দাদার মুখে করা যায় বিয়া, এই বাক্যটি আমাদের বিস্মিত করে,আনন্দিতও। কারণ দীর্ঘ দীর্ঘ কাল বিয়ের জন্য ঝুলে থাকতে থাকতে দাদার জন্য কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার মত পাত্রদায়গ্রস্ত আত্মীয় আমরা ভুগেছি। দাদার পছন্দের কথা শুনে বাবা বললেন, মেয়ের বাবা কি করে, বাড়ির অবস্থা কিরকম, ভাইয়েরা কি করে, এইসব না জাইনা বিয়া করার জন্য লাফাইলে চলবে?
হাসিনা তার বোনের বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করত, তার বোনের স্বামী ছিল রেলওয়ে ইস্কুলের মাস্টার। সেই রেলওয়ে ইস্কুলে ছোটবেলায় হাসিনাও পড়ত, নাফিসাও পড়ত। মুমিনুন্নিসায় হাসিনা মানবিক বিভাগে, নাফিসা অমানবিকে অর্থাৎ বিজ্ঞানে, আমার সঙ্গে। নাফিসাই একদিন দূরে টিনের চালায় ক্লাস করা হাসিনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল, মানবিকে পড়া মেয়েদের সঙ্গে অমানবিকের মেয়েদের দেখা হয় না বড়। হাসিনার সঙ্গেও দেখা হত না। সেই হাসিনা, ডাগর চোখের হাসিনা আমার দাদার বউ হবে! বাহ! যা আমার জানা ছিল না, নাফিসার কাছ থেকেই জানি, হাসিনার বাপ নেই, মা আছে। কিছু ভাই আছে, কিছু বোনও। এটুকু ছাড়া আর বেশি তথ্য আমি বাড়িতে জানাতে পারি না। দাদা খবর নিয়ে আরও তথ্য যোগাড় করে জানালেন, ফুলপুর শহর থেকে মাইল দশেক ভেতরে অর্জুনখিলা গ্রামে মেয়ের মা থাকেন, ভাই একজন চাকরি করে ফুলপুর শহরে, আরেকজন ময়মনসিংহ শহরে, খুব বড় কোনও চাকরি নয়, কিন্তু চাকরি। খেয়ে পরে চলে যায়। আরেক ভাই টুডাইল্যা, গ্রামে বসে আছে, বড় বোন যার বাড়িতে মেয়ে থাকত,তার নাম কুসুম। কুসুমের দু ছেলে। সম্প্রতি স্বামী ত্যাগ করে এক বিবাহিত লোকের সঙ্গে ভেগে গেছে, বিয়েও হয়েছে সে লোকের সঙ্গে। দ্বিতীয় বোন, পারভিন। অবশ্য পারভিনকে ছোটবেলায় পালক দেওয়া হয়েছিল ওর নিজের ফুফুর কাছে। ফুফুকেই মা বলে ডাকে পারভিন, আর নিজের মাকে ডাকে মামি বলে। পারভিনের ভাসুর হচ্ছেন স্বয়ং আমানুল্লাহ চৌধুরি, ছোটদার চাকরির মামাচাচা। তথ্য বাবা শোনেন, কিন্তু তথ্য পছন্দ হয় না। মেয়ে সুন্দরী, মেয়ে মুমিনুন্নেসায় বিএ পড়ে, এ জেনেও বাবা মখু ভার করে থাকেন। মেয়ের বাবাভাই ধন সম্পদ করেনি, নামও নেই শহরে, ঠিক আছে, কিন্তু মেয়ের বড় বোন স্বামী ছেড়ে দিয়ে অন্য লোকের সঙ্গে চলে গেছে, এই জিনিসটি বাবাকে খোঁচাতে থাকে। এই জিনিসটি যে দাদাকে খোঁচায় না তা নয়, কিন্তু সুন্দরী মেয়ের যে আকাল দেশে, এ মেয়ে নাকচ করে দিলে তিনি আশংকা করেন পৃথিবীতে সুন্দরী বলতে আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে না।
