কে কইছে হইছে? হয় নাই ত!
ও আমি ভাবছিলাম, হইছে।
হইলেই বা কি? যদি হইত!
ওইসময় শরীর পবিত্র থাকে না। আর বিয়ে শাদির সময় খুব পবিত্র হাতে সবকিছু ধরতে হয়।
শুভ কাজে অশুভ জিনিস দূরে রাখতে হয়।
ও এই কথা!
মাকে ডেকে বলি, মা ওইগুলা হইলে নাকি গায়ে হলুদের পাটি ছোঁয়া যায় না?
মা বললেন, নাপাক শইলে না ছোঁয়াই ভাল।
না ছোঁয়াই ভাল কেন? ছুঁইলে কি হয়?
কি হয় ছুঁইলে মা তা বলেন না, মার ব্যস্ততা বিষম। ঝুনুখালা বলেন, অমঙ্গল হয়। কি রকম অমঙ্গল তা জানতে চেয়েছি, উত্তর পাইনি। বাড়ির পেছনে বাড়ি জীবনদের, জীবনের বিয়ের সময় দেখেছি শীতলপাটির তলে পান সপুারি রাখছেন জীবনের মা, পান সপুারির প্রয়োজন কি তা আমার বোঝা হয়নি। জীবনের বিয়ের পুরো অনুষ্ঠানটিই আমার দেখা হয়েছে, বরের সামনে আয়না ধরে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল কি দেখছেন, আয়নায় জীবনের সুন্দর মুখটি, বরের মখু থেকে কথা বেরোয় না, একজন বলে দিল বলতে চাঁদমখু । এরকমই নাকি নিয়ম। নিয়মগুলো আমার অদ্ভুত লাগে। ডলি পালের বোনের বিয়েতে গিয়েছিলাম, ওখানে আগুনের চারদিকে পোতা হয়েছিল চারটি কলাগাছ, কলাগাছের চারপাশ দিয়ে বরবউকে সাত পাক দিতে হল, সারাদিন উপোস থাকা মেয়ে ক্লান্ত শরীরে পাক দিচ্ছিল। জীবনের গায়ে হলুদের দিন রং খেলা হয়েছিল, খেলা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে আমি পালিয়ে বাড়ি চলে এসেছি, রঙ খেলার সময় ছুটোছুটি দাপাদাপি আমার স্নায়ুকে বিকল করে দেয়। একইরকম মাহবুবার বোনের গায়ে হলুদের দিন, ওখানেও বরের এক বন্ধু আমাকে রঙ দিতে নিয়েছিল, আমি ছিটকে সরে আসি, দৌড়ে বেরিয়ে যাই বাড়ি থেকে, আমার কেবলই মনে হয় রঙের উদ্দেশ্য বুঝি গায়ে হাত দেওয়া। মাহবুবা আমার চলে যাওয়া দেখে অবাক হয়েছে। নিজেকে আলগোছে বাঁচিয়ে চলি আমি, ছুটোছুটি দাপাদাপি কাড়াকাড়ি এসবে আমার বড় ভয়।
দাদার গায়ে হলুদে বাড়ির মেয়েরা সব হলুদ শাড়ি পরি। যারাই এসেছে বাড়িতে, এসেছে হলুদ শাড়ি পরে। নানি অবশ্য হলুদ শাড়ি পরেননি। তিনি শাদা শাড়িতেই দাদার মুখে হলুদ লাগিয়ে মাথায় হাত দিয়ে বলেছেন, সুখী হইও দোয়া করি। নানির কাছে সখু জিনিসটির মূল্য অনেক, মার কাছেও। ছোটদা দূরে আছেন কিন্তু সুখে আছেন এই জিনিসটি ভেবে মা ছোটদার না থাকার কষ্টকে সান্ত্বনা দেন। বাড়ি ভরে গেল হলুদে, হলুদ শাড়িতে, মিষ্টিতে, উৎসবে। নানিবাড়ির সবাই এল, সবাই দাদার শরীরে হলুদ মেখে দিল। হাসিনার বাড়ি থেকে লোক এসে হলুদ দিয়ে গেল দাদার গালে কপালে। দাদাকে বড় নিরীহ দেখতে লাগছিল। হাসিনার আত্মীয়রা পেট পুরে পোলাও মাংস খেয়ে বিদেয় হল। শ্বশুরবাড়ির লোক না হলে ঠিক ঠিকই দাদা চাষাভুষো লোকগুলোকে আনকুথ বলে গাল দিতেন।
