাত্রীদের পাশ করাবার ব্যবস্থা করেন, কিন্তু এক্সটারনাল হিসেবে নাকি বাবা রজব আলী থাকেন না, গজব আলী হয়ে ওঠেন। বাবা রজব আলীর চেয়ে শিক্ষক রজব আলীকে আমার ভাল লাগে বেশি। বাবা প্রথম দিনই একটা কথা বললেন ক্লাসে, বললেন, পচা শামুকে পা কাটার মত লজ্জা আর নেই, জানো তো! ফরেনসিক মেডিসিনে ফেল করা মানে, পচা শামুকে পা কাটা। কাটো কাটো ইজ্জত থাকে এমন কিছুতে কাটো। সার্জারিতে ফেল কর, মেডিসিনে ফেল কর, কঠিন সাবজেক্ট, ঠিক আছে, ফেল করা মানায়। কিন্তু ফরেনসিক মেডিসিনে, মাথায় এক ছটাক ঘিলু থাকলে কেউ ফেল করে না। শিক্ষক রজব আলীর ঘরে গেলে তিনি আমাকে নির্মল একটি হাসি সহ স্বাগত জানান, বেল টিপে বেয়ারা ডেকে চা আনতে বলেন আমার জন্য। কি ক্লাস হল, কোন শিক্ষক কি পড়ালো ইত্যাদি জিজ্ঞেস করেন। আমারও চিকিৎসাবিদ্যার নানা বিষয়ে অজস্র প্রশ্ন থাকে, করি। এই বয়সেও বাবার বই পড়ার শখ মেটেনি, তিনি এনাটমি থেকে শুরু করেন মেডিসিন সার্জারি সব বইই কাছে রাখেন, সময় পেলেই পড়েন। চিকিৎসাবিদ্যার এমন কোনও বিষয় নেই যে তিনি গড়গড় করে উত্তর দিতে না পারেন। শিক্ষক বাবা পরিশ্রমী, নিষ্ঠ, শিষ্ট, মিষ্ট,বিনত, বিনম্র। শিক্ষক বাবার জন্য আমার গর্ব হয়। পোস্ট মর্টেম দেখার জন্য ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের যেতে হয় সূর্যকান্ত হাসপাতালের লাশকাটা এলাকায়। ওখানে ডোম লাশ কাটে, আর পাশে দাঁড়িয়ে বাবা লাশের শরীরের ভেতর বাহিরের কি কি পরীক্ষা করতে হয়, কি করে খুঁজতে হয় মৃত্যুর কারণ, ছাত্রছাত্রীদের বলে দেন। আমরা নাকে রুমাল চেপে পচে ফুলে ওঠা লাশ দেখি, বাবা আর ডোমের জন্য কোনও রুমাল দরকার হয় না। ডোম দেখলে আমার খলিলুল্লাহর কথা মনে পড়ে। খলিলুল্লাহ এরকমই ডোম ছিল, লাশ কেটে লাশের কলজে খেত সে, খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর মায়েরা ভূতের ভয় দেখানোর বদলে খলিলুল্লাহর ভয় দেখিয়ে বাচ্চাদের ঘুম পাড়াতে শুরু করেছে। ক্লাসের মেয়েরা যখন বলে,রজবআলী স্যার এত ভাল! আমার পুলক লাগে। পুলক লাগে যখন বাবার সঙ্গে কলেজ চত্বরে দেখা হয়, দুজনে মধুর বাক্য বিনিময় করি। অবকাশের হিংস্র বাঘ কলেজে এসে মাটির মানুষ। মুখে হাসি লেগেই থাকে, পচা শামুকের বিদ্যা বিতরণ করেন তিনি। বিদ্যা আর কি! খুনোখুনির কারবার, কী ধরণের অস ্ত্র আছে, কোন অস্ত্রে কেমন ধার, কোন দায়ে কেমন কোপ, কোন বুলেটে কেমন