দাদাই যা আছে কপালে বলে ঠায় বসে রইলেন, বিয়ে এ মেয়েকেই করবেন তিনি। বাবাকে অহর্নিশি বলতে থাকেন মা, রাজি হইয়া যান, এহন যদি বিয়া না হয় নোমানের, জীবনে হয়ত আর হইবই না। বাবাকে বলে কয়ে না থেকে নিমরাজি করার পর পর ই দাদা তারিখ নিয়ে বসলেন। ডিসেম্বর মাসের চার তারিখে বিয়ে। নাওয়া খাওয়া ছেড়ে তিনি দৌড়ে দৌড়ে কেনাকাটা শুরু করলেন। বাড়ি সাজানোর যা বাকি ছিল, সেরে ফেললেন। আমার জন্য হলুদ, ইয়াসমিনের নীল আর গীতার জন্য সবুজ রঙের কাতান শাড়ি কিনলেন, বিয়েতে পরার জন্য। গায়ে হলুদ এ পরার জন্যও সবাইকে লাল পাড় হলুদ শাড়ি দিলেন। সাজানো কুলো থেকে শুরু করে, মেয়ের জন্য শাড়ি কাপড় প্রসাধন, কেবল মেয়ের জন্যই শাড়ি নয়, মেয়ের মা নানি দাদি ইত্যাদি সবার জন্যই সব কেনা হল। সবকিছুর টাকা অবশ্য বাবা দিচ্ছেন। বিয়ের অনুষ্ঠানের যাবতীয় খরচ বাবাকেই পোষাতে হবে, যেহেতু তিনি বাবা। শখের জিনিসপাতির খরচ দাদার পকেট থেকে। যেমন পৃথিবীতে সব চেয়ে সুন্দর বউভাতের নিমনণ্ত্র পত্র করার ইচ্ছেয় তিনি মখমলের লাল কাপড়ে নিমন্ত্রণপত্র নয় নিমনণ্ত্র কাব্য লিখে আনলেন, শিল্পী দিয়ে হাতে লিখিয়ে। একটি লাল সুসজ্জিত সুঅঙ্কিত লম্বা কৌটোয় মখমলের কাপড়টি থাকবে, কাপড়ের দুদিকে ঝুনঝুনিঅলা রুপোর কাঠি। নিমনণ্ত্র কাব্যটি পড়তেও হয় রাজাবাদশাদের কাছে পাঠানো ফরমান পড়ার মত। দাদার মাথা থেকে আরও নানা সুড়সুড় করে আরও শিল্প বেরোচ্ছে, নিজের ঘরখানা রাজাবাদশাহদের ঘরের মত সাজিয়েছেন। বিয়ের খাট সাজানোর জন্য শহরের সেরা শিল্পীদের বলে রেখেছেন। কয়েকহাজার গোলাপ আর চন্দ্রমল্লিকায় খাট সাজানো হবে। লাল কার্পেট পেতে দিতে হবে কালো ফটক থেকে ঘর অবদি। বাবার কাছ থেকে মোটা টাকা নিয়ে বউএর জন্য লাল বেনারসি আর প্রচুর সোনার গয়না দাদা নিজে ঢাকা গিয়ে কিনে আনেন। বিয়ের বাজার সারতেই মাস কেটে যায়।
গায়ে হলুদের দিন আমরা, আমি, রুনুখালা, ইয়াসমিন, ছোটদা, গীতা ফুলপুরের অর্জুনখিলা গ্রামে গিয়ে হাসিনার গায়ে হলুদ লাগিয়ে আসি। সাজানো কুলোয় সাজিয়ে নিই হাসিনার জন্য হলুদ শাড়ি, আর মুখে মাখার সপ্তবণর্ রং। কুলোর পেছনে বত্রিশ রকমের মিষ্টির প্যাকেট। পরদিন দাদার গায়েও হলুদ। দাদা শীতল পাটিতে বসে থাকেন বারান্দায়। আত্মীয়রা দাদার মুখে হলুদ লাগান। সেই শীতল পাটিটি আবার চারজনে ধরে বিছাতে হয়। চারজনের একজন হয়ে প্রচণ্ড উৎসাহে যখন আমি পাটির এক কোণ ধরি, রুনুখালা দৌড়ে এসে আমার হাত থেকে কোণ কেড়ে নিয়ে বললেন, তর ধরা যাবে না।
কেন ধরা যাবে না?
কারণ আছে। পরে বলব।
আমি পাটি ছেড়ে দিয়ে ঘরে ম্রিয়মান বসে থাকি। কেন শীতল পাটিটি আমার ধরা যাবে না,এই প্রশ্ন মন থেকে দূর হয় না। রুনুখালা পরে বললেন, তর তো মিনস হইছে, তাই।