এরপর তো বিয়ের ধুম। কালো ফটকের সামনে গাছপাতা ফুলপাতায় চমৎকার একটি প্রবেশদ্বার বানানো হয়েছে। বাবার বন্ধুদের গাড়ি ধার করে বাবা, আমরা ছোটরা, দাদার বন্ধুরা গেলাম অর্জুনখিলায়। দাদার মত নিলাজ লোক মুখে রুমাল চেপে বসে রইলেন, মাথায় টোপর, পরনে শাদা শেরওয়ানি, শাদা পাজামা, শাদা নাগরা। বাইরে শামিয়ানার তলে বসে কাজীকে কবুল বললেন, ভেতর ঘরে হাসিনা কাজীর সামনে একই কথা বলল, কবুল। মেয়েদের অবশ্য অমুক লোকের অমুক পুত্রের সঙ্গে এত টাকা দেনমোহরে বিবাহ করিতে রাজি আছ কি না জিজ্ঞেস করার সঙ্গে সঙ্গে কবুল বলা শোভন দেখায় না, কিছুক্ষণ হু হু করে কাঁদতে হয়, কেঁদে কেটে ক্লান্ত হলে মা খালাদের কিছু ঠেলা গুঁতো খেয়ে শব্দটি উচ্চারণ করতে হয়। হাসিনা খুব একটা সময় নেয়নি কবুল বলতে। হাসিনার কবুল বলা মানে বিয়ে ঘটে যাওয়া। এবার বিদায় নেবার পালা। হাসিনার মা বাবার হাতে মেয়ে সমপর্ণ করলেন। আমি অবাক হয়ে সব কাণ্ড দেখছিলাম, বিয়ের এমন সব কাণ্ড এত কাছ থেকে আমার আগে দেখা হয় নি। ফুলে সাজানো গাড়িতে দাদা বউ নিয়ে বসলেন, দুপাশে আমি আমি ইয়াসমিন, পেছনের গাড়িতে বরযাষনী। দাদা সব কিছুর নীল নকশা আগে থেকেই এঁকে রেখেছিলেন। নীল নকশা অনুযায়ী আমরা গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে ঢুকলাম বাড়িতে বরবধূর গৃহপ্রবেশ অনুষ্ঠান জমকালো করতে, কুলো থেকে ফুলের পাপড়ি ছিটোতে বরবধূর গায়ে। কুলো হাতে নিয়ে ফুল ছিটোচ্ছি লাল কাপের্টের কিনারে দাঁড়িয়ে। ওদিকে বাবা লোক খুঁজছেন বউ বরণ করার জন্য। মা দাঁড়িয়ে ছিলেন খোলা দরজার সামনে বরবধূ বরণ করতে। সারাদিন বাড়িতে বসে অপেক্ষা করছিলেন তিনি এই ক্ষণটির। মার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বাবার বন্ধুদের বউ। মাকে দরজার সামনে থেকে তুমি সর, দূরে যাও, দূরে যাও বলে কনুইয়ের ধাক্কায় সরিয়ে বাবা এম এ কাহারের ছোটভাই আবদুল মোমিনের বউকে বিগলিত হেসে বললেন, ভাবী আসেন আপনে, আমার ছেলে আর ছেলের বউরে বরণ করেন। মা পেছনে পড়ে রইলেন, ধনী আবদুল মোমিনের সোনার গয়নায় মোড়া বউটি ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে দাদার আর লাল ঘোমটা মাথার নতমখু হাসিনার গলায় ফুলের মালা পরিয়ে বরণ করলেন। রুনুখালা অবাক তাকিয়ে বললেন, আশ্চর্য, বাড়িতে মা তার ছেলে আর ছেলের বউরে ঢোকালো না! ঢোকালো অন্য কেউ! রুনুখালা সরে যান দৃশ্য থেকে। দাদার কিনে দেওয়া না-কাতান শাড়ি পরে পুত্রবধূসহ পুত্রের গৃহপ্রবেশ অনুষ্ঠানে ভিড়ের পেছনে দাঁড়িয়ে মা বিড়বিড় করে দোয়া পড়েন দাদা আর দাদার বউএর সুখী জীবনের জন্য।
