বাড়িতে রুদ্রর চিঠি না আসতে থাকায় কোনও এক মাথা-পাগল কবি কোনও এক ভুল আবেগে আমাকে কোনও একদিন বউ বলে সম্বোধন করেছিল, বেটার দুঃসাহস এখন কমেছে ভেবে সকলে শান্ত হন, ঘটনা চাপা পড়ে। চাপা পড়ার আরও একটি কারণ হল, বউ বলে সত্যি সত্যি কেউ আমাকে ডাকতে পারে, সত্যি সত্যি আমি কারও বউ হতে পারি এ কল্পনা করা এ বাড়ির কারও পক্ষে সম্ভব নয়। তার ওপর আমি সময়মত কলেজ থেকে ফিরছি, কোথাও কোনও সন্দেহজনক বিলম্ব হচ্ছে না, এনাটমি ফিজিওলজি বইয়ের ওপর মখু গোঁজা থাকে বেশির ভাগ সময়, বাবা মা দাদার তিনজোড়া ভুরুর কঞ্চু ন বন্ধ হয়। বাবা তাঁর রাগটি কলের জলে গুলে ফেলেন, কারণ সামনে পরীক্ষা আমার। পরীক্ষার নাম ফার্স্ট প্রফেশনাল, সংক্ষেপে ফার্স্ট প্রফ। তিনটে পরীক্ষা হয় মেডিকেলে, দ্বিতীয় বর্ষ থেকে তৃতীয় বষের্ ওঠার পরীক্ষাকে বলা হয় ফার্স্ট প্রফ, তৃতীয় থেকে চতুথর্ বষের্ ওঠারটি সেকেন্ড প্রফ, আর চতথুর্ থেকে পঞ্চম বষের্ উঠতে হয় থার্ড প্রফ দিয়ে। পঞ্চম বর্ষের যে পরীক্ষা, সেটি ফাইনাল। ফাইনালের পর ডাক্তার। একবছর প্রশিক্ষণ। তারপর চাকরি। প্রশিক্ষণের সময় ভাতা দেওয়া হয়, মন্দ ভাতা নয়। চাকরি করলে বেতনও মন্দ নয়, তবে বদলির চাকরি, সরকারি ইচ্ছেয় বদলি হতে হবে, এখানে নিজের ইচ্ছে বলে কিছু থাকে না। অবশ্য মামা চাচা থাকলে থাকে। মামা চাচা বলতে, লোক থাকলে, মন্ত্রণালয়ে নিজেদের আত্মীয় লোক, অথবা বিএমএতে খাতিরের লোক। ফার্স্ট প্রফ পরীক্ষায় আমার পাশ হবে বলে আমার মনে হয় না। এতকাল গৃহশিক্ষকেরা আমাকে পড়া গিলিয়ে দিয়ে গেছেন, মেডিকেলে কোনও গৃহশিক্ষক নেই, থাকার কোনও নিয়ম নেই, আমাকে গেলাবার কেউ নেই, নিজেকে গিলতেই হয় যা কিছু য়েচ্ছা গলাধঃকরণে অভ্যেস কম আমার, তাই উদ্বেগ আমাকে মাথার উকুনের মত কামড়ায়। তার ওপর বইয়ের ভাষা ইংরেজি, কোনও দেবনাথ পণ্ডিত নেই যে বলবেন এরে ইংরেজি মিডিয়ামে না দিয়া বাংলা মিডিয়ামে দিয়া দেন, এর দ্বারা ইংরেজি পোষাবে না। বাংলায় চিকিৎসাবিদ্যার কোনও বই নেই। ইংরেজিতে লেখাপড়া ছাড়া গতি নেই কোনও।