বাবা চলে গেলেন। আমি দশটা অবদি ডাকপিয়নের জন্য অপেক্ষা করে রুদ্রর কোনও চিঠি নেই নিশ্চিত হয়ে মার তোশকের তল থেকে টাকা নিয়ে কলেজে যাই। আটটা থেকে কলেজে ক্লাস শুরু হয়। এভাবে ফাঁকি দিলে ভবিষ্যতের বারোটা কেন, তেরোটা বেজে যাবে তা অনুমান করি। পরদিনও একই অবস্থা। ভেবেছিলাম, দিন গেলে বাবা নরম হবেন!নরমের কোনও লক্ষণ নেই। দাদার কাছে হাত পেতে রিক্সাভাড়ার টাকা নিয়ে পরদিন যেতে হয় কলেজে। বাবা নির্বিকার। আমি যে বাড়িতে একটি প্রাণী, তা একেবারে তিনি ভুলে গেছেন। মা উঠতে বসতে ধমকাচ্ছেন আমাকে। মাকে বাবা যা-ই বুঝিয়ে গেছেন, মা তা-ই বুঝেছেন। মা এরকমই, যে যা বোঝায়, তাই বোঝেন, নির্বিবাদে মেনে নেন যে কোনও মানুষের যে কোনও যুক্তি। কেউ যদি বলে এসে, জানো কচু গাছ থেকে পড়ে একজন মারা গেল, মা বললেন আহা, মইরা গেল! মা সবাইকে বলবেনও, জানো কচু গাছ থেকে পইড়া পাড়ার এক লোক একেবারে মইরাই গেল! মা একটুও ভাববেন না যে কচু গাছ থেকে পড়ে কেউ মরে না, আর কচু গাছে কেউ উঠতেও পারে না। মা পৃথিবীর সব লোককে বিশ্বাস করেন, সব লোকের সব কথাকেও করেন।
রুদ্র বউ সম্বোধন বন্ধ করেছে। কিন্তু চিঠি বেহাত হয়ে যাচ্ছে, বুঝি। চিঠি কেবল বাবা সরিয়ে নিচ্ছেন না, দাদাও সরাচ্ছেন। মাও। শেষ অবদি ডালিয়ার শরণাপন্ন হতে হয় আমাকে, খুলনার মেয়ে ডালিয়া, মোটা মোটা বইয়ে সারাদিন ডুবে থাকা ডালিয়া, তোমার হোস্টেলের ঠিকানায় কি আমার চিঠি আসতে পারে ডালিয়া? কাতরোক্তি শুনে খুব পারে বলে দিল। কবিতা লেখার অভ্যেস আছে তার, যেচে শতাব্দী চত্রে²র সদস্যও হয়েছে, তা না হলে এ কাজটি করতে এক কথায় রাজি হত কি না কে জানে, হয়ত সাত রকম প্রশ্ন করত। রুদ্র আবার মাস চার পর ময়মনসিংহে আসে, কলেজ ক্যান্টিনে বসে থাকা রুদ্রর সঙ্গে দেখা করতে যাই ডালিয়াকে নিয়ে। আসলে যখনই যাই, বেশির ভাগ সময়ই কাউকে না কাউকে নিয়েই যাই, হয় হালিদা, নয় মদিরা, নয় ডালিয়া। একা রুদ্রর মুখোমুখি বসে থেকে আমার কোনও কথা বলা হয় না। কেবল মুখোমুখিই বসে থাকা হয়। অনেকদিন সে বলেছে, একা আসতে পারো না? আমি যে পারি না, সে কথাও বলা হয় না তাকে। কেউ থাকলে সেই কেউএর সঙ্গে কলকল কথা বলে আমার একরকম বোঝানো হয় যে আমি যে কথা বলতে পারি না তা নয়, পারি, আমার শব্দসম্ভার নেহাত মন্দ নয়। অবশ্য শব্দ যা উচ্চাজ্ঞরত হয় তা বেশির ভাগই ডাক্তারিবিদ্যা সম্পর্কিত। রুদ্রকে তখন নীরব শ্রোতা হতে হয়। ফাঁক পেয়ে রুদ্র আমাকে বলে, এবার বিষয়টি জানাও তোমার বাবাকে। আমি সশব্দে হেসে উঠি, এ সত্যিই একটি হাস্যকর প্রস্তাব তার। পাঁচ বছর অপেক্ষা করা ছাড়া কোনও রকম উপায় নেই। ডাক্তার হওয়ার পর যদি বাবাকে কিছু জানানো সম্ভব, জানাবো, তার আগে কোনও প্রশ্ন ওঠে না। রুদ্র মন খারাপ করে বসে থাকে। সে বারবারই আমাকে বোঝাতে চায় যে প্রথম বাবা মা একটু রাগ করবেনই, পরে ঠিক হয়ে যাবে। পরে যে কিছুতেই কিছু ঠিক হবে না, সে আমি রুদ্রকে বোঝাতে চেষ্টা করি। মাঝখান থেকে, বলি যে, আমার ডাক্তারি পড়াই জন্মের মত বন্ধ হবে। রুদ্র মখু শুকনো করে চলে যাওয়ার পর আমি বুঝিয়ে চিঠি লিখি, পাঁচটা বছর দেখতে দেখতে কেটে যাবে, ভেবো না। রুদ্র লেখে, পাঁচটা বছর আসলেই খুব