রাত জেগে পড়তে হয়, পরীক্ষা, বাবা বলেন, নাকের ডগায়। কড়া রোদে দাঁড়ালেও নাকের ডগায় এক বিন্দু ঘাম জমে না আমার, এমন নিঝর্ঞ্ঝাট ঝটু ঝামেলাহীন নাকটিকে পরীক্ষার বোঝা এসে প্রায় থেতলে দিচ্ছে। পরীক্ষা কাছে এলে বাবা তাঁর আগের রূপটি ধারণ করেন, উপদেশের ঝড় বইয়ে দিচ্ছেন বলতে বলতে যে মেডিকেলের পড়া দিন রাইত চব্বিশ ঘন্টা না পড়লে হয় না। রাত জাইগা পড়, চোখে ঘুম আসলে, চোখে সরিষার তেল ঢালো। যত পরীক্ষা এগোয়, তত আমার ঘুম বাড়ে, ভয়ের সঙ্গে ঘুমও বাড়ে। বাবা সাত সকালে উঠে ঘরের পাখা বন্ধ করে বাতি জ্বেলে দেন, গরমে আর আলোয় ঘুম ভেঙে যায়। তিরিক্ষি মেজাজ নিয়ে বিছানা ছাড়তে হয়। এক রাতে চোখে ঢালার জন্য এক শিশি সর্ষের তেল কিনে এনে আমার টেবিলে রেখে গেলেন বাবা। কী করতে হবে তেল?
যখনই ঘুম পাইব, চোখে ঢালবা, ঘুম বাপ বাপ কইরা পলাইব!
বাবার আড়ালে আমি সর্ষের তেল দিয়ে মুড়ি মেখে খেতে লাগলাম দিব্যি, আর রাত দশটার আগেই ঘুমের রাজ্যে ঢুকে ঘুমপরীদের সঙ্গে বিস্তর গল্প করে বেড়াচ্ছি। বাবা ফিরে এসে চিৎকার করে বাড়ি জাগান, আরে পরীক্ষার আর তিনদিনও বাকি নাই আর তিনি কি না নাকে তেল দিয়া ঘুমাচ্ছেন! বাবার সম্ভবত ধারণা, চোখে দেওয়ার বদলে বাবার আনা তেল আমি ভুল করে নাকে ঢেলেছি। চোখে আমার ঠিকই সর্ষের তেল ঢেলে রাত জাগতে হয়েছে, ঠিকই এনাটমি আর ফিজিওলজির আগা থেকে মাথা জানতে হয়েছে পড়ে পড়ে। রাত জাগলে বাবা পাশে এসে বসেন আমার। বাবা বসেন, সঙ্গ দেন। যেন আমি ভূতের ভয়ে চোরের ভয়ে নিঃসঙ্গতার ভয়ে আবার মশারির তলে না ঢুকি। মা ফ্লাস্ক ভরে চা দিয়ে যান টেবিলে, আর আমার থেতলে যাওয়া নাকের সামনে তখন ্আমি কারুকে দেখি না, অধ্যাপকদের রক্তচোখ ছাড়া।
লিখিত পরীক্ষা হয়ে গেল, এবার মৌখিক। বাবা বললেন তোমার হারুন স্যাররে একবার বাসায় দাওয়াত করতে হবে। বাবার উদ্দেশ্যটি স্পষ্ট, খাতির। খাতিরে যদি মৌখিক পাশ হয়। হারুন আহমেদ সপরিবার আমাদের বাড়ি এলেন, মা সারাদিন রান্না করলেন, শিক্ষিত লোক বাড়িতে এলে মার সামনে যাবার রীতি নেই, রান্নাঘর থেকে তিনি বাসন পত্রে খাবার সাজিয়ে দিলেন, আমি দাদা আর ইয়াসমিন সেগুলো নিয়ে বৈঠক ঘরে খাবার টেবিলে রাখলাম। হারুন আহমেদ খেলেন গল্প করলেন, গল্প পুরোটাই কবিতা নিয়ে। তিনি কবিতা লেখেন, আমি যদি তাঁর কবিতা কোথাও ছেপে দিতে পারি ভাল হয়। তিনি নিয়েও এসেছেন সঙ্গে দিস্তা দিস্তা কবিতা, একবার চোখ বুলিয়ে আমি অনুমান করি কবিতাগুলো মম জীবনে তব আগমন ঘটার পর অবশেষে কোনও আঁধারে করিবে প্রস্থান। হারুন আহমেদ বাবার ছাত্র ছিলেন। বাবার ছাত্ররা অনেকে অধ্যাপক হয়ে গেছেন। বাবা এখনও পুরো অধ্যাপক হননি, সহযোগীতেই পড়ে আছেন, কিভাবে হব, তোমাদের জন্য