রুদ্র সেবার ঢাকা ফিরে যাবার পর, কদিন পর আর, সাতদিন, ক্লাসে ঢুকতে যাব, ওপরের ক্লাসের এক মেয়ে এসে জানাল নীরা লাহিড়ী খবর পাঠিয়েছে, এক্ষুনি যেন তার বাড়ি যাই।
ক্লাস ফেলে দৌড়োলাম গুণের বাড়ি।
দেখি রুদ্র বসে আছে গুণের বসার ঘরে। ঘরে দুটো কাঠের চেয়ার, একটি চৌকি। চৌকিতে। দেখে মন নেচে ওঠে। রুদ্রকে দেখলে এই হয় আমার, মন নাচে।
কী ব্যাপার হঠাৎ!
হ্যাঁ হঠাৎ। চিঠিতে জানাবার সময় পাইনি।
ও।
এরপর মুখোমুখি বসে থাকা নৈঃশব্দের সঙ্গে দুজনের। নৈঃশব্দের নীলিমা জুড়ে রুদ্রর স্টার সিগারেটের ধোঁয়া।
রুদ্র তার কাঁধের কালো ব্যাগ থেকে একখানা কাগজ বের করে বলল, এই কাগজে একটা সই করতে হবে তোমার।
কিসের কাগজ এটা?
পরে বলব। আগে সই কর।
কেন?
এত কথা বোলো না।
কাগজটা কিসের?
প্রশ্ন করি, কিন্তু আমি নিশ্চিত রুদ্র কোনও স্মারকলিপিতে অথবা নতুন কোনও কবিসংগঠন তৈরি করেছে, আমাকে সেই সংগঠনের সদস্য করতে সই চাইছে। আমার নিশ্চিত চোখদুটোয় ভোরের স্নিগ্ধ আলো। আমার নিদ্বির্ধ ঠোঁটে এক ঝাঁক পাখির ওড়াওড়ি। কাগজটি নিতে হাত বাড়ালে রুদ্র সরিয়ে নেয় কাগজ।দ্বন্দ্বে পড়ি, ধন্ধে পড়ি।
কিসের কাগজ এটি? না পড়ে তো সই করব না!
রুদ্রর শ্যাওলা পড়া চোখ স্থির হয়ে থাকে আমার চোখে।
বিয়ের কাগজ। রুদ্রর ভারি কণ্ঠ, ভাঙা কণ্ঠ।
কান ঝাঁ ঝাঁ করে। ঝাঁ ঝাঁর ঝঞ্ঝাট ঝেড়ে ঝরঝরে হই।
বিয়ের কাগজ?
হ্যাঁ বিয়ের কাগজ।
কেন?
কেন মানে?
বিয়ের কাগজ কেন?
কেন তা বোঝো না?
না।
সই করবে কি করবে না বল।
আশ্চর্য, এভাবে, এরকম করে বিয়ে করব কেন?
তাহলে তুমি সই করবে না?
কী লেখা আছে দেখি!
আমি কাগজটি হাতে নিতেই রুদ্র হাঁ হাঁ করে উঠল, বৌদি আসছে, লুকোও।
লুকোবো কেন?
বুঝে ফেলবে।
কি বুঝবে?
বুঝবে যে বিয়ের কাগজ।
কি করে?
আরে বুঝবে বললাম তো!
বুঝলে কি ক্ষতি?
ক্ষতি আছে।
কি ক্ষতি, শুনি!
রুদ্র টেনে নিল কাগজখানা হাত থেকে। পাথুরে গলায় বলল তুমি সই করবে কি না বল, হ্যাঁ বা না।
এ কি আশ্চর্য! বিয়ের কথা উঠছে কেন হঠাৎ!
উঠছে।
কে উঠিয়েছে?
আমি।
আমি তো বলিনি আমি বিয়ে করব!
আমি বলছি।
এক হাতে তালি বাজে?
সই করবে?
না।
কাগজটি ব্যাগে ঢুকিয়ে উঠে দাঁড়াল রুদ্র, বলল ঠিক আছে, চললাম।
বিস্ময় আমার জগত ধোঁয়াটে করে আনে, কোথায়?
ঢাকায়।
এক্ষুনি?
হ্যাঁ।
কেন, কি হয়েছে?
থাকার আর প্রয়োজন নেই।
প্রয়োজন নেই?
রুদ্রর নিরুত্তাপ কন্ঠ। না।
কাগজে সই করিনি বলে সব প্রয়োজন ফুরিয়ে গেল?
কোনও উত্তর না দিয়ে দরজা হাট করে খুলে বেরিয়ে যায় রুদ্র। বেরিয়ে যাচ্ছে। যাচ্ছে। ভালবাসায় উপচে ওঠা আমার হৃদয়খানা সে পায়ে মাড়িয়ে যাচ্ছে। সত্যি সত্যি সে চলে যাচ্ছে। যাচ্ছে। পেছনে আমি একা, রুদ্র ফিরে তাকাচ্ছে না। আমি আর তার কেউ নই। সে ফিরছে না।
তীব্র এক বেদনা আমাকে উঠিয়ে বারান্দায় নিল, তার চলে যাওয়ার দিকে নিল, তার চলে যাওয়াকে দুহাতে থামাল।
কই দেখি, কাগজটা দেখি তো!