বেশিদিন নয়। দেখতে দেখতেই কেটে যাবে। কিন্তু পাঁচ বছর আমার জন্য অনেক অনেক দিন, অনেক বছর। আমি তোমাকে ঠিক বোঝাতে পারব না। তোমার সব কিছুই আমি বুঝি, তবু বলছি। সব কিছু বুঝতে পেরেও বলছি। তুমি একটু বুঝতে চেষ্টা কর। মানসিক পীড়ন কেন? আমার কালো অতীতের দিকে তাকালে বুঝতে পারবে। বুঝতে পারবে, আমার এই পীড়ন কেন। তোমাকে আমি বোঝাতে পারছি না। তুমি জানো না, আমার কোনও বন্ধু নেই। অনেক শুভাকাংখি, অনুরাগী, স্বজনেরা আছে, তারা কেউ আমাকে বুঝতে পারে না। আমার এখন তোমাকে প্রয়োজন, শুধু তোমাকে। অবলম্বনহীন হৃদয়কে আমি বেশিদিন ভাল রাখতে পারব না। রুদ্রর কোনও কালো অতীতের কথা আমি জানি না। কালো অতীত বলতে ঠিক কি বোঝাতে চায় সে তা আমার বোঝা হয় না। আমি এর অর্থ করি, অযথা ঘুরে বেড়ানো, লেখাপড়া না করা, পরীক্ষা না দেওয়া। রুদ্রকে আমি আমার দৈনন্দিন জীবনের কথা, আমার স্বপ্নের কথা জানাতে থাকি। রুদ্র লেখে, তোমার স্বপ্নের সাথে আমার স্বপ্ন একদম মেলে না। যেখানে তোমার স্বপ্ন খুব শুভ্র, কমনীয় ফুলের মত সেখানে আমি একেবারেই ইটপাথর। জীবনকে আমি অত্যন্ত নির্মম চোখে দেখি। এতটা নির্মমতা হয়ত ভাল নয় তবু কেন জানি এরোমই আমার হয়। এক কাজ করলে কেমন হয়, স্মৃুতি বন্টনের মত শুভ্রতা আর শ্যামলিমার স্বপ্ন তোমার হোক, আমার হোক গ্লানি আর নির্মমতার স্বপ্ন। ভাল মন্দ মিলিয়েই তো জীবন। আমরা এইভাবে ভাগাভাগি করে নেব কেমন! আমার বোঝা হয় না মানুষ কি করে স্বপ্ন দেখতে পারে অসুন্দরের। অসুন্দরের সঙ্গে তো আমার নিত্য বসবাস, তাই স্বপ্ন দেখি সুন্দরের। রুদ্রকে যে করেই হোক পরীক্ষা দিতে বলি, এমএ পাশ হলে ভবিষ্যতে হয়ত রুদ্রর কথা কখনও কোনওদিন বাড়িতে উচ্চারণ করা যাবে, কিন্তু রুদ্র বলে বোধহয় কোথাও একটা ভুল থেকে যাচ্ছে, একটা ফাঁকি, খুব সূক্ষ্ম যার ফাটল, না বোঝার তীক্ষ্ম আর মিহি ফাঁক থেকে যাচ্ছে। আমি ঠিকই বুঝতে পারছি। এই সূক্ষ্ম ফাঁক দিয়ে একদিন লক্ষিন্দরের বাসরে যে ভাবে কালনাগিনী ঢুকেছিল, ঠিক সেভাবেই অবিশ্বাসের সাপ ঢুকবে, ঢুকবে না পাওয়ার আক্ষেপ আর ব্যথর্ আকাঙক্ষার ক্লান্তি। আমাদের সতর্কে হওয়া উচিত, আমাদের আরও সতর্ক হওয়া উচিত। কৈশোর শেষ হবার সাথে সাথেই আমি খুব ধীরে ধীরে আমার জীবন যাপন, আমার বিশ্বাস পরিবর্তন করছি একটি বিশেষ লক্ষে। একাডেমিক ক্যারিয়ার বলতে যা বোঝায়, তা প্রায় সম্পূর্ণই ধ্বংস করে ফেলেছি। হ্যাঁ অনেকটা ইচ্ছে করেই। আমাদের এই সমাজ, এই জীবনের অনেক অন্ধকার, অনেক আলো, অনেক ঘৃণা অনেক অবিশ্বাস, প্রতারণা, আর অনেক বিশ্বাস আর ভালবাসা আমি দেখেছি। হয়ত সারা জীবন এইভাবে পুড়ে পুড়ে দেখব। দেখব দুরারোগ্য অসুখের জীবাণু দেহে নিয়ে কতটা তার যন্ত্রণা দেবার ক্ষমতা। আমার ঘরের উঠোনে হয়ত কোনওদিন রজনীগন্ধা ফুটবে না। হয়ত আমার টেবিলের ফুলদানির পরিবর্তে থাকবে একটা মস্ত বড় মাটির অ্যাশট্রে। হয়ত আমার প্রিয় সঞ্চয় হবে একজন নিহত মুক্তিযোদ্ধার হেলমেট। কিংবা একটা মানুষের খুলি। কোথাও নিশ্চয়ই কোনও ভুল হচ্ছে, এত ফুল, এত পাখি আর এত সুখের স্বপ্ন তো আমি দেখি না। তুমি কেন দেখ? আমি তো দুটি পরিশ্রমী আর কর্মব্যস্ত মানুষের স্বপ্ন দেখি। দিনে রাতে খুব কমই অবসর তাদের।
