ভাল কবিতা লিখে নিই, পরে দেখাবো।
এনো তো বাবা! যা বলছি শোনো।. আচ্ছা একটা কথা…
কী?
তুমি আমাকে কোনও সম্বোধন কর না কেন?
কি রকম?
না ডাকো রুদ্র, না বল তুমি।
বলি তো!
কই বল!
চিঠিতে।
সে তো চিঠিতে। চিঠিই তো জীবন নয়। সামনে ডাকো না কেন?
লজ্জা আগুনের শলা ছোঁয়ালো সারা মুখে। প্রতিবারই রুদ্রর সঙ্গে দেখা করার আগে আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অথবা মনে মনে রুদ্র তুমি রুদ্র তুমির মহড়া দিই। রুদ্র তুমি কি খাবে বল, রুদ্র তুমি কি আজই চলে যাবে, এসব বাক্যের চর্চাও চলে। কিন্তু তার সামনে এলেই, মূল মঞ্চেই, আমার মহড়া মখু থুবড়ে পড়ে। প্রাণপণ চেষ্টা করেও আমার ভাববাচ্যের শেকল থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারি না।
তোমাকে এত দূরের মনে হয় কেন! একটওু তোমাকে স্পর্শ করতে দাও না। কত বলছি, হাতটা দাও। দিচ্ছ না। এত ভয় কিসের, আমি কি বাঘ ভালুক নাকি!
রুদ্র বাঘ ভালুক নয় তা জানি। রুদ্র সত্তর দশকের উজ্জ্বল তরুণ। সত্তর দশক যুদ্ধের মৃত্যুর ভাঙনের দশক, সত্তর দশক কবিতার দশক, কবিতায় লাশের গন্ধ, চিৎকার, প্রতিবাদ। রুদ্র তার কবিতায় এই দশকটির চিত্র চমৎকার এঁকেছে। যখন সে তার ঢাকার জীবনযাপনের গল্প করে, মগ্ধু হয়ে শুনি। তার ওই জীবনটি বড় দেখতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে পুলিশের গুলিতে আহত মানুষ নিয়ে শহরে মিছিল করি, ইচ্ছে করে প্রতিবাদের লিফলেট ছেপে দেয়ালে দেয়ালে সেঁটে দিই। ইচ্ছে করে রুদ্রর মত আমিও টিএসসির মাঠে বসে চা খেতে খেতে লাকি আখন্দের গান শুনি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে সারা বিকেল ঝালমুড়ি খেতে খেতে সাহিত্যের আড্ডায় মেতে উঠি। মহিলা সমিতিতে সেলিম আল দীনের নাটক হচ্ছে, দেখি। কদিন পর পরই কবিতার অনুষ্ঠান হচ্ছে, অনুষ্ঠানগুলোয় যাই, কবিতা শুনি। রুদ্র যেন আমার অল্প অল্প করে জাগা কবিতার চারার আশপাশ থেকে আগাছা সরিয়ে জল ঢালে, অথবা বলা যায় ছিল বারুদ, সে আগুন জ্বালে। প্রবল তৃষ্ণা জাগে কোনও এক অদেখা অচেনা কবোষ্ণ জীবনের জন্য। না মেটা তৃষ্ণা নিয়ে আমাকে বিকেল বিকেল উঠতে হয়, যেতে হয় বাড়িতে, হিশেব দিতে হয় দেরি হওয়ার, মিথ্যে বলতে হয়, বলতে হয় যে ক্লাসের পর মেয়েদের হোস্টেলে ছিলাম, মিথ্যে বলার সময় আমার গলা কাঁপে, দুচোখ হয় মাটিতে নয় বইপত্রে। ঢাকায় রুদ্রর ওই জীবনটিও পরে দেখা হয়েছে আমার। বেহিসেবি, বেপরোয়া, উদ্দাম, উত্তাল জীবন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে, টি এস সি চত্বরে, চা সিগারেট খেতে খেতে কতরকম মানুষের সঙ্গে যে রুদ্র কথা বলে! রাজনীতির কথা। সাহিত্যের কথা।