মা বলেন, আমার ছেলে সুখে থাকলেই হইল।
খানিক থেমে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন মায়ের সখু বইলা একটা কথা আছে না, কামাল যদি নিজের হাতে শাড়িডা আমারে দিত, ভাল লাগত। কামালই কিনে, কিন্তু বউএর হাত দিয়া দেওয়ায়।
ছোটদাকে সুখী সুখী লাগে দেখতে। দেখে আমাদেরও সখু হয়। আমি আমার বিছানা ছেড়ে দিই ছোটদা আর গীতাকে। অনেক রাত অবদি সেই বিছানায় আমাদের তাস খেলার হৈ হৈ চলে। স্পেডট্রাম খেলায় আমি আর ইয়াসমিন এক দল, ছোটদা আর গীতা আরেক দল। মা মধ্যরাতে আমাদের খেলার ভেতর ঢুকে বলেন, বাবা কামাল, তুমি তো রাত্রে ভাল কইরা খাও নাই, এখন একটু ভাত মাংস আনি, খাইয়া লও।
পাগল হইছেন। পারলে চা দেন।
মা দৌড়ে রান্নাঘরে ঢোকেন, ওই অত রাতে চা বানাতে।
আমি গলা তুলে বলি, মা আমার জন্যও এক কাপ।
ইয়াসমিন বলে আমার জন্যও।
আমরা আদা চা খেতে খেতে তাসের আনন্দে ডুবে থাকি। মা ছেঁড়া মশারির তলে, গায়ে বসা মশা দুহাতে তাড়াতে তাড়াতে ভাবেন,কাল সকালে উঠেই পরোটা মাংস করতে হবে সকালের নাস্তা, কামালটা পরোটা মাংস খাইতে খুব ভালবাসে।
যেহেতু সবে পরীক্ষা শেষ হয়েছে, ছোটদার সঙ্গে ঢাকা যাব, ঢাকা যাব বায়না ধরে ঢাকায় আসি বেড়াতে। এখন আর মুহম্মদপুরের বাড়িতে থাকেন না তিনি। সেগুন বাগিচায় রাহাত খানের বাড়ির ওপরতলায় একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছেন। গীতার মুখে আগে যেমন চৌধুরি বাড়ির গল্প শোনা যেত, এখন তেমন আর শোনা যায় না। এখন রাহাত খান আর নীনা মামির গল্প। ছেলেমেয়ে অপু তপু কান্তা শুভ্রর গল্প। মুহম্মদপুরের বাড়িতে যখন ছিলেন তখন নাচের লোক গানের লোক সবার সঙ্গে ওঠাবসার ব্যস্ততা ছিল তার, ওদের কথাও ইদানিং আর বলেন না। ফকরুল মামার সঙ্গে বাড়ি ভাড়া নিয়েছিলেন ছোটদা,দুজনে অর্ধেক অর্ধেক ভাড়া দিতেন। তিনি ওড়াওড়ি করলে গীতাকে বাড়িতে একা থাকতে হবে না, ফকরুল মামা রইলেন, একজন পুরুষমানুষ রইল আর কী! মাস তিন পর গীতা জানিয়ে দিল, সে একাই থাকতে পারে, একাই একশ সে। ফকরুল মামাকে পাততাড়ি গুটিয়ে নিতে হল। গীতা আরও জানাল, সে নিজেও চাকরি করবে। তারও চাকরি হল। তেমন বড় চাকরি নয়, বিমান অফিসের রিসেপশনিস্ট। ওই কাজেই সে প্রতিদিন সেজেগুজে যেতে থাকে। এখনও করছে সেই একই চাকরি। গীতা আমাকে বিমান আপিসে নিয়ে যায়, ঘন্টার পর ঘন্টা খামোকা বসিয়ে রাখে। তার এই ভাই সেই ভাইএর সঙ্গে তার ননদকে পরিচয় করিয়ে দেয়। খামোকা বসে থাকতে আমার ভাল লাগে না, রুদ্রর সঙ্গে দেখা করার জন্য ছটফট করি। ময়মনসিংহ থেকেই তাকে চিঠি লিখে দিয়েছি সকাল এগারোটায় যেন সে থাকে রোকেয়া হলের সামনে। আমাকে নিয়ে গীতা এখানে যাবে, ওখানে যাবে এরকম পরিকল্পনা করতে নিলেই আমি ক্ষমা চেয়ে ঝুনু খালার সঙ্গে জরুরি দেখা করতে যাচ্ছি বলে একটি রিক্সা নিই।
কহন আইবি?
এইত কিছুক্ষণ পরেই।
বলি কারণ রুদ্রর সঙ্গে দেখা না হলে তো আমাকে কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরতেই হবে। দেখা হওয়ার বিষয়টি সম্পণূর্ ভাগ্য। ঢাকায় সে আদৌ আছে কি না, নাকি হুট করে গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে কে জানে।
কিছুক্ষণ কতক্ষণ?