কিন্তু বাঁচা যে এ ইংরেজি সাহিত্য নয়। ইংরেজি লিখতে গিয়ে বা বলতে গিয়ে ব্যাকরণ কি বানান ভুল হোক ক্ষতি নেই, কিন্তু শরীরের মাথা থেকে পা পর্যন্ত কোথায় কি আছে, কি কাজ তাদের, অনপুুঙ্খ জানা চাই। এতে কোনওরকম ক্ষমা নেই। এসবের বর্ণনা ইংরেজিতে লিখতে বা বলতে গিয়ে ব্যাকরণের কথা কেউ ভাবেও না। একটি জিনিস মনে উদয় হয় আমার, ফরাসি দেশ বা জার্মানি বা স্পেন বা ইতালি বা রাশিয়া, যেসব দেশের ভাষা ইংরেজি নয়, সেসব দেশে তাদের নিজেদের ভাষায় চিকিৎসাবিদ্যা শিখছে ছাত্রছাত্রীরা, তবে এ দেশে কেন বাংলায় বই হয় না? অন্য একটি ভাষায় কোনও বিদ্যা অর্জন করার চেয়ে নিজের মাতৃভাষায় বিদ্যা অর্জন করলে সে বিদ্যা রপ্ত হয় ভাল বলে আমার বিশ্বাস। কিন্তু আমার বিশ্বাসের তোয়াক্কা কেউ করে না। একটি ভিনদেশি ভাষার ওপর নির্ভর করে সকলে এই বিশেষ বিদ্যাটি অর্জন করে। পড়াশোনার চাপে আমার যাবতীয় আউটবই, সেজুঁতির নতুন পাণ্ডুলিপি বা প্রতি সপ্তাহের না পড়া রোববার সন্ধানী বিচিত্রা কোথায় কোন তলে পড়ে থাকে, তার খোঁজ রাখার সময়ও আমার জোটে না। বই পড়ে মখু স্থ করে যখন প্রশ্নের বড় বড় উত্তর লিখছি খাতায়, দেখে বাবা বললেন রিটেনে কেউ ফেল করে না,করে ভাইবায়। বাইরে থেকে এক্সটারনাল এক্সামিনার আইব, একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবি না তো ফেল। আমার গভীর বিশ্বাস, পরীক্ষায় আমার পাশ হবে না। লিখতে দিলে হয়ত কায়ক্লেশে কিছু একটা কিছু দাঁড় করানো যায়, অবশ্য বানিয়ে লেখার ব্যাপারটি এখানে একদমই নেই, যদি প্রশ্ন করা হয় প্যানক্রিয়াসের পজিশন কি? এ সম্ভব নয় লেখা শরতের আকাশের তুলো তুলো মেঘ থেকে একটুকরো মেঘ দুহাতের মুঠোয় নিয়ে দেখলে যেমন দেখায়, প্যানক্রিয়াস তেমন দেখতে। এটি শরীরের কোথায় যে কী করে লুকিয়ে থাকে! একে না খুঁজে পাওয়া যায়, না একে ভুলে থাকা যায়। অগ্নাশয় নিঃসঙ্গ পড়ে থাকে ক্ষুদ্রান্ত্রের পাশে, প্লীহার তলে, হৃদপিণ্ড থেকেও খুব দূরে নয়, বুঝি হৃদপিণ্ডের ধুকপুক শব্দ ওকেও আলোড়িত করে। এর শরীরের দুরকম কোষ থেকে জল প্রপাতের মত বয়ে যায় দুরকম নির্যাস…. ,হবে না, লিখলে জিরো, লিখতে হবে প্যানক্রিয়াস ইজ এন ইলোংগেটেড অরগান, লোকেটেড এক্রস দ্যা ব্যাক অব দা এবডোমেন, বিহাইন্ড দা স্টমাক, দ্যা রাইট সাইড অব দ্যা অরগান লাইস ইন দ্যা কাভর্ অব ডিওডেনাম, লেফট সাইড এক্সটেন্ডস স্লাইটটি আপওয়ার্ডস বিহাইন্ড দ্যা স্পলীন, ইট ইজ মেইড আপ অফ টু টাইপস অব টিস্যুস, এক্সোক্রাইন এন্ড এন্ডোক্রাইন। রস বলে এখানে কোনও ব্যপার থাকতে নেই, যত বেশি কাঠখোট্টা, যত বেশি টু দ্যা পয়েন্ট, তত বেশি নম্বর, আর নম্বরের পরোয়া না করলে, ভাল কসাই