আরে না মা কি যে কন, আরামের চাকরি। ভাল বেতন পাই। এইতো ডমেস্টিক ফ্লাইট শেষ হইল, এখন ইন্টারন্যাশনাল শুরু করছি।
মা ডমেস্টিক ইন্টারন্যাশনালের প্যাঁচ বোঝেন না। মাটির পৃথিবী ছেড়ে অতদূর আকাশের ওপর কারও কি কষ্ট না হয়ে পারে, বিরুই চালের ভাত খেতে ইচ্ছে করল পাবে না, টাটকা শাক সবজি, তাও না। না পারবে ভাল করে শুতে, না হাঁটতে, পায়ের তলায় মাটিই যদি না থাকে, তবে সে হাঁটা আর কেমন হাঁটা!
আরব দেশে গেছিলাম মা। মক্কায় গিয়া কাবা শরিফ দেইখা আইছি।
আরব দেশে যাওয়া এত যে সহজ মা ধারণা করতে পারেন না।
উফ এত গরম। অবশ্য গাড়িতে এসি থাকলে অসুবিধা নাই।
ছোটদা আরব দেশ নিয়ে আর যা যা বলেন, মা স্থবির বসে থেকে শোনেন। মার কল্পনার আরবের সঙ্গে ছোটদার বর্ণিত আরব যে একেবারেই মেলে না, মার ম্রিয়মান মখু টি দেখলেই স্পষ্ট হয়। ছোটদা আরোগ্য বিতানে বাবার সঙ্গে দেখা করে শহরে ঘুরতে বেরোন, হাতে গোনা দু একজন পুরোনো বন্ধুকে খোঁজেন। বিকেলে গীতাকে নিয়ে বেরিয়ে যান, অনুমান করি এখন পিয়নপাড়ায় গীতার বাপের বাড়ি যাওয়া হচ্ছে। বাড়িতে এখন সবাই জানে যে গীতা পুজোতে পিয়ন পাড়ায় তার বাপের বাড়ি যায়, কেউ কোনও প্রতিবাদ করে না। না করলেও কখনও সে ফলাও করে জানায় না যে সে বাপের বাড়ি যাচ্ছে।
ছোটদার দুনিয়া দেখা হতে থাকে, আর ছোটদাকে ঘিরে দুনিয়ার গল্প শোনাও হতে থাকে আমাদের।
আমস্টারডাম শহর থেইকা সমুদ্র অনেক উপরে।
কও কি? শহরটা তাইলে পানির নিচে ডুইবা যায় না?
বাধঁ দেওয়া আছে। ডুবে না।
আর লন্ডন?
লন্ডন ত বিশাল বড়।
ব্রিটিশ মিউজিয়াম দেখছ?
হ, দেখছি।
পিকাডেলি সার্কাসএ গেছিলা?
হ।
প্যারিস গেছ?
হ।
আইফেল টাওয়ার দেখছ?
দেখছি।
ছোটদাকে আইফেল টাওয়ারের মত উঁচু মনে হয়। এত কাছ ঘেঁষে বসে আছি, অথচ ছোটদাকে অনেক দূরের মনে হয়, হাত বাড়ালে যাঁর নাগাল পাওয়া যায় না। সকাল বিকাল দিবি রে, দিবি রে দুইডা টাকা দিবি? বলে হাত পাতার করুণ মুখের ছোটদাকে বেশি আপন মনে হত, এখন ছোটদার ব্যস্ততা বিষম, এখন টাকা পয়সাও অনেক। বাড়ি এসেই বলেন, আজকে নয়ত কালকেই চইলা যাইতে হবে, ফ্লাইট আছে। ছোটদার সঙ্গে অলস দুপুরে এক বিছানায় শুয়ে শুয়ে, মাথার কাছে পা, পায়ের কাছে মাথা, রাজনীতি, সাহিত্য.. গোল্লায় গেছে।—ছোটদা, ময়মনসিংহে আসলা, তোমার নাটকের দলটার সাথে দেখা করছ?
আরে না, সময় কই?
নজরুল, রুহুল, মিলু শফিক এদের সাথে দেখা করছ?
সময় কই!