পয়সা কামাই করতে করতে তো বড় কোনও পরীক্ষা দেওয়া হয় নাই, তা না হইলে ছাত্র তো খারাপ ছিলাম না। তা ঠিক বাবা ছাত্র ভাল ছিলেন, মেডিকেলে পড়তে এসে এমন হয়েছে যে তাঁর বই কেনার পয়সা নেই, এক ছাত্রের সঙ্গে বাবা তখন এক চুক্তিতে এলেন, রাত দশটার পর, ছেলেটি যখন ঘুমিয়ে যাবে, বই ধার নেবেন তিনি, তাই করতেন, ধার করা বই সারারাত পড়ে, সকালে সেই বই ফেরত দিতেন ছেলেকে, রাত জাগা বাবা সকালে ক্লাস করতে যেতেন।ওভাবে পড়ে, রাত জেগে, ধার করা বইয়ে, বাবা সবচেয়ে বেশি নম্বর পেতেন মেডিকেলে। যেমন পেতেন চণ্ডিপাশা হাইইশকুলে।
বাবার মত মেধা আমার নেই। মৌখিক পরীক্ষায় হারুন আহমেদ আমাকে ইচ্ছে করলেই কঠিন প্রশ্ন করতে পারেন, খাতিরে করেননি। অন্য কলেজ থেকে যে পরীক্ষকরা এসেছিলেন, তাঁরা কঠিন প্রশ্নের দিকে গেলে হারুন আহমেদ কায়দা করে উত্তর ঠিক কোনদিকে যাবে বা যেতে পারে এরকম একটি ইঙ্গিত দিতে চেষ্টা করেছেন। টেবিলে রাখা হাড়গুলো অন্য পরীক্ষক ছুঁতে যাওয়ার আগেই হারুন আহমেদ আমার দিকে ঠেলে দিয়েছেন ফিমার নামের সহজ হাড়টি। এটি হাতে নিয়ে কোন অংশের কি নাম, কোন জায়গায় কোন পেশি এসে লেগেছে, কোন পেশিতে কোন নালি রক্ত সরবরাহ করছে, স্নায়ুই বা কোত্থেকে এসে কি করে কোথায় যাচ্ছে, এসব রকমারি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। ফিজিওলজি পরীক্ষাতেও খাতির জোটে, এই কলেজেরই সহযোগী অধ্যাপকের কন্যাটিকে জটিলতার মধ্যে নিয়ে নাস্তানাবুদ না করাটিই খাতির। প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রায় সকলেই জানে, এখানে ভাগ্যই বড় কথা, কারও ভাগ্যে জটিল প্রশ্ন, কারও ভাগ্যে পড়ে অজটিল। জটিলতা অজটিলতা অনেকটা নির্ভর করে পরীক্ষকদের মন মেজাজের ওপর। পরীক্ষকরা যখন দুপুরের খাওয়ার পর চা খেতে খেতে চেয়ারে হেলান দিয়ে প্রশ্ন করেন, সহজ প্রশ্ন করেন। যাই হোক, খানিকটা বিদ্যায়, খানিকটা খাতিরে আমি ফার্স্ট প্রফ পাশ করি।
ছোটদা ময়মনসিংহে ছুটিছাটায় চলে আসেন বউ নিয়ে। ঈদ আর পুজোর ছুটিতেই আসেন বেশি। বারো মাসে তেরো পুজো লেগে আছে, সব পুজোয় ছুটি না পেলে ছুটি নিয়ে তবে আসেন। গীতা ঈদের উৎসবে আছে, পুজোর উৎসবেও। এ বাড়িতে ঈদ পুজোর উৎসবের চেয়ে বড় উৎসব ছোটদার অবকাশ-আগমন উৎসব। বাড়িতে সত্যিকার উৎসব শুরু হয় ছোটদা এলে। মা ছুটে যান রান্নাঘরে, ছেলের জন্য পোলাও কোর্মা রাধঁ তে, রেঁধে বেড়ে ছেলে আর ছেলের বউকে সামনে বসিয়ে খাওয়ান। পেট পুরে খাচ্ছে কি না তার ওপর কড়া নজর মার। ছোটদার পাতে বড় মাংস তুলে দেন, গীতার পাতেও। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ছোটদাকে বলেন, ঠিক মত খাওয়া দাওয়া কর তো বাবা! কত কষ্ট না জানি হইতাছে চাকরি করতে!
