লাজুক মেয়ে উত্তরে বারো পাতার চিঠি পাঠাল। এই হয় আমার, লিখতে বল, আমার মত বাচাল আর কেউ নেই। কাছে এসো, এমন গুটিয়ে যাব যে ভাববে চিঠির মানুষটি নিশ্চয়ই অন্য কেউ! আমারও মাঝে মাঝে মনে হয়, লেখার আমি আর রক্তমাংসের আমি যে আমি নানিবাড়ি আর অবকাশের চৌহদ্দির মধ্যে বেড়ে ওঠা, দুজন। একজন পেখম মেলে পাখনা মেলে আকাশে ওড়ে, আরেকজনের মাটির পৃথিবীতে, অন্ধকারে, বন্ধ ঘরে বাস, গায়ে পায়ে শেকল, মস্তিষ্কেও।
রুদ্র এরপর আরও দুবার এল ময়মনসিংহে। মাসুদের দু একজন বন্ধুর সঙ্গে দিব্যি জমিয়ে নিয়েছে, এ শহরে সময় মন্দ কাটে না তার। রুদ্রর সঙ্গে দেখা হলে আমার কিন্তু সেই একই হাল, বুকের ধুকপুক এত দেখাতেও এমন হয়নি যে কিছু কমেছে। ভাই বন্ধুদের সঙ্গে আমি চুটিয়ে আড্ডা দিতে পারি, কিন্তু প্রেমিকের সামনে পড়লে গা হাত পা সব ঠাণ্ডা হয়ে থাকে। মুখে তালা, চাবি অদৃশ্য।
রুদ্রর তো আসা হচ্ছে, কিন্তু দেখাটা হবে কোথায়, বসব কোথায় দুজন! মাসুদের বাড়িতে তার দাদারা আপত্তি তুলেছে, ও বাড়িতে আর নয়। শহরের রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করলে চেনা লোক কেউ দেখে ফেলবে আর মুহূর্তে বাবার কানে খবর চলে যাবে, সর্বনাশ! কোথায় তবে, ইশকুলের বান্ধবী নাদিরা আর মাহবুবার বাড়ি যাই, ওরা চা বিস্কুট খেতে দেয়, কিন্তু ফিসফিস করে বলে বাড়িতে নাকি জিজ্ঞেস করছে কে এই লোক! তখনও আমার বয়সী মেয়েদের কোনও প্রেমিক নিয়ে কারও বাড়িতে যাওয়া অশালীন একটি ব্যাপার, প্রেম করা ব্যাপারটিই যখন অশালীন! মেয়ে বড় হলে বাবা মা পাত্র খুঁজে মেয়েকে বিয়ের পিঁড়িতে বসাবে, মেয়ে মখু বুজে জানা নেই শোনা নেই লোককে দিব্যি স্বামী মেনে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি ঘর করতে যাবে—এ নিয়মের বাইরে মেয়েরা যে প্রেম করে না তা নয়, কিন্তু গোপনে, এত গোপনে যে কাক পক্ষী জানতে না পারে। কাকপক্ষী তো বটেই দএু কজন বন্ধুকে ব্যাপারটি জানাতে আমার আপত্তি ছিল না। চন্দনা আদ্যোপান্ত জানিয়েছি, রুদ্রকেও জানিয়েছি চন্দনার সমস্ত দুজনকেই সনির্বন্ধ অনুরোধ করেছি, পরস্পরকে লিখতে। লেখালেখি চলছে দুজনে। রুদ্রকে লেখা আমার চিঠির অনেকটা জুড়েই থাকে চন্দনা। চন্দনা যে আমার প্রাণের সঙ্গে কতটুকু জড়িয়ে আছে, তা বোঝে রুদ্র। মাঝে মাঝে অভিমান করে বলে, কেবল চন্দনা চন্দনা চন্দনা। তোমার তো একজন বন্ধু হলেই চলে, আমার কি আর প্রয়োজন আছে তোমার জীবনে! রুদ্রকে নিয়ে কোথাও যাওয়ার, কোথাও বসার জায়গা না পেয়ে একদিন নানিবাড়ি বেড়াতে যাই। নানি আমাদের জন্য চা করে নিয়ে আসেন, মখু টিপে হেসে রুদ্রকে বলেন, এই