বউ সম্বোধন করে লেখা রুদ্রর দ্বিতীয় চিঠিটি বাবার হাতে পড়ে। ডাকপিয়ন বাড়িতে চিঠি দিয়ে গেছে, আর পড়বি পড় মালির ঘাড়ে, বাবার হাতে। বাবার যেহেতু অন্যের চিঠি খুলে পড়ার প্রচণ্ড শখ, তিনি পড়েন। তার মেয়েকে কেউ বউ বলে ডাকছে, তিনি তা খালি চোখে, চশমা চোখে সব চোখেই দেখেন। ঘরময় পায়চারি শুরু হয় বাবার, আমার পড়ার টেবিলের বইখাতা তছনছ করেন আরও তথ্য পেতে। ঘন ঘন তিনি চশমা খুলতে থাকেন, চেয়ারে বসতে থাকেন, চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে থাকেন, একসময় বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান, রোগী দেখায় মন বসে না, আবার বাড়ি ফেরেন। এবার মাকে ডাকেন। যখনই ছেলে মেয়ে সংক্রান্ত কোনও দুর্ভাবনা, তখনই বাবা মার খোঁজ করেন, অথবা বাড়িতে অতিথি আসবে, তখনই মার খোঁজ, কই গেলা ঈদুন, এদিকে আসো তো! বাবা হিশেব দেন, কজন আসবে, কতজনের জন্য রান্না করতে হবে, এমনকি কি কি রাধঁ তে হবে তাও। মা মন দিয়ে শোনেন সব। শোনেন কারণ মার এসময় নিজেকে খুব মূল্যবান মানুষ বলে মনে হয়। এ সংসারে তাঁর যে প্রয়োজন আছে, তা উপলব্ধি করেন মা এবং বিচিত্র এক আনন্দ মাকে লেপ্টে থাকে মার ঘামের মত। এবার ডাকার পর হন্তদন্ত হয়ে মা সামনে দাঁড়ালে বাবা বলেন, নাসরিনরে বউ ডাকে কেডা জানো নাকি? কার এত সাহস ওরে বউ ডাকে?
কি জানি, আমি ত এইসব কিছু জানি না।
কোনও ছেলের সাথে জড়াইল নাকি?
এইরকম তো কিছু দেখি নাই। হাবিবুল্লাহরে ত বাড়ি থেইকা ভাগাইল। তেমন কোনও ছেলেও ত বাড়িত আসে না। কারও সাথে জড়াইছে বইলা মনে হয় না।
না জড়াইলে বউ নামে চিঠি তারে কোন বেডায় লেখে?
তা তো জানি না।
খবর তো কিছু রাখো না। কি কর সারাদিন বাড়িতে? মেয়ে কি করতাছে না করতাছে, তার খবর যদি না রাখতে পারো, তাইলে কি লাভ? আমি বাউণ্ডারি ওয়াল উঁচা করলাম। বাইরের কোনও ছেলেপিলে মেয়েদেরে যেন না দেখতে পারে সেই ব্যবস্থা করলাম। এখন কোথাকার কোন ছেলে ওরে বউ কইয়া ডাকে!
চিঠি লেখে তা জানি। পত্রিকা ছাপায়। এদিকে ওদিকে চিঠি লিখতে হয় কয়।
এই চিঠি কোনও পত্রিকার চিঠি না। এইটা অন্যরকম চিঠি।
আমি বাড়ি ফিরি কলেজ থেকে। মা দৌড়ে রান্নাঘরে গিয়ে আমার জন্য খাবার নিয়ে আসেন অন্যদিন। সেদিন তিনি মোটেও নড়েন না।
কি, ভাত কই?
ভাত পাতিলে। মা বলেন।
আমেনাও নড়ে কি নড়ে না চলে কি চলে না। অসম্ভব শথ্ল গতিতে ভাত বেড়ে নিয়ে আসে। সঙ্গে ডাল।
কি!ডাল দিয়া ভাত দিলা যে! মাছ মাংস নাই।
প্রত্যেকদিন মাছ মাংস লাগব না। মার রুক্ষ কণ্ঠ।
মাছ মাংস ছাড়া আবার ভাত খাওয়া যায় নাকি?
আমি দুমুঠো খেয়ে থালা ঠেলে উঠে চেঁচাই, পানি কই?