কেন?
কেন আবার, সই করব!
রুদ্র কাগজ বের করে দিল।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে খচখচ করে কি লেখা না পড়ে না দেখে সই করে, কাগজটি রুদ্রর হাতে দিয়ে, মুহূর্তে উজ্জ্বল হয়ে ওঠা তার চোখের দিকে আমার বেদনাতর্ দৃষ্টি ছুঁড়ে বললাম এই সইএর যে এত মূল্য তা আগে বুঝতে পারিনি। সই হল। এবার খুশি তো! চলি।
গুণের বাড়ির আঙিনা পার হয়ে রাস্তায় উঠলাম। দ্রুত।
পেছন থেকে রুদ্র শোনো, দাঁড়াও বলে ডাকছে।
আমি পেছন ফিরিনি।
রিক্সা নিয়ে সোজা কলেজে। পরের ক্লাসগুলো খুব মন দিয়ে করলাম।
তখনও আমার ভেতর এই বোধটিই আসেনি, যে, অভিমানের ওই সইটিই আমার বিয়ে ঘটিয়ে দিয়েছে। তখনও আমি রুদ্রকে রুদ্র বলে ডাকি না, তুমি বলে সম্বোধন করি না। তখনও কোনও চুমু খাইনি আমরা, স্পর্শের মধ্যে কেবল হাতের আঙুল। তখন সবে আমার উনিশ বছর বয়স।
১২. হৃদয়ের একূল ওকূল
কাগজে সই নিয়ে যাবার মাস দুই পর রুদ্র চিঠি লেখে, বউ সম্বোধন করে। সম্বোধনটি পড়ে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। কেমন অদ্ভুত আর অচেনা এই ডাকটি। আমি তবে কারও বউ! ওই সইটি তবে কি সত্যি সত্যি বিয়ে ঘটিয়ে দিয়েছে! অবিশ্বাস্য একটি কাণ্ড। নিজের বিয়ে, কোনওদিন কল্পনাও করিনি ওভাবে হবে, হবে যে কোনওদিন, সে বিশ্বাসই ছিল না। জানুয়ারির ছাব্বিশ তারিখে কাগজে সই করলাম, আর কাগজটি উকিলের কাছে দিয়ে আসার পর উকিল তাঁর নিজের সই আর সীল বসালেন উনত্রিশ তারিখে। শাদামাটা চিঠিতে রুদ্র জানিয়েছে, উনত্রিশ তারিখটি আমাদের বিয়ের তারিখ। উনত্রিশ তারিখে আমি কি করছিলাম, ভাবি, সারাদিন কি একবারও রুদ্রর কথা ভেবেছি? না ভাবিনি, সময় পাইনি, মরা মানুষ কেটেছি, ছোটখাট একটি পরীক্ষা ছিল, প্রচুর পড়তে হয়েছে, পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফিরে আর দিনের মতই টেলিভিশন দেখেছি, ভাই বোনের সঙ্গে খুনসুটিতে মেতেছি, আর দিনের মতই কবিতা পড়েছি, গান শুনেছি, খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়েছি। রুদ্রর চিঠি পেয়ে যতই আমি নিজেকে বলি, দেখ তুই এখন আর অবিবাহিত নস, রীতিমত এক লোকের বউ। বিয়ে করলে তো বউই হতে হয়। এরকমই তো নিয়ম, তুই চাস বা না চাস কাগজের ওই সইটিই তোর বিয়ে ঘটিয়েছে, ওই বলাই সার, ব্যাপারটিকে আমার বোধ ও বিশ্বাসের অনগ্তর্ ত করতে পারি না। আমি সত্যি করে অনুভব করতে পারি না যে আমি আর আগের আমি নই, আমি এখন নানি,মা, ফজলিখালা,রুনখুালার মত বিবাহিতা। চন্দনাও বিবাহিতা। বিয়ের পর চন্দনা লিখেছে আমি এখন ভয়শূন্য এক মানুষ। জীবন বাজি রেখে স্বপ্নের হাত ছুঁয়েছি। আমি খুব গভীর করে স্বপ্ন দেখতে জানি এখন। জীবন তো আমার একটাই। আমি ভুল করিনি। আমি এখন হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারি রক্তগোলাপ। বিবাহিতা চন্দনার আবেগ চাইলেও আমার ভেতর সঞ্চারিত হচ্ছে না। আমার বোধের সীমানায় নেই পুরুষের স্পর্শ নারীর শরীরে কিরকম কাপঁ ন তোলে, আর সেই কাপঁ ন কি রকম তৃষ্ণা জাগায়। কলেজে পুরুষ বন্ধু যা আছে, তা কেবলই বন্ধু। চন্দনা যেমন। কোনও পুরুষকে আজও আমার চুমু খাওয়া হয়নি। কারও জন্য শরীরে কোনও তৃষ্ণা অনুভব করি না। তৃষ্ণা বলে যে একটি জিনিস আছে তা আমার নেহাতই জলের বা চায়ের বা খুব গরমে লেবুর শরবতের।
