যদি তুমি শুধু আমার ভালোবাসার মানুষ হতে, যদি বউ না হতে, তবে হয়তো তোমার এই চলে যাওয়াটা আমার এতখানি লাগত না। তখন শুধু বুকে বাজত, কিন্তু এখন আত্মসম্মানেও বাজে।
নিজের সাথে এমন প্রতারণা করো কেন? নিজের ইচ্ছার সাথে কেউ প্রতারণা করে? রুদ্রর চিঠি পড়ে আমার এত মন খারাপ হয়ে যায়। এত মন খারাপ যে লিখি আমাকে যদি তোমার এতই অপছন্দ, আমার যুক্তিহীন কার্যকলাপ যদি তোমার আত্মসম্মানে এতই বাধে, তবে আর দ্বিধা করছ কেন? পছন্দসই মেয়ের অভাব তো নেই! তারা নিশ্চয়ই আমার মত বাজে ধরণের সেন্টিমেন্ট নিয়ে চলে না, যুক্তিহীন জেদ করে নষ্ট করেনা স্বাভাবিক জীবন, জীবনের সহজাত নিয়মকে, শৃঙ্খলাকে কখনই অস্বীকার করে না, তারা নিশ্চয়ই বোকার মত হারজিতের কথা ভাবে না, স্ত্রীর দায়িত্ব তারা সুন্দর নিয়ে নেবে, বিয়ের আট মাস হবার বহু আগেই তাদের সঙ্কোচ কাটবে। তাদের কাউকে পছন্দ করে ফেলো। তোমার সুখের ব্যাপারে আমার আপত্তি থাকবে না। ছোটবেলা থেকে আমি খুব বেশি একটা সুখে মানুষ হইনি—যে কোনও দুঃখকে আমি সহজে গ্রহণ করতে শিখেছি। তোমার সুখের জন্য তোমার নতুন জীবন বেছে নেবার ঘটনা শুনলে আমি অবাক হব না। আমি তোমার সুখের পথে কোনওদিন বাধা হয়ে দাঁড়াতে চাই না। এই অসহ্য জীবন থেকে তুমি যদি মুক্তি পেতে চাও, নিয়ে নাও। আমার বলার কিছু নেই। আমি তোমাকে কোনওদিন দোষ দেব না। আমার অক্ষমতাটুকু আমার থাকবে। আমার একাকীত্ব আমার থাকবে। জীবন আর ক দিনের! দেখতে দেখতেই শেষ হয়ে যাবে, দুম করে একদিন মরে যাবো। এতদিনে আমি বুঝে গেছি কোনও পুরুষকে তৃপ্তি দেবার ক্ষমতা আমার নেই। দাম্পত্যজীবনকে সুখী করার ক্ষমতা আমার সত্যিই নেই। আমি একটা আপাদমস্তক অহেতুক মানুষ। তুমি আমাকে ক্ষমা করো। কোনওদিন ভাবিনি এরকম চিঠি তোমাকে লিখব। কিন্তু মূর্খের মত জীবনে আমি সুখের প্রত্যাশা করেছিলাম, যতসব আজগুবি স্বপ্ন দেখেছিলাম, বাস্তবতা আমাকে বুঝিয়ে দিয়ে গেল, জীবনের সীমানা এত বিশাল নয়, বরং শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে কিছু একটা পেতে হলে হারাতে হয় লক্ষগুণ। অথচ নিবোর্ধ আমি হারাতে না চেয়েই পেতে চেয়েছিলাম। তাইতো হেরে গেলাম নিজেই। তাইতো বিয়ের পর বছর না পেরোতেই আমাকে লিখতে হয় এমন কষ্টের চিঠি। আমার অক্ষমতার জন্য আমাকে তুমি ক্ষমা করে দিও। তোমার উদারতার কথা কোনওদিন ভুলব না।
আমার চিঠি পেয়ে রুদ্র লেখে, তোমার সমস্ত অক্ষমতা নিয়েই তুমি সারাজীবন আমার সাথে থাকবে। প্রায় তিন বছর ধরে আমি তিল তিল করে আমার জীবনে যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছি তাকে তুমি নষ্ট করতে পারো না। আমার শৃঙ্খলা আর স্থিরতা এখন তোমাতে। যথেষ্ট হয়েছে, যথেষ্ট করেছো—এই সব পাগলামি আর চলবে না। আমি তোমার সুখের পথে কোনওদিন বাধা হয়ে দাঁড়াতে চাই না, এই কথাটি আরও সহস্রবার নিজেকে শোনাও। যখনি তুমি আমাকে এই কথাটি বলো, ঠিক তখনই তুমি আমার জীবনে সুখের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াও। দ্বিতীয়বার এই কথাটি আমাকে তুমি শোনাবে না। তোমার জীবনটির সম্পণূর্ দায়িত্ব আমার। তার ভাল মন্দ নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। এই কথাটি ভুলে যাও কেন? আর শোনো শখ করে আর কখনই আমাকে কষ্ট দিও না। আমি খুব ভাল নেই, আর এই ভাল না থাকা তোমার কারণে। ছোট্ট চিঠি, কিন্তু অমল এক আনন্দ আমাকে ঘিরে থাকে সারাদিন। আমি বুঝি, খুব ভাল করে বুঝি, রুদ্রকে আমি ভালবাসি। রুদ্র তার বাসাবোর ঘরে আমাকে চুমু খেতে খেতে হয়ত আরও অন্য কিছু করতে চেয়েছিল, সেই অন্য কিছুর একটি ভয় আমাকে আমূল কাপাঁয়। রুদ্রকে আমি বোঝাতে পারি না এসবের কিছু।
