বাড়িতে যে অতিথিই আসে, চা বিস্কুটএর বদলে দাদা মোগল ই আযম দিয়ে আপ্যায়ন করা শুরু করলেন।
১১. কবোষ্ণ জীবন
রুদ্রর সঙ্গে যখন জীবন দেওয়া নেওয়া ইত্যাদি সব সারা তখনও তার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। চিঠিতেই আলাপ, চিঠিতেই প্রেম, চিঠিতেই যা কিছু খেলার ছলে ওই জীবন দেওয়া নেওয়ার ব্যাপারটি ঘটেছে। রুদ্র জানাল, ২৯ আশ্বিন তার জন্মদিন।
জন্মদিনে কি চাও বল। তুমি যা চাও, তাই দেব তোমাকে।
যা চাই তা দেওয়া কি তোমার পক্ষে সম্ভব হবে?
কেন হবে না?
হবে না আমি জানি।
বলেই দেখ না।
রুদ্র জানাল তার চাওয়া হবে খুবই কঠিন, কষ্টকর এবং দুঃসাধ্য কিছু।
পরের চিঠিতে তার প্রশ্ন, যা চাই তা কি তুমি সত্যিই দিতে পারবে?
আমি কাধঁ ঝাঁকিয়ে,বাহ পারব না কেন? বলেছি যখন দেব, দেবই বলি। চড়ুই পাখির মত দেখতে একটি অহঙ্কার আমার কাধঁ থেকে উড়ে নাকের ডগায় এসে বসে।
ধর আমি যদি তোমাকে চাই?
এ আর এমন কি! এইসব খুঁটিনাটি খুনসুঁটিতে ঠিক আছে যাও, এই আমাকেই আমি দিলাম।
আমার সঙ্গে প্রেম রুদ্রের শব্দের সঙ্গে, উপদ্রুত উপকূলের কবিতার সঙ্গে, তার চিঠির অক্ষরের সঙ্গে। পেছনের মানুষকে আমি চিনিনা, দেখিনি কোনওদিন কিন্তু কল্পনা করে নিই অপূর্ব এক সুদর্শন পুরুষ ওপারে আছে, যে পুরুষ কোনওদিন মিথ্যে বলে না, মানুষের সঙ্গে কোনও অন্যায় আচরণ করে না, যে উদার, অমায়িক, প্রাণবান, যে পুরুষ কোনও মেয়ের দিকে এ যাবৎ চোখ তুলে তাকায়নি ইত্যাদি একশ রকম গুণ। রুদ্র যখন জানাল ময়মনসিংহে আসছে আমার সঙ্গে দেখা করতে, আমাকে বারবারই গেলাস গেলাস ঠাণ্ডা জল খেতে হচ্ছিল, গলা বুক শুকিয়ে আসছিল। তা দেখা হবে কোথায়! মাসুদের বাড়ি, মাসুদও কবিতা লেখে, এমনিতে গানের ছেলে মাসুদ, ছোটদার বয়সে ছোট-বড় বিশাল বন্ধুমহলে সেও একজন, তার সঙ্গে রুদ্রর আলাপ ঢাকায়, টিএসসির আড্ডায়,তার বাড়িতেই উঠবে রুদ্র, সানকিপাড়ায়, আমাকে সকাল এগারোটায় ওখানে যেতে হবে। সকাল সাতটা থেকে ঘড়ি দেখছি, ঘড়ির কাঁটা যত এগারোটার দিকে এগোয়, তত আমার বুকের ধুকপুক ঘন হয়, দ্রুত হয়।
চোখে একটি কায়দার রোদচশমা পরা, যত না আধুনিক, দেখতে তার চেয়ে।জামা পাজামা পরনে, তখনও ওড়না পরি না, কলেজের ইউনিফর্মের লাল ওড়না ছাড়া আর কোনও ওড়নাও নেই বাড়িতে, চন্দনার মত ওড়নার ওপর আমারও বড় রাগ বলে ওড়না পরার বয়স হওয়ার পরও ওড়না না পরে ঘরেও থাকি, বাইরেও যাই। মাকে নানিবাড়ির কথা বলে লম্বা চুলের মেয়ে, চিকন চাকন মেয়ে, মেদ-নেই-মাংস-নেই-মেয়ে, পুকুরঅলা মাঠের ওপর ছোট্ট টিনের বাড়ির দিকে, মাসুদের বাড়ির দিকে। ছোট্ট বাড়ির ছোট্ট ঘরে ছোট্ট মেয়ের ছোট্ট বুকের সব ধুকপুক অকস্মাৎ থেমে গেল, যখন এক দাড়িঅলা, লম্বা চুলঅলা, লুঙ্গিপরা ছেলে বলল এসে যে সে রুদ্র। প্রেমিকার সঙ্গে প্রথম দেখা লুঙ্গিতে! রুদ্র দেখতে তখন গাঁ থেকে আসা রিয়াজউদ্দিনের শালাগোছের কেউ। কালো চশমার আড়ালেও নামিয়ে ফেলি চোখ।
চশমাটা খোল। আমি তোমার চোখ দেখতে পাচ্ছি না।
যার সঙ্গে জীবন বিনিময় হয়ে গেছে সহস্র লিখিত বাক্যে, তার প্রথম বাক্য, মুখোমুখি প্রথম বসে।
রুদ্রর ভারি স্বর আমাকে চমকায়, চশমা খুলি, কিন্তু তাকিয়ে থাকি মাসুদের ঘরের আসবাবে।
নৈঃশব্দ।
কী কথা বলছ না যে!
