কেউ এর কোনও উত্তর দেন না। না দাদা, না ছোটদা। দিব্যি আছেন তাঁরা। মা-হীন অবকাশ তাঁদের কাছে মোটেও অসহনীয় বলে মনে হয় না।
দাদা একটি মোটর সাইকেল কিনে এনেছেন, লাল রঙের একশ দশ সিসি হোন্ডা।কিনেছেন কিন্তু চালাতে জানেন না। বারান্দার ঘরে রাখা হোন্ডাটি তিনি দুবেলা পরিষ্কার করেন। যতক্ষণ বাড়িতে থাকেন, হোন্ডায় বসে বিকট শব্দে ইঞ্জিন চালিয়ে ওই ঘরেই আধহাত সামনে যান, আধহাত পেছনে যান। আর হোন্ডার আয়নায় বার বার নিজের মখু টি দেখেন কেমন লাগছে। ইঞ্জিন চালিত কোনও বাহন এই প্রথম আমাদের বাড়ি এল। বাবার হঠাৎ একবার শখ হয়েছিল এম এ কাহহারের বাড়ির লাগোয়া আকন্দ লজের জুলফিকার আকন্দের পুরোনো গাড়িখানা কেনার, বায়নার পঞ্চাশহাজার টাকা দিয়েও দিয়েছিলেন। বাড়ি সুদ্ধ আমরা তখন মনে মনে সেই শাদা ফক্সওয়াগন চালাচ্ছি। কিন্তু ইঞ্জিনে কি না কি দেখা দেওয়ায় সেই গাড়ি বাবা আর কিনলেন না, বায়নার টাকাও ফেরত পেলেন না, ফেরত পাওয়ার নাকি নিয়ম নেই। হোন্ডা কেনাতে বাবাও এর তদারকি করতে লাগলেন। বারান্দার ঘরের দরজা যেন সবসময় বন্ধ থাকে, কেউ যেন আবার চুরি করে না নিয়ে যায় এটি, রাতে তিনি নিজের হাতে ঘরের দরজায় ভেতর থেকে তালা লাগাতে শুরু করলেন। সেই শখের লাল হোন্ডাটি যেটি এখনও রাস্তায় বেরোয়নি, ছোটদা তুলে নিয়ে আমাকে বললেন পেছনে বসতে। ছোটদাও এর আগে কখনও মোটর সাইকেল চালাননি। ঈশ্বরগঞ্জে বাবার হাসপাতালের জিপ চালাতে শিখেছিলেন, সেই জ্ঞান কেবল। হোন্ডা আধমাইল পর্যন্ত যেতে তিরিশবার থামল। রাস্তার লোকেরা থেমে থেমে আমাদের তিরিশবার দেখল। মেয়ে মানুষ হোন্ডায় চড়েছে, দেখার বিষয়টি ছিল এই। মেয়েমানুষ এ শহরে হোন্ডায় বসলেও কোতূক বা কৌতূহলের বিষয় হয়। অথচ এই শহরে নিতু নিজে মোটর সাইকেল চালায়, বিদ্যাময়ী ইশকুলে পড়ে নিতু ছোটবোন মিতুকে পেছনে বসিয়ে ইশকুলে যায় প্রতিদিন। শহরের বিস্ময় সে। মাঝে মাঝে আমার ইচ্ছে করে নিতু হতে, কাউকে পরোয়া না করে শহরের পথে মোটর সাইকেল চালাতে। ইয়াসমিন যখন নিতু আর মিতুর কথা বলে, আমি মোহগ্রস্তের হয়ে শুনি।