ক্ষত, কোনটি আত্মহত্যা, কোনটি খুন, কোনটি দুর্ঘটনা, এসব। একবার পঁচিশ বছরের এক মেয়ের দেহের পোস্ট মর্টেম দেখাচ্ছেন বাবা, খুন কি আত্মহত্যা, তা বের করতে হবে। ঘচঘচ করে দশ পনেরোদিনের মড়ার বুক চিরে ফেলল ডোম, বাবা অমন বমি আসা গন্ধের সামনে মড়ার ওপর ঝুঁকে, সামনে পেছনে ঘুরিয়ে, পরীক্ষা করে বলে দিলেন খুন করা হয়েছে। কী করে খুন? খুব সোজা। মাথায় কোপ, বাবা কোপের চিহ্ন দেখালেন। নিজের মাথার পেছনদিকে দায়ের কোপ দিতে পারে না কেউ, সুতরাং কোনও কারণেই এটি আত্মহত্যা নয়। আরেকটি মেয়েকেও, বলা হয়েছিল, গলায় দড়ি বেঁধে আমগাছে ঝুলে আত্মহত্যা করেছে, বাবা হাতে পায়ে পেটে বুকে নখের আঁচড় দেখে বললেন একে মেরে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমাদের লিখতে হয় এসবের সুরতহাল রিপোর্ট। ক্রমে পচা শামুকে আমার আগ্রহ বাড়তে থাকে। বাবা ্আমার এই উৎসাহে মোটেও ঘি ঢালেন না, বলেন, যেইডা কাজে লাগব সেইটা পড়, সার্জারি মেডিসিন পড়, গায়নোকলজি পড়। আমার মন পড়ে থাকে মেয়েদুটোয়, কে কোপ বসালো ওই পঁচিশ বছর বয়সী মেয়েটির মাথায়, কে-ই বা নিরীহ গ্রামের কিশোরীটিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে! দরজায় বিভাগীয় প্রধান লেখা বাবার ঘরটিতে ঢুকে মাঝে মধ্যে দেখি অল্প বয়সী মেয়েরা বসে আছে। বাবা এক এক করে পর্দার আড়ালে নিয়ে ওদের দেখছেন। মেয়েরা চলে গেলে মেয়েরা কেন এসেছিল, কী পরীক্ষা করতে জিজ্ঞেস করলে, বাবা বলেন রেপ কেইস। বাবা আগের চেয়ে অনেক সহজ আমার কাছে। খুব সহজে তিনি শরীর এবং যৌনতা বিষয়ে আমার সঙ্গে ডাক্তারি ভাষায় কথা বলেন, অবশ্য ইংরেজির আশ্রয় নিয়ে। আমার জানতে ইচ্ছে হয় কে ওই মেয়েদের ধষর্ণ করেছে, এসবের উত্তর তিনি দেন না। কারণ এসব মামলার বিষয়, ডাক্তারির বিষয় নয়।
বাবা প্রায়ই মামলার সাক্ষী হতে আদালতে যান। প্রায়ই বাবাকে খুঁজতে অচেনা অচেনা লোক আসে বাড়িতে। এরা কারা? মা বলেন,তর বাবা সাক্ষী দেয় তো। পোস্ট মর্টেমের ব্যাপারে আসে।
আমার উৎসাহ তিড়িংবিড়িং করে লাফায়। পোস্ট মর্টেমের ব্যাপারে লোকেরা বাবার কাছে আসবে কেন, বাবার সঙ্গে বারান্দার ঘরে বসে নিচু স্বরে কথা কি বলে ওরা, জানতে ইচ্ছে হয়। লক্ষ করি বাড়িতে নানা রকম জিনিস পৌঁছে দিচ্ছে অচেনা অচেনা লোকেরা। বাবা এক দুপুরে বাড়ি নেই, একটি লুঙ্গি পরা, মোচঅলা লোক এসে বলল, ডাক্তার সাইব আছে?