চপ্পলে পায়ের আঙুল ঘসতে থাকি। বাঁ হাতের নখের কিনারে দেখার কিছু নেই, তবু চোখ ফেলে রাখি ওতে, যেন এ মুহূর্তে শুশ্রূষা না করলে নখটি পচে গলে খসে যাবে। রুদ্রর দিকে না তাকালেও স্পষ্ট বুঝি সে আমাকে দেখছে, আমার চুল চোখ নাক চিবুক সব দেখছে। একঘর অস্বস্তির মধ্যে মাসুদ চা বিস্কুট নিয়ে ঘরে ঢোকে। আমি চায়ের কাপে, সোফার রং উঠে যাওয়া হাতলে, শোকেসের পুতুলে আর মাঝে মাঝে মাসুদে তাকিয়ে চা শেষ করেই উঠে দাঁড়াই।
কী ব্যাপার অস্থির হচ্ছ কেন? রুদ্র বলে। আবারও সেই ভারি স্বর।
আমার চোখ তখন জানালায়। গাছের পাতাগুলো কড়া সূর্যের তলে ঝিমোচ্ছে। পুকুরটিও ঝিমোচ্ছে, জলপোকারা গায়ে বসতেই মৃদু তরঙ্গ তুলে নেচে উঠছে জল।
রুদ্রও দাঁড়ায়, একটু একটু করে এগিয়ে আসে আমার দিকে, শরীরটির দিকে এক পলক চেয়ে বুঝি, লম্বায় আমার চেয়ে দু বিঘৎ খাটো সে। জাহাঙ্গীর নামে তাঁর এক বেটে বন্ধুর সঙ্গে ঝগড়া হওয়ার পর দাদা প্রায়ই আস্ফালন করতেন, পুইট্যা লোক হইল খোদার দুশমন! বেঁটে তো বেঁটেই,তার ওপর রুদ্রর মখু ভর্তি দাড়ি মোচ, মোচ জিনিসটি দেখলেই আমার ঘেন্না হয়, দাড়ি দেখলে তো আরও।
আমি শরমে নাকি ভয়ে জানি না, খানিকটা সরে দাঁড়াই।
রুদ্র বলল এক্ষূনি যাবার কি হল?
নৈঃশব্দ।
চিঠিতে তো খুব কথা বল। এখন বলছ না যে!
নৈঃশব্দ।
ইস কী মুশকিল। তুমি কি বোবা নাকি!
বোবা মেয়ে জল আর জলপোকাদের প্রায় গা ঘেঁষে মাসুদের বাড়ির মাঠ পেরিয়ে চলে গেল।
যাবার আগে, দরজায় দাঁড়িয়ে, কাল আসছ তো! প্রশ্নের উত্তরে কেবল মাথা নেড়েছে হ্যাঁ আসছে।
গিয়েছি পরদিনও। পরদিনও ওর দিকে চোখ তুলে তাকাইনি, আমার সমস্ত শরীরে, চুল থেকে পায়ের নখ অবদি, শরম। নিজেকে বারবার বলছি, কথা বল মেয়ে, কথা বল, ও তোর প্রেমিক। ওর সবকিছু তুই জানিস, ওর উপদ্রুত উপকূল পড়ে মখু স্ত করে ফেলেছিস, এবার দুটো তিনটে বাক্য বল। পারিনি। হয়নি।
রুদ্র চলে গেল। ঢাকা থেকে চিঠি লিখল, সে নাকি এমন মেয়ে দেখেনি। এমন লাজুক।
