রুদ্রর সঙ্গে মুখোমুখি প্রেম না হলেও চিঠির প্রেমটি মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। তার দাবি, প্রতিদিন তাকে চিঠি লিখতে হবে। প্রতিদিন সে নিজেও চিঠি লেখে। একদিন যদি বাদ পড়ে আমার চিঠি, রুদ্র চরম উৎকন্ঠা নিয়ে লেখে, কি হয়েছে কি তোমার, আমাকে কি ভুলে যাচ্ছা না, রুদ্রকে আমি ভুলে থাকি না। কিন্তু তাকে চিঠি লেখার জন্য আমার যে খানিকটা আড়াল চাই, বাড়ির লোকেরা আমার গায়ে পায়ে জড়িয়ে থাকলে আমার পক্ষে যে সম্ভব নয়, তা তাকে বোঝাতে পারি না। রুদ্রর আশংকা ধরে বেঁধে খুব শিগগির আমাকে বিয়ে দিয়ে দেবেন আমার বাবা। আমি স্পষ্ট করে জানিয়ে দিই যে এ কাজটি আমার বাবা কোনওদিনই করবেন না, আমাকে খুন করে ব্রহ্মপুত্রের জলে ভাসিয়ে দিতে পারেন, কিন্তু ডাক্তারি পাশ করার আগে তিনি আমার বিয়ে সম্পর্কে কোনও শব্দ উচ্চারণ করতে দেবেন না কাউকে। রুদ্র অবিশ্বাসে আশংকায় উদ্বেগে দিন যাপন করতে থাকে। মোংলা আর মিঠেখালিতে অঢেল সময় কাটিয়ে সে ঢাকা ফেরে, ঢাকা থেকে একদিন বা দুদিনের জন্য ময়মনসিংহে আসে। নৈঃশব্দকে সঙ্গী করে আমরা আগের মত বসে থাকি মুখোমুখি। রুদ্র একদিন নৈঃশব্দের শরীরে সুচ ফুটিয়ে বলে,চল বিয়ে করি।
বিয়ে?
হ্যাঁ বিয়ে।
আমি হেসে উঠি। চল মঙ্গলগ্রহে যাই, বা চল সমুদ্রে ডুবে মরি, এধরনের অদ্ভুতুড়ে প্রস্তাব শুনছি বলে মনে হয়। না হেসে আমার উপায় থাকে না। রুদ্র ভুরু কুঁচকে বলে, কি হাসছ যে!
হাসি আসছে।
হাসি আসে কেন?
আসে।
আমরা কি বিয়ে করব না নাকি?
বিয়ের কথা উঠছে কেন?
কেন উঠবে না!
পাগল নাকি?
পাগল হব কেন?
পাগল না হলে বিয়ে বিয়ে করে কেউ!
বাজে কথা বোলো না।
এ বুঝি বাজে কথা।
হ্যাঁ বাজে কথাই।
রুদ্র বিষণ্ন বসে থাকে। বিষণ্নতা আমার দিকেও হামাগুড়ি দিয়ে এগোয়। অনেকক্ষণ নখ খুঁটি, অনেকক্ষণ বইয়ের পাতায় চোখ ফেলে রাখি অহেতুক। কণ্ঠে না-বোঝা বিষাদ।
বাবা মেরে ফেলবে।
বাবার সঙ্গে চল দুজন দেখা করি। রুদ্র গম্ভীর গলায় বলে। গাম্ভীর্যের গলা মুচড়ে দিয়ে আমার অট্টহাসি স্ফূতর্ হয়।
হাসছ যে!
আমার আবারও হাসি পায়। কিছু কিছু অস্বাভাবিক দৃশ্যও কষ্টেসৃষ্টে কল্পনা করা যায় হয়ত কিন্তু এই দৃশ্যটি, যে, আমি আর রুদ্র বাবার সামনে দাঁড়িয়েছি, বলছি যে আমরা বিয়ে করব, অনুমতি দিন বা কিছ-ু -কল্পনাতেও আনা আমার পক্ষে সম্ভব হয় না। আমি অন্যমনে ঘাস ছিঁড়ি।
কি, তুমি হাসছ কেন, বল। বিয়ের কথা ভাববে না কোনওদিন?
বিয়ে আবার এখনই কি? আমি ডাক্তারি পাশ করে নিই। তারপর দেখা যাবে। আমার উদাসীন উত্তর। শব্দগুলো উত্তাপহীন, শীতল।
সে অনেক দেরি। উৎকণ্ঠা গেড়ে বসেছে রুদ্রর কণ্ঠে।
দেরি, তাতে কি?
