ব্যথা? কেন?
রুদ্র কোনও উত্তর দেয়নি। দরদ ফোটে আমার গলায়, নিয়মিত খাওয়া দাওয়া না করলে এসিডিটি হয়। নিয়মিত খাওয়া উচিত। বেশি ঝাল খাওয়া উচিত না। স্টমাক যদি এম্পটি থাকে, তবে যে এসিড সিত্রে²শান হয়, তা কোনও ফুড না পেয়ে স্টমাককেই খেতে থাকে। এ কারণে এক সময় আলসার হয়ে যায় পেটে। পেপটিক আলসার বলে একে। এন্টাসিড খেলে ঠিক হয়ে যাবে।
রাখো তোমার ডাক্তারি বিদ্যা, চল।
রুদ্র আমাকে নিয়ে বেরোয়। তার কোনও এক বন্ধুর বাড়ি যাবে।
অসম্ভব, আমাকে এখন সেগুন বাগিচা যেতে হবে।
এক্ষুনি যাওয়ার কি হল?
যেতে হবে। বৌদি কাল রাগ করেছে দেরিতে ফিরেছি বলে। আজ আমাকে নিয়ে সে বাইরে যাবে।
রুষ্ট রুদ্র বিকেলের দিকে আমাকে নামিয়ে দিয়ে যায় সেগুন বাগিচায়। বাড়ি ফেরার পর গীতার সঙ্গে কথা বলতে গেলে দেখি সে মখু ফিরেয়ে নিচ্ছে। বৈঠকঘরে বসে থাকি একা। আমার সঙ্গে কোনও কথা বলে না গীতা। সন্ধেয় বাড়ি ফিরে ছোটদা ভিসিআরএ একটি হিন্দি ছবি চালিয়ে গীতা গীতা বলে ডেকে যান, গীতা আসে না। ছোটদা শেষ অবদি ছবি দেখা বন্ধ করে গীতার মাথার কাছে বসে গীতার গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ও গীতা ও গীতা গীতা গীতা জপ করে যান। আমার সঙ্গে গীতার এমন আচরণ আমি আগে দেখিনি কখনও। ছোটদা গীতাকে খেতে ডাকেন খাবার টেবিলে, গীতা আসে না। গীতা আসেনি বলে ছোটদাও না খেয়ে থাকেন। এ বাড়িতে আমার উপস্থিতিই আমার মনে হতে থাকে, অশোভন। অপমান আমাকে মিশিয়ে ফেলে মেঝের ধুলোয়। না পারি রুদ্রকে ফেরাতে, না পারি প্রিয় স্বজনদের। দুটোতে প্রচণ্ড বিরোধ, আমি কোনদিকে যাই। পরদিন ভোরবেলা ছোটদাকে বলি আমি চলে যাবো ময়মনসিংহে। ছোটদা বলেন আরও কয়টা দিন থাক। আমি দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বলি, আমার ক্লাস শুরু হয়ে যাচ্ছে। ছোটদা মখু শুকনো করে আমাকে ট্রেনে পৌঁছে দিয়ে আসেন ময়মনসিংহ। একাই যেতে পারব বলেছিলাম, তিনি তবু নিজে এসেছেন। সারাটা পথ জানালায় মখু রেখে রুদ্রকে ভেবেছি। রুদ্র নিশ্চয়ই তার বাসাবোর ঘরে অপেক্ষা করছে আমার জন্য, অপেক্ষা করতে করতে যখন দেখবে যে আমি আসছি না, তখন নিশ্চয়ই কষ্ট হবে খুব ওর। রুদ্রর কষ্টের কথা ভেবে আমার এত কষ্ট হতে থাকে যে চোখ ভিজতে থাকে, বারে বারেই ভিজতে থাকে। বাড়ি ফিরে রুদ্রকে লিখি আমার চলে আসতে বাধ্য হওয়ার কথা। লিখি চলে আসা ছাড়া আমার আর কিছু করার ছিল না।