দাদা হোন্ডা শিখে হোন্ডা চড়ে শহর এবং শহরের আশেপাশের শহরগুলো কোম্পানির কাজে যেতে লাগলেন। একদিন তিনি চল তরে পাহাড় দেখাইয়া আনি বলে আমাকে তুলে নেন হোন্ডায়। অপ্রত্যাশিত আনন্দ জানলা ভেঙে হুড়মুড় করে ঢুকে আমার ভুবন ভাসিয়ে দেয়। ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে এসে থামতেই আকাশ কালো করে মেঘ দৌড়োতে লাগল, যেন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে সূর্যটি, কালো ধোঁয়া বেরিয়ে আসছে পোড়া সূর্য থেকে। বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। ওই বৃষ্টির মধ্যেই একটি যাষনীবোঝাই নৌকোর মধ্যে আমরা, দাদার হোন্ডা, দাদা,আমি আর আমার মৃত্যুভয় উঠে পড়ি। নৌকোডুবিতে প্রাণটি যে আজ সকালে হারাতে হচ্ছে এ জেনেও জীবনে প্রথম পাহাড় দেখার ইচ্ছেজ্ঞট আমি কিছুতেই হাতছাড়া করি না। শম্ভগু ঞ্জ পৌঁছে, বাসের বাজারের কোলাহল পেরিয়ে হোন্ডা ছুটে চলল নির্জনতার দিকে। বাতাসে চুল উড়ছে, জামা উড়ছে। যেন এ আমি আর দাদা নই, দুটো প্রজাপতি উড়ে যাচ্ছে। যতদূর দৃষ্টি যায় কোনও বসতি নেই, কেবল বিল হাওড় আর ধানক্ষেত। গলা ছেড়ে হেঁড়ে গলায় গান গাইছি, মখু স্থ কবিতা বলছি, দাদার পেট ভর্তি গল্প, বানানো অবানানো, বলে যাচ্ছেন। দাদা ছোটবেলায় আমাদের গল্প শোনাতেন অনেক। কত আর গল্প জানে একজন মানুষ! দাদা পুরোনো গল্পগুলো আবার শোনাতে গেলে আমরা বিরক্ত হতাম। নতুন গল্পের জন্য জেঁকে ধরতাম। একদিন দীর্ঘ একটি গল্প শোনাবেন বলে আমাদের ডাকলেন। গল্পটি নতুন। খেয়ে দেয়ে লেপের তলায় একেবারে গল্প শোনার পরিবেশ তৈরি করে শোয়া হল, দাদা শুরু করলেন, অচিনপুর নামের এক গ্রামে আলাউদ্দিন নামের একটা কাঠুরে ছিল।একদিন দুপুরে বাড়িতে খুব খাওয়া দাওয়া কইরা একটা নতুন লুঙ্গি পইরা,কান্ধে একটা গামছা নিয়া আলাউদ্দিন বাড়ির বাইর হইল। সামনে বিশাল মাঠ, কোথাও আর কিছু দেখা যায় না। সেই মাঠে আলাউদ্দিন হাইটা হাইটা যাইতাছে, যাইতাছে তো যাইতেই আছে। যাইতে যাইতে যাইতে যাইতে যাইতে যাইতে যাইতে যাইতে যাইতে ..
তারপর?
তারপর মানে?
তারপর কি হইল? কই গিয়া পৌঁছল?
এহনো কোথাও পৌছায় নাই? এহনো যাইতেই আছে। যাইতে যাইতে যাইতে যাইতে যাইতে যাইতে..
আমি উৎসুক জানতে আলাউদ্দিন কোনও নদীর ধারে পৌঁছোল নাকি কোনও বটগাছের কাছে। কিন্তু আমার জানা হয় না কারণ দাদা ওই রাতে এক যাইতে যাইতে ছাড়া আর কিছু বললেন না। পরদিন ঘুম থেকে উঠেই দাদাকে জিজ্ঞেস করলাম, তারপর কি হইল, আলাউদ্দিন কই গেল? দাদা বললেন,এহনো যাইতেই আছে। এহনো যাইতেই আছে?
হ এহনো যাইতাছে।
কই যাইব?