রুদ্রর দেরি সয় না। এক্ষুনি সে কিছু একটা করে ফেলতে চায়। এক্ষুনি বিয়ে করে সংসার করার মত স্বপ্নও সে দেখে ফেলছে। রুদ্রর দিকে তাকিয়ে আমার মনে হতে থাকে, মানুষটিকে আমি চিনি না। খুব দূরের মানুষ। মামার বাড়ির আবদার করা জ্বালিয়ে মারা বুড়ো খোকা।পরীক্ষা দাও, এমএ টা পাশ কর, তারপর তো বিয়ের প্রসঙ্গ, এক্ষুনি কিসের তাড়া! চিঠিতে জানাই। রুদ্র লেখে, পরীক্ষা দেওয়া না দেওয়া সমান কথা তার কাছে। ওসব ফালতু ডিগ্রিতে তার কোনও উৎসাহ নেই। উৎসাহ তার না থাক, আমি তো জানি, আমার বাড়ির লোকের আছে। আর এমএ পাশ করা কোনও ছেলেকেও যে আদৌ আমার যোগ্য মনে করা হবে, তা আমার বিশ্বাস হয় না। তার ওপর রুদ্র কবি, কবিদের ভাত নেই, কবিরা টুডাইল্যা জাতীয় লোক হয়, বাবার বদ্ধ ধারণা। রুদ্র বলে দেয় সে কবি, এই তার পরিচয়, সে কখনও কোনওদিন কোনও চাকরি বাকরি করবে না, সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করার কোনও যুক্তি নেই।
না তবু..
কিসের তবু?
বাবার ভয়ে ওষ্ঠে প্রাণ আমার। রুদ্রকে বোঝানো সম্ভব হয় না বাবার হৃদয় কী ধাতু দিয়ে গড়া।
বাবা ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের জুরিসপ্রুডেন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। কোনও অধ্যাপক না থাকায় তিনিই বিভাগটির হর্তা কর্তা। সকালবেলা প্রায়ই বাবার সঙ্গে রিক্সা করে কলেজে যাই। অর্ধেক পথ তিনি উদার হসে ্ত উপদেশ বিতরণ করেন। এক চান্সে মেডিকেলটা পাশ করতে যেন পারো, সেইভাবে লেখাপড়া কর। ভাল যে বাবা বলছেন না পরীক্ষায় তারকাখচিত কিছু না পেলে তিনি বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবেন। মেডিকেলে একবার ঢোকা মানে একদিন না একদিন ডাক্তার হয়ে বেরোনো, এ জিনিসটি তিনি বিশ্বাস করেন, তাই বেশ নিশ্চিন্ত দেখায় তাঁকে। মেডিকেলের পরীক্ষাগুলো শাদামাটা পাশ করে যাওয়াই অনেকটা ভাগ্যের ব্যাপার, ভাল ছাত্রছাত্রীদের দ্বারাও সবসময় এ কাজটি সম্ভব হয় না। এনাটমি ফিজিওলজির জটিল জিনিসগুলো নিয়ে, যেগুলো মাথায় ঢুকেও ঢুকতে চায় না, কোনও প্রশ্ন করলে বাবা এমন সহজ সরল করে উত্তর দেন যে সুড়সুড় করে সব মগজে প্রবেশ করে। এমন কোনও প্রশ্ন নেই, যার উত্তর তিনি জানেন না। তিনি এখনও রাত জেগে পড়াশোনা করেন। যেদিন তিনি ক্লাস নেবেন, তার আগের রাতে প্রায় দুটো পর্যন্ত পড়ে তবে বিছানায় যান। একসময় তিনি লিটন মেডিকেল ইশকুলে এনাটমির শিক্ষক ছিলেন। সেই লিটন তো কবেই উঠে গেছে, এখন আর বিদ্যালয় নেই, এখন মহাবিদ্যালয়, লাগোয়া মহা-হাসপাতাল, মহা-ক্যাম্পাস, আর আর মহা-শিক্ষকমণ্ডলির বেশির ভাগই, বাবা বলেন বাবার ছাত্র ছিলেন। একধরনের সুখ হয় শুনে, আমি যত না নিজের নামে চেনা, তার চেয়ে বেশি চেনা রজবআলীস্যারের মেয়ে হিসেবে, অন্তত কলেজে।