মা বলেন, পানি কলে।
পানি কলে সে তো আমিই জানি, কিন্তু দিতে হবে তো।
কে দেবে আমাকে পানি! গজগজ শুরু করলে গজেন্দ্রগামিনী আমেনাই একসময় কল থেকে গেলাসে পানি ভরে নিয়ে আসে। বাড়ি থমথম। অনুমান করি কিছু একটা হয়েছে। কি হয়েছে তা বোঝাবার জন্য মা বেশিক্ষণ অপেক্ষা করেন না। বিছানায় টান টান হয়ে একটি বই হাতে নিয়ে যখন শুয়েছি, গম্ভীর মুখে কাছে এসে গম্ভীর মুখেই জিজ্ঞেস করেন, রুদ্র কেডা?
রুদ্র?
হ রুদ্র।
কেন?
সে তরে বউ ডাকে কেন?
বুকের মধ্যে ঠাণ্ডা জলের গেলাস উপুড় হয়ে পড়ে। বোঁ বোঁ পাখার তলে আমি ঘেমে উঠি। দিনের ঝলমল আলো চোখের সামনে অমাবস্যার রাতের মত লাগে। কী কস না কেন, রুদ্র কেডা?
আমার আর বলার দরকার নেই রুদ্র কে! আমার শুধু জানার দরকার, চিঠি মার হাতে পড়েছে না অন্য কারও হাতে। বাবার হাতে হলে জীবনের এখানে এ মুহূর্তে সমাপ্তি। ডাল ভাত তো জুটেছে আজ, কাল কিছুই হয়ত জুটবে না। খানিকটা নরম হলে মা নিজেই বলেন, চিঠি বাবার হাতে পড়েছে। এটি জানার পর নিষ্প্রাণ শরীরটি নিচ্ছিত নিরালায় ফেলে ফেলে রাখি, বাড়িতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে অপ্রকৃতিস্থের মত উঠে রুদ্রকে লিখি যেন বউ সম্বোধন করে আর একটি চিঠিও সে না লেখে। রুদ্রকে চিঠি আমার এভাবেই লিখতে হয়, বাড়িতে কেউ না থাকলে, অথবা সবাই ঘুমিয়ে গেলে। তা না হলে যে কেউ লেখাটির ওপর ঝুঁকে পড়বে, যে কারও এ বাড়িতে অধিকার আছে দেখার আমি কি লিখছি, আড়াল করতে চাইলে আগ্রহ অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে।
প্রতিদিন সকালে বাবা বেরিয়ে যাবার আগে আমার আর ইয়াসমিনের চাইতে হয় ইশকুল কলেজে যাওয়ার রিক্সাভাড়ার টাকা। বাবা গুনে টাকা দিয়ে যান। পরদিন সকাল হয়, বাবার গোসল সারার শব্দ হয়, জুতোর মচমচও শুনি, বাবার নাস্তা খাওয়ার এমনকি পানি গেলার শব্দও পাই, কিন্তু ধড়ে প্রাণ নিয়ে সামনে গিয়ে অন্যদিনের মত নতমুখে দাঁড়িয়ে রিক্সাভাড়ার টাকা চাওয়ার মত কলজের জোর আমার থাকে না। নিজের অস্তিত্বটিই এক বড় বোঝা আমার কাছে। আমি যদি এক তুড়িতে হাওয়ায় হাওয়া হয়ে যেতে পারতাম। আমাকে যদি কেউ দেখতে না পেত! টেলিভিশনে ইনভিজবল ম্যান সিরিজটি দেখে মাঝে মাঝে অদৃশ্য হওয়ার প্রয়োজনীয়তা আমি হাড়ে মাংসে অনুভব করি। বাবার কাছ থেকে নিরুদ্বেগে টাকা চেয়ে নিয়ে এসেছে ইয়াসমিন। নিরুদ্যম আমি ঘরের ভেতর দমবন্ধমখু বন্ধ পেটেরতলপেটেরচাপ সব বন্ধ করে বসে থাকি, বাবার মুখোমুখি হতে যেন আমাকে না হয়। বেরিয়ে যাওয়ার আগে তিনি ভেতর বারান্দায় দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে যেন বাড়ির প্রত্যেকে শোনে, মাকে বলেন,ওর লেখাপড়া বন্ধ। ওরে আর কলেজে যাইতে হইব না। সব বন্ধ। ওর খাওয়া দাওয়া বন্ধ কইরা দাও। ভাত দিবা না!