রুদ্র লেখে, তোমার কিছুই করার ছিল না—এটাই তোমার দোষ। কেন তোমার কিছু করার থাকে না? কেন তোমার ইচ্ছা অনিচ্ছার মূল্য থাকে না? কেন তুমি বার বার ভুলে যাও যে তুমি একজনের খুব কাছের মানুষ? কেন ভুলে যাও যে আর একটি জীবনের সাথে তোমার জীবন জড়ানো রয়েছে। তুমি কেন ভুলে যাও যে তুমি একজনের স্ত্রী? কামাল থাকতে অনুরোধ করেছিল। বাড়ি থেকেও আরও বহুদিন থাকার অনুমতি ছিল, এর পরেও কী করে বিশ্বাস করি যে বাধ্য হয়েই তোমাকে যেতে হয়েছে? কী করে আমাকে বিশ্বাস করতে বলো তোমার কোনও দোষ নেই? তুমি কি এখনো শিশু রয়েছো যে তোমার ইচ্ছা অনিচ্ছার কোনও মূল্য থাকবে না? আজ এই সামান্য থাকার ব্যাপারে তোমার ইচ্ছা অনিচ্ছাকে তুমি প্রতিষ্ঠা করতে পারো না! অনিচ্ছার তোয়াককা না করে তোমাকে যদি আবার বিয়ে দিতে চায়, তখনও কি তুমি লিখবে আমার কোনও দোষ নেই! আশ্চর্য! কেন তোমার ইচ্ছা তুমি প্রকাশ করতে পারো না? প্রতিষ্ঠা করতে পারো না? আমার রাগ করা বা না করায় তোমার তেমন কিছু আসে যায় না। সেদিন সারাটা দুপুর ধরে তুমি তা প্রকাশ করেছো। এতোখানি কাছে আসার পরও তুমি এখনো বোকার মত দুজনের সম্পর্কের মধ্যে হার জিতের কথা ভাবো। কবে তোমার ম্যাচিউরিটি আসবে? স্বামীর অধিকার আমি কখনো জোর করে আদায় করতে চাইনি, এখনো চাই না। আর চাই না বোলেই আমি সব সময় তোমাকে সুযোগ দিয়েছি নিজে থেকে তোমার দায়িত্বটুকু বুঝে নেবার জন্যে। কতো ভাবে বুঝিয়েছি। কিন্তু তুমি ভাবো স্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা মানে পরাজিত হওয়া। আর দশটা দম্পতির দিকে তাকিয়ে দেখ তো? আমি তো কখনো তোমাকে সেরকম ভাবে চাইনি। তোমাকে আমি সম্পণূর্ মুক্ত মানুষ হিসেবে চেয়েছি। সামাজিক শৃঙ্খল আর পুরুষের দাসত্বের উধের্ তোমাকে রাখতে চেয়েছি। কিন্তু তাই বলে তুমি তোমার দায়িত্ব নেবে না কেন? বিয়ের পর আট মাস কেটে গেল এখনো তোমার সঙ্কোচ কাটে না। এখনো তুমি যুক্তিহীন জেদ করে নষ্ট করো স্বাভাবিক জীবন। বিয়ের দিনটির কথা সারা জীবনেও আমার পক্ষে ভোলা সম্ভব হবে না।
জীবনের সহজাত কিছু নিয়ম আছে, কিছু শৃঙ্খলা আছে। তাকে কখনোই অস্বীকার করা চলে না। তোমার সমস্যা আমি বুঝি। খুব পষ্ট করে বুঝি। তোমাকে এতখানি বোধহয় কেউই বোঝে না। আর বুঝি বলেই আমি প্রথম থেকেই খুব যুক্তিসংগত ভাবে তোমাকে গ্রহণ করার চেষ্টা করেছি। যেটা আমি ভাল জানি বা বুঝেছি, চেষ্টা করেছি তোমাকেও তা বোঝাতে। না হলে ২৬/১ এর পর আমাদের সম্পর্ক শেষ হতে বাধ্য ছিল। তোমার সেন্টিমেন্টগুলো আমি বুঝি বলেই তার অমর্যাদা করি না। কিন্তু সেই সেন্টিমেন্ট যদি আমাকে অমর্যাদা করে? যাতে না করে সে দায়িত্বটি তোমার। কখনো ভাবিনি এসব নিয়েও লিখতে হবে। সব সময় চেয়েছি তুমি বুঝে নেবে। আর বুঝতে শিখলে যুক্তিহীন ভাবে কিছু আর করবে না।