আধ ঘন্টা। বড়জোর এক ঘন্টা।
অফিসে আইয়া পড়িস। আমি আজকে তাড়াতাড়ি ছুটি নিয়া নিব।
সময়ের দেড়ঘন্টা দেরি করে গিয়েও দেখি রুদ্র অপেক্ষা করছে। আমাকে নিয়ে ঘুরে বেড়ালো রুদ্র। হুডতোলা রিক্সায় রুদ্রর সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে আমার এত ভাল লাগে! চাই সময় যেন না ফুরোয়। কিন্তু ফুরিয়ে যায় সময়। রুদ্র আমাকে তার দুটো বান্ধবীর বাড়ি বেড়াতে নিয়ে চা বিস্কুট খেতে খেতে গল্প করে এসেছে। এক ঘন্টার জায়গায় চারঘন্টা হয়ে যায়। গীতার অফিস ছুটি হয়ে গেছে, বাড়ি ফিরতে হয় আমাকে। আমাকে গীতার সামনে দাঁড়াতে হয় না, কারণ সে ঘরের দরজা বন্ধ করে শুয়ে থাকে। আমি রাতে একা শুয়ে থাকি, আমাকে কেউ খেতেও ডাকে না, আমার সঙ্গে কেউ গল্প করতেও আসে না। গীতার বন্ধ দরজায় দাঁড়িয়ে দুবার ডেকেছি, দরজা খোলেনি। পরদিনও আমাকে রুদ্রর সঙ্গে দেখা করতে বেরোতে হয়। গীতাকে আমার বেরোবার কথা জানাতে গেলে পরদিনও শুকনো মুখে জিজ্ঞেস করে, কই যাবি? ঝুনু খালা আজও যেতে বলেছেন, বলি। মিথ্যে বলতে আমার ইচ্ছে হয় না, কিন্তু তার অভিভাবকীয় আচরণে আমার গলা শুকিয়ে আসে, বলতে বাধ্য হই। পরদিনও জিজ্ঞেস করে, কালকে তো দেখা করলি, আজকে আবার কী!
আজকে ইউনিভার্সিটির রেজিস্টার বিল্ডিং এ আমার রেজাল্ট পাওয়া যাবে। যাইতে হবে।
আমি ত তরে নিয়া যাইতে পারি ওইখানে।
রুনুখালার পরিচিত মানুষ আছে, সে অফিস থেইকা রেজাল্ট দেখার ব্যবস্থা করতে পারবে।
মানুষ কি আমার নাই?
এত কইরা বইলা দিছে। আমার যাইতেই হইব। আমার জন্য ত অপেক্ষা করতাছে। পরদিনও গীতা জিজ্ঞেস করে—কহন আইবি। পরদিনও আমি বলি, দেরি হবে না, আজকে তাড়াতাড়ি চইলা আসব। গীতা আজ ছুটি নিয়েছে অফিস থেকে, আমাকে নিয়ে সে বেড়াবে। সুতরাং যেতে চাচ্ছি, ঠিক আছে, কিন্তু দুপুরের আগেই যেন ফিরি। রুদ্র আমার জন্য অপেক্ষা করছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে-লাইব্রেরির বারান্দায়,আমি পৌঁছতেই আমাকে রিক্সায় তুলে বাসাবোয় তার ঘরে নিয়ে যায়। শাদামাটা ঘরটিতে একটি বিছানা পাতা। বসে আপন মনে ঘরটির জিনিসপত্র আর বইখাতা দেখি। রুদ্র পাশে বসে আমাকে নিবিড় করে ধরে চুমু খায় ঠোঁটে। ঠোঁট থেকে চুমু বুকের দিকে নামে, তার শরীরের ভার দিয়ে আমাকে শুইয়ে দেয় বিছানায়,বুক থেকে আরও নিচের দিকে নামতে থাকে তার ঠোঁট, তার শরীরের তলে পড়ে হাঁসফাঁস করি, যেই না আমার পাজামার ফিতেয় তার হাত পড়ে, ছিটকে সরে যাই। তাকে ঠেলে সরিয়ে আমি লাফিয়ে নামি বিছানা থেকে। ভয় আমার অন্তরাত্মা শুকিয়ে ফেলে। বলি, এখন যাবো। ঠোঁট জোড়া ভারি ঠেকছিল, আয়নায় নিজের চেহারা চিনতে পারি না, ফুলে ঢোল হয়ে আছে ঠোঁট। রুদ্র উপুড় হয়ে শুয়ে থাকে, কোনও কথা বলেনা। অনেকক্ষণ ওভাবেই শুয়ে থাকে, জিজ্ঞেস করি, ঠোঁটের ফোলা আড়াল করে, কি হয়েছে, ওভাবে তার শুয়ে থাকার কারণ কি? বার বার বলি, আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে, আমার যেতে হবে। ওভাবেই অনেকক্ষণ শুয়ে থেকে রুদ্র গোসলখানায় চলে যায়। ওখানে মেলা সময় ব্যয় করে ফিরে বলে, শুয়ে ছিলাম কারণ তলপেটে ব্যথা হচ্ছিল।