মেয়েকে পাইতে হলে আগে প্রতিষ্ঠিত হইতে হবে, বুঝলা! আমি শরমে মুখ নিচু করি। তবু নানিবাড়িতে যা সম্ভব, অবকাশে তা নয়। রুদ্রকে নিয়ে এ বাড়ি ও বাড়ি নানা বাড়ি যাওয়ার কথা ভাবি, কিন্তু কখনও অবকাশে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে পারি না। সুতরাং, পার্কে বসে থাকো, বোটানিক্যাল গার্ডেনে বস গিয়ে, গাছের ছায়ায় বসে কথা বল। বোটানিক্যাল গার্ডেন শহর থেকে খানিকটা দূরে, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়, ওখানে ব্রহ্মপুত্রের শুকিয়ে যাওয়া জলের দিকে মুখ করে ঘাসে বসে থাকি, দএু কটি বালু টানা নৌকা যায়, তাই দেখি বসে আর হ্যাঁ বা না জাতীয় কিছু শব্দ উচ্চারণ করি রুদ্রর অসংখ্য প্রশ্নের জবাবে। বাগানে হাঁটতে আসা লোকেরা অদ্ভুত চোখে আমাদের দেখে।
মেডিকেল কলেজে ঢোকার পর একটি নিয়মিত জায়গার ব্যবস্থা হল, কলেজ ক্যান্টিন। ক্যান্টিনে প্রথমদিন হাবিবুল্লাহকে নিয়ে রুদ্রর সঙ্গে দেখা করতে যাই, হাবিবুল্লাহ যেহেতু বন্ধু যেহেতু আমার গভীর বিশ্বাস, ছেলেতে মেয়েতেও বন্ধুত্ব হতে পারে, ঠিক ছেলেতে ছেলেতে বা মেয়েতে মেয়েতে যেমন, হাবিবুল্লাহ আর চন্দনাতে যেহেতু আমি কোনও তফাৎ দেখি না, রুদ্রর মুখোমুখি বসে আমি যে কটা বাক্য ব্যয় করি, তা হাবিবুল্লাহর সঙ্গেই। আর কিছু শব্দ কেবল কাপের ভেতর চা আর দধু চিনির মিশেলের রঙ খুঁজতে খুঁজতে, যখন রুদ্র জিজ্ঞেস করে ক্লাস শেষ হয়েছে?
হয়েছে।
আরও ক্লাস আছে?
আছে।
করতে হবে?
হু।
হু মানে কি? না করলে চলে না?
চলে।
ক্লাস ফাঁকি দিয়ে রুদ্রর সঙ্গে বসে থাকি। দুপুরের পর ক্যাম্পাস খালি হয়ে যায়, ক্যান্টিন বন্ধ হয়ে যায়, চত্বরে ঘাসের ওপর, নয়ত কলেজের সিঁড়িতে বসে আমাদের প্রেমালাপ চলে, প্রেমালাপ এরকম,
চিঠি পাচ্ছ ঠিকমত?
পাচ্ছি।
আমাকে প্রতিদিন চিঠি লিখবে,বুঝেছ?
আচ্ছা।
কবিতা লিখছ?
এই একটু আধটু।
পারলে মাত্রাবৃত্তে লিখবে।
মাত্রাবৃত্ত তো ছয় ছয় করে। তাই না?
হ্যাঁ। শেষে দুই যোগ করতে পারো। ছয় ছয় দুই।
অক্ষরবৃত্তটা বুঝতে পারি, মাত্রাবৃত্তটা কঠিন লাগে..
লিখতে লিখতেই ঠিক হবে। অক্ষরবৃত্ততেই প্রথম প্রথম লিখতে থাকো।
আট চার ছয়ে?
তাও করতে পারো, আবার আট চার দুই, ছয় চার দুই, ছয় চার দুই করলে অবশ্য মাত্রাবৃত্তের ছন্দটা চলে আসে..
উপদ্রুত উপকূলের কবিতাগুলো তো বেশির ভাগ অক্ষরবৃত্ত ছন্দে, তাই না?
হ্যাঁ তাই।
আমি তো লিখি আর অক্ষর গুনি, কী যে ঝামেলা লাগে..
ঝামেলার কি আছে, ছন্দটা হচ্ছে শোনায়. কানটা সজাগ রাখবে.. .
মাঝে মাঝে মনে হয় আমার এসব কবিতাই হয় না।
হয় হয়, লিখতে থাকো। তোমার কবিতার খাতাটা কাল এনো তো দেখব!