বাংলার দর্পণে গেছিলা? মঞ্জু ভাইদের সাথে দেখা করব না।
সময় থাকলে তো যাইতেই পারতাম।
প্রথম প্রথম যখন ময়মনসিংহে আসতেন, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা তাঁর ফুরোতো না, আগের মত আড্ডায় বসে যেতেন। এখন সময় নেই সময় নেই। কোনও কারণে তিনি যদি গোলপুকুর পাড়ের দিকে যান, আড্ডার পুরোনো বন্ধুরা ছোটদাকে দেখেই হৈ চৈ করে ডাকেন। ওরা আছে ওদের মতই, ওরা এখনও আড্ডা দেয়, কেবল ছোটদাই নেই। ছোটদার মুখে এখন বিদেশি সিগারেট, একসময় তিনি বন্ধুদের কাছ থেকে দিশি স্টার সিগারেট চেয়ে খেতেন।
কি রে কামাল, এই সিগারেটের নাম কি রে?
কার্টিয়ে।
বাহ বাহ কামাল এখন ফিল্টার অলা সিগারেট খায়! দে না খাইয়া দেখি তর বিদেশি সিগারেট।
ছোটদাকে পুরো গোলপুকুর পাড় চোখ গোল করে দেখে। ছোটদা প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে দেন বন্ধুদের। বাড়ি ফেরার পর অবশ্য মখু ধুয়ে সিগারেটের গন্ধ আগে দূর করে নেন ছোটদা। বাবা মার সামনে তিনি সিগারেট খান না, সিগারেট যে খান তার প্রমাণও রাখেন না। ছোটদার পায়ে বিদেশি জুতো, গায়ে নতুন শার্ট প্যান্ট, তাঁর নিজের। টুডাইল্যা বন্ধুদের কাছ থেকে ছোটদার দূরত্ব বাড়তে থাকে, কেবল তিনি আরও কাছে আসতে থাকেন গীতার। সুন্দরী মেয়ে গীতা, কালো মেয়ে গীতা, ফর্সা হতে থাকা গীতা, যার টিকলো নাক টিকলোই আছে, যার পাতলা ঠোঁট পাতলাই, এখন চায়ে যে চিনি নেয় না, মাংস থেকে আলগোছে চর্বি সরিয়ে রাখে।
ছোট ঈদে ছোটদা আমাদের জন্য নানারকম উপহার আনেন। দুবাই থেকে একটি লিপস্টিক, একটি শ্যাম্পু। দুটো সাবান। কলকাতা থেকে আমার আর ইয়াসমিনের জন্য থ্রিপিস, রং মিলিয়ে তো বটেই ছিট মিলিয়ে জামা পাজামা ওড়না। মার জন্য জায়নামাজ, তসবিহ। বাবা ছুঁয়েও দেখেন না তাঁর জন্য আনা কিছু বাবার জন্য একজোড়া চকচকে জুতো এনে বললেন,মেইড ইন ইতালি। ইতালির জুতো হলে কি হবে,বাবা স্পষ্ট বলে দিলেন, তাঁর জুতোর দরকার নেই। জুতোর দিকে গোল গোল চোখে তাকিয়ে দাদা বললেন, একেবারে আমার পায়ের মাপের জুতা। জুতোজোড়া দাদার জুটল। মার জন্য একখানা টাঙ্গাইলের সুতি শাড়ি গীতাই তুলে দেয় হাতে,মা ধরেন আপনের লাইগা ঈদের শাড়ি আনলাম। আমাদের উপহারও আমাদের হাতে দেয় গীতা, যেন সে নিজের কামানো টাকা দিয়ে আমাদের জন্য কিনে এনেছে এসব। আসলে ছোটদাই গীতাকে দিতে বলেন সবার হাতে, গীতা তুমি কি কি আনছ কার লাইগা, দিয়া দেও। ছোটদা বললেই যে গীতা বাক্স খুলবে তা নয়, তার যখন ইচ্ছে হবে,তখন খুলবে। ইচ্ছে না হলে বন্ধ বাক্সই ফেরত নেবে ঢাকায়।
গীতার পরনে চমৎকার চমৎকার শাড়ি, গা ভর্তি চাক্কা সোনার গয়না, সব গয়না, ছোটদা বলেন, সৌদি আরব থেকে কেনা। গীতার জৌলুস বাড়ছে, ছোটদারও। সন্ধে হলেই পুরোনো পুরোনো বন্ধুর বাড়ি যাচ্ছেন বলে গীতাকে সঙ্গে নিয়ে বেরোন তিনি। ইয়াসমিন বলে, আসলে পিয়নপাড়ায় যায়, তার আত্মীয়ের লাইগা নানান জিনিসপাতি নিয়া যাইতাছে।