ওইডা ত পরে জানবি। আগে যাইতে থাকুক।
সপ্তাহ পার হওয়ার পরও দাদা বললেন, যাইতাছে এহনো। কবে পৌঁছবে, কোথাও গিয়ে পৌঁছবে, কি ঘটবে পরে তার কিছুই দাদা জানান না। নতুন কোনও গল্প শুরুও করেন না। কারণ একটি গল্প তো তিনি বলছেন। একমাস পরও দাদা বললেন এখনও আলাউদ্দিন যাচ্ছে। আমি আর ইয়াসমিন গভীর চিন্তায় ডুবে থাকি, তর কি মনে হয়?আলাউদ্দিনের শেষ পর্যন্ত কি হইব? ইয়াসমিনের বিশ্বাস আলাউদ্দিন ক্ষিধের চোটে মরে যাবে পথে। দাদার কি বিশ্বাস তা তিনি কখনও বলেন না। দাদার আলাউদ্দিনের যাওয়া কখনও শেষ হয়নি। দাদার কাছ থেকে আর কোনও গল্পও আমাদের শোনা হয়নি। যেতে যেতে আমার ইচ্ছে করে আমাদের এই পথও না ফুরোক কোনওদিন। তারাকান্দা ফুলপুর পার হয়ে কাঁচা রাস্তা পাকা রাস্তা ভাঙা রাস্তা পেরিয়ে কংস নদীর সামনে আসি। বিষম স্রোতের নদী। যেন দুপাড় এক্ষুনি ভেঙে চুরে নদীর পেটের ভেতর ঢুকে যাবে। দুটো নৌকোর একটি পাটাতন, সেই পাটাতনের ওপর বাস ট্রাক ওঠে, দড়ি টেনে নদী পার করা হয়। নদী পার হতে হতে দাদা আমাকে উজান, ভাটি, লগি টানা কাকে বলে বোঝান, নদী এবং নৌকোর জীবন সম্পর্কে বোঝান। কংস পেরিয়ে আবার হাওয়ার বেগে ছোটা। ধান খেত, পাট খেত, রাস্তার ওপর শুকোতে দেওয়া ধান, পাখির এসে খুঁটে খাওয়া, মানুষের বাড়িঘর, উঠোন মাঠ দেখতে দেখতে হালুয়াঘাট পার হয়ে আরও ভেতরে গারো মেয়েদের ধানবোনা ধানকাটা, পিঠে বাচ্চা বেঁধে হেঁটে যাওয়া দেখতে দেখতে জয়রামকুরায় সুন্দর একটি হাসপাতালের সামনে থামি। এক অস্ট্রেলিয়ান গারোদের জন্য এই হাসপাতালটি বানিয়েছেন। দাদা অস্ট্রেলিয়ান ডাক্তার নেইল পালকারের সঙ্গে কথা বললেন, তাঁকে ওষধু পত্র দিলেন। আমি হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে পাহাড় দেখছি তখন। পাহাড়ের অন্য পাশে ভারত। বাংলাদেশ থেকে মেঘ ভেসে যাচ্ছে ভারতের দিকে, পাখি উড়ে আসছে ওদিক থেকে এদিকে। দাদাকে জিজ্ঞেস করি, পাহাড় পার হইয়া ওই পাশে যাই যদি! দাদা বললেন না যাওয়া যাবে না, ওইটা অন্য দেশ। পাহাড়ে হেলান দিয়ে শুয়ে আছে অন্য দেশ ভারত, আমার মনে হয় আমি শুনতে পাচ্ছি ভারতের হৃদপিণ্ডের শব্দ, শুনতে পাচ্ছি শ্বাস ফেলার শব্দ। এত কাছে, এত কাছে ভারত যে ইচ্ছে করে কানে কানে কিছু কথা কই। কই ভাগ হলি কেন রে? তুই কি আমাদের পর? পাহাড় দেখে ফেরার পথে দাদা অনেকের সঙ্গে থেমে থেমে কথা বললেন। দুটো ফার্মেসিতে থামলেন, চা মিষ্টি দেওয়া হল আমাদের। সারাদিন না খাওয়া অথচ ক্ষিধের কিছুই অনুভব করি না। ফার্মেসির একটি লোক পেছনে তাঁর বাড়িতে বউ বাচ্চার সঙ্গে পরিচয় করাতে ঢোকালেন, বউএর সঙ্গে দিব্যি কথা বলি এমনকি বাচ্চাজ্ঞটকে কোলে নিয়ে নাম জিজ্ঞেস করি। ওখান থেকে বেরিয়ে পথে দাদা বলেন, বাহ, তর তো উন্নতি হইছে। তুই ত এমনিতে মানুষের সাথে কথা কস না। আজকে কইতে দেখলাম।