১৩. শুভবিবাহ
চট্টগ্রাম থেকে ময়মনসিংহে তার মেয়ে বিনিকে নিয়ে বেড়াতে আসে শীলা। শীলা এসেছে খবর পেয়ে দাদা অস্থির হয়ে ওঠেন। বান্ধবী নিলমের বাড়িতে শীলা উঠেছে। শহরের কাচিঝুলির বাড়িটি বিক্রি করে দিয়ে গফরগাঁওএ গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে শীলার মা, ভাই বোন। গফরগাওঁ য়ে যাওয়ার পথে ময়মনসিংহ শহরে থেমেছে শীলা, নিলমের সঙ্গেও দেখা হল,জন্মের শহরটিও দেখা হল। কিন্তু দেখতে গিয়ে দেখা হয়ে যায় দাদার সঙ্গে। দাদার সঙ্গে দেখা হোক শীলা চেয়েছিলই বলে দেখা হয়। সে দেখা থমকে দাঁড়িয়ে থাকা মুখোমুখি। সে দেখা বুকের মধ্যে একশ কথা জমা থাকার পর একটি কথাও উচ্চাজ্ঞরত না হওয়ার দেখা। সে দেখা অপলক তাকিয়ে থেকে ভিজে ওঠা চোখ আড়াল করতে ডানে বা বামে কোথাও তাকানো। শীলাকে দাদা বাড়িতে আসতে বলেন। নিজে বাজার করেন রুই মাছ, কই মাছ, চিংড়ি মাছ, চিতল মাছ, কিন্তু শীলা যদি মাছ খেতে পছন্দ না করে, তাই সঙ্গে খাসির মাংস, মুরগির মাংস, এমন কি কবুতরের মাংসও—মা সারাদিন ধরে সব রান্না করেন। সন্ধের দিকে বিনিকে সঙ্গে নিয়ে শীলা অবকাশে আসে। সেই আগের মতই আছে শীলা, আগের সেই পানপাতার মত মখু টি আছে, আগের সেই চোখ, চোখের হাসি, গালে শুধু মেচেতার কিছু কালো দাগ পড়েছে। সবার সঙ্গে হেসে কথা বলে শীলা। তার মাথায় হাত বুলিয়ে মা বলেন, ভাল আছ শীলা? আহা কতদিন পর তোমারে দেখলাম। কি সুন্দর একটা ফুটফুটে মেয়ে তোমার! খেতে বসে শীলা বারবারই বলে, কি দরকার ছিল এত কিছুর! শীলার পাতে মাছ মাংস তুলে দিতে দিতে মা বলেন, নোমান শখ কইরা কিনছে, খাও। খাওয়ার পর বিনিকে বারান্দায় খেলতে পাঠিয়ে দাদার ঘরে বসে দাদাকে তার দুঃসহ জীবনের কথা বলে সে। নিজের ভেজা চোখ হাতের তেলোয় মুছে দাদা শীলার চোখের জল মুছিয়ে দেন। শীলা চলে যাওয়ার পর দাদা উদাস শুয়ে থাকেন বিছানায়, চোখ খোলা জানালায়। বাইরের হাওয়া এসে দাদার ভিজে চোখ শুকিয়ে নেয় বারবার। দাদার গালে মেচেতার নয়, চোখের জল শুকোনোর দাগ লেগে থাকে। এভাবে অনেকদিন উদাস মন নিয়ে থেকে বাড়িতে তিনি বলে দিলেন, কেউ যেন তার বিয়ের জন্য আর পাষনী খুঁজে না বেড়ায়। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি বিয়ে করবেন না। সবাই থ। থ হওয়া সবাইকে সপ্তাহ খানিক পর তিনি জানালেন, যদি বিয়ে করতেই হয় তবে তিনি শীলাকে করবেন। শীলাকে বিয়ে! সবাই আরও থ। বিয়ে হওয়া বাচ্চাঅলা শীলাকে কি করে দাদা বিয়ে করবেন! শীলা স্বামী ছেড়ে দেবে শিগগির। তারপর শীলাকে বিয়ে করে নিয়ে আসবেন, বিনি আছে তো ক্ষতি কি, বিনি তো শীলারই মেয়ে। দাদা বড় বড় চিঠি লিখতে থাকেন শীলাকে। চিঠিগুলো নিলমের হাতে দিয়ে আসেন,নিলম নিজের চিঠির খামে পুরে দাদার চিঠি ডাকে পাঠিয়ে দেয় চট্টগ্রামে। একদিন খুব ভোরবেলা নিলম এল বাড়িতে, দাদা সারারাত না ঘুমিয়ে নিলম আসার আগেই কাপড়চোপড় পরে তৈরি ছিলেন। দুজন যাচ্ছেন চট্টগ্রামে শীলার কাছে। দাদার পথ আগলাবে এমন শক্তি নেই কারও। দাদা উদভ্রান্তের মত নিলমের সঙ্গে চট্টগ্রাম চলে গেলেন।