ঠা ঠা করে হাসে। তার বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছে, বন্ধুরা হয় কবি নয় গল্পকার, নয় গায়ক, নয় নায়ক। তখনও আমি অচেনা কারও সঙ্গে কথা বলতে না পারা লাজুকলতা, পাতাকাঠির মত শরীর আর ফিনফিনে চুলের মেয়ে। রুদ্রর জীবনের দিকে আমি আকন্ঠ বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকি। চমৎকার এক মুক্ত জীবন, কারও কাছে কৈফিয়ত দিতে হয় না কোথায় যাচ্ছে কী করছে, ঘরে ফিরতে দেরি হচ্ছে কেন। ঢাকাতেও আমার সময় বাঁধা থাকে রুদ্রর সঙ্গে সময় কাটানোর, রুনুখালা এক ঘন্টা কি দেড়ঘন্টা সময়ের জন্য আমাকে হাতছাড়া করেন। রুদ্রর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি জেনেই করেন। ঝুনু খালার নিজের প্রেমের গল্প আমাকে নিদ্বির্ধায় শুনিয়ে যান, আমারটি বলতেও আমি ঝুনুখালার কাছে দ্বিধাহীন হই। তিনি রক্তচক্ষু অভিভাবকের মত আমাকে এ ব্যাপারে শাসন করেন না মোটেও। অনেক আগেই বড়মামার বাড়ি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের ছাত্রীনিবাস রোকেয়া হলে উঠেছেন রুনুখালা,প্রেম করছেন বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়েরই এক আপিসে চাকরি করা মতিউর রহমান নামের এক বরিশালির সঙ্গে। বরিশালির সঙ্গে যখন তিনি দেখা করতে যান, বগলদাবা করে নিয়ে যান আমাকে। সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের ঘাসে বসে তিনি বরিশালিকে নিজের বাড়ির আর আত্মীয় স্বজনের গল্প করেন, শুনে এত চেনা রুনুখালাকেই আমার বড় অচেনা লাগে। যে কেউ ধারণা করবে ধনে মানে রুনুখালার আত্মীয়রা সাংঘাতিক কিছু লাখপতি কোটিপতির নিচে কোনও আত্মীয়ই নেই তাঁর, এমন। রুনুখালার গা ঘেঁষে বসে বরিশালির চিকচিক চোখদুটো দেখি। ঝুনুখালার সবকিছু আমার খুব ভাল লাগে, তিনি একা যেখানে খুশি যাচ্ছেন, ঢাকা থেকে ছুটিছাটায় একা একা ময়মনসিংহ চলে যাচ্ছেন, এমনিতে তাঁর মাথা বোঝাই বুদ্ধি, কেবল একটি সময়ই তাঁকে খুব বোকা বোকা লাগে যখন তিনি বরিশালির সঙ্গে দেখা করেন। একেবারে ছোট্ট খুকির মত হয়ে যান তিনি, আমি যে বোকা, আমার চেয়েও বোকা তখন বুদ্ধির ঢেকিটি। একবার ঢাকা থেকে ট্রেনে ময়মনসিংহ আসার সময় স্মৃতিময় বন্দোপাধ্যায় নামে এক গল্পলেখকের সঙ্গে কথা হল, কথা হল আর তিনি লোকটিকে অবকাশে নিয়ে উঠলেন। চা বিস্কুট দেওয়া হল অতিথিকে। স্মৃতিময়ের সামনেও রুনুখালাকে বড় বোকা লাগছিল, মুখে একটি লাজরাঙা হাসি ছিল রুনুখালার, যেন স্মৃতিময় ঝুনুখালার দীর্ঘ দীর্ঘ বছরের প্রেমিক গোছের কিছু ঝুনুখালা ময়মনসিংহ এলে অবকাশে সারাদিন আমাদের সঙ্গে কাটিয়ে সন্ধেয় বাড়ি ফিরে যান। আমার আবদারে তিনি মার অনুমতি নিয়ে আমাকে ঢাকা বেড়াতে নিয়ে যান একদিন বা দুদিনের জন্য, আমার তৃষ্ণা না ফুরোতে দিয়েও যান আমাকে মার হাতে বুঝিয়ে। ঝুনুখালার সঙ্গে আমাকে যেতে দিতে খুব আপত্তি ওঠে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারি মেয়ে রুনুখালা, বাবাও রুনুখালাকে অবজ্ঞা না করে কথা বলেন।