হওয়া যাবে হয়ত, ভাল ডাক্তার নয়। অধ্যাপকদের সঙ্গে তেরিমেরি করলে জীবনেও পাশ হবে না, ওঁদের দেখলে, সে ক্লাসে করিডোরে, রাস্তায় বাজারে যেখানেই হোক, আসসালামু আলায়কুম বলতে হবে। এই আসসালামু আলায়কুম টি আমার একেবারেই আসে না, কদমবুসি যেমন আসে না। আরবি ভাষায় শুভেচ্ছা জানানো ছাড়া আর কি উপায় নেই! বাংলায় তো জানানো সম্ভব, কী কেমন আছেন, ভাল তো! অথবা নমস্কার। নমস্কার শব্দটি বাঙালি হিন্দুদের নিজস্ব সম্পত্তি হয়ে গেছে, কোনও শব্দ কি হয় না যে শব্দের কোনও ধর্ম নেই? নাহ! হয় না। যাকেই জিজ্ঞেস করি, বলে, আর কোনও উপায়ই নেই। আমি অসহায় বসে থাকি। আমার ওটুকুই হয়, স্মিত হাসি, এটিই সম্ভাষণ, এটিই শুভেচ্ছা। এ দিয়ে পরীক্ষায় পাশ নাকি হয় না। আরেকটি উপায় বের করি, করিডোরে অধ্যাপকরা হাঁটলে এমন ভাব করে পাশ কাটি, যেন বাইরে তাকিয়ে আছি, অথবা মাটির দিকে, অথবা অন্যমন আমার, অথবা হাতের বইটির দিকে দেখছি, যেন অধ্যাপক নামক বিরাট মানুষটিকে দেখিনি, দেখলে তো কপালে হাত ঠুকে আসসালামু আলায়কুম স্যার বলতামই। বাড়িতে ইয়াসমিনকে জিজ্ঞেস করলাম, তোর অস্বস্তি লাগে না আসসালামু আলায়কুম বলতে? ইয়াসমিন নিঃসংকোচে না বলল, ওর লাগে না। আমার লাগে কেন! মাকে জিজ্ঞেস করলাম এই আসসালামু আলায়কুমের মানেটা কি? মা বললেন আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক। কোত্থেকে বর্ষিত হবে? আকাশ থেকে? মা খানিক ভেবে বললেন আল্লাহ বষর্ণ করবেন। তাহলে তো আকাশ থেকেই, আল্লাহ যেহেতু আকাশেই থাকেন। মা আপত্তি করতে পারলেন না আমার আকাশ বিষয়ক ধারণার। খানিক বাদে মা বললেন, আকাশ বিষয়ে ভাবতে ভাবতে মোক্ষম উত্তরটি মার মনে পড়ল, বললেন আল্লাহ কি শুধু আকাশেই থাকেন! আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান। আল্লাহ বিষয়ে কথা বলতে গেলে মা সাধারণত বইয়ের ভাষা ব্যবহার করেন, কঠিন কঠিন শব্দ, আল্লাহ প্রসঙ্গে না হলে মা সর্বত্র শব্দটি না বলে সব জায়গায় বলতেন, আর বিরাজমান না ব্যবহার করে আছেন বলতেন। আল্লাহ ব্যাপারটি মার কাছেও সম্ভবত কঠিন একটি ব্যাপার। আকাশ থেকে জল ছাড়া সখু বা শান্তি কখনও বর্ষিত হতে আমি দেখিনি। সুতরাং আরবি বাক্যটির যে সরাসরি কোনও বাংলা অনুবাদ চালিয়ে দেব, তাতেও মন সায় দেয় না! সালাম ঠোকার অভ্যেস নেই বলে বেয়াদব, উদাসীন, অভদ্র এসব খেতাব পেয়ে গেছি ইতিমধ্যে।
