আমি হেসে বলি, সকালে ডেল কার্নেগি পড়ছি কয়েক পাতা। মনে হয় সেই কারণেই।
দাদা অট্টহাসি হাসেন। আমরা আবার হাওয়ায় ভেসে যাই।
দাদাকে এক সময় জিজ্ঞেস করি, আচ্ছা দাদা, এই যে তুমি সবার সাথে এত সুন্দর ব্যবহার কর, হাইসা হাইসা কথা কও, সেই নিশিবাবুর সাথে, মাথায় হ্যাট গলায় স্টেথোককোপ ঝুলাইয়া মাটির রাস্তায় সাইকেল চালাইয়া আসা হাতুড়ে ডাক্তারটার সাথে, কেমিস্ট নাজমুলের সাথে, জনমানবহীন এই বনবাসে জীবন কাটানো হাসপাতালের ওই ডাক্তারের সাথে—তুমি কি ডেল কার্নেগি মখু স্ত করছ?
দাদা অনেকক্ষণ হেসে উত্তর দেন, ডেল কার্নেগি তো আমার সাথে দেখা করতে আইছিল, আমার লাইফটা দেইখা গিয়া উপদেশমূলক রচনা লিখছে।
ছোট ছোট কাপে চা বিক্রি করে পথের ধারে ঝপু ড়িগুলোয়, চায়ের তৃষ্ণায় থেমে ওখানে চা খেতে গেলে দাদা বলেন, চা খাইস না, চা খাইলে ভেতরে ক্ষয় হইয়া যায়। দেখস না চায়ের কাপে চা রাইখা দিলে কিরম দাগ পইরা যায়, শত চেষ্টাতেও চায়ের কাপের দাগ আর উঠতে চায় না। এইভাবে তর কইলজা ক্ষয় হইয়া যাইব চা খাইলে, তর হৃদপিণ্ডটাও চায়ের কাপের মত নষ্ট হইয়া যাইতাছে। বীভৎস হইতাছে। ঝাঁঝরা হইয়া যাইব একদিন।
মা দধু ছাড়া চায়ে আদা মিশিয়ে দেন, সেই চায়ের স্বাদের ধারে কাছে গ্রামের বাজারের দধু মেশানো বাসিগন্ধের চা দাঁড়াতে পারে না। তবওু এই ঝপু ড়িদোকানের চা আমি পরমানন্দে পান করি, পান করি ঘরের বাইরে বলেই। বাহির আমাকে টানে। সষের্ ফুলে ছেয়ে থাকা গ্রামের হলুদ ক্ষেত আর বাজারের নানারকম ঝপু ড়ি দোকান দেখতে আমার আনন্দ হয়। ব্রহ্মপুত্র পার হওয়ার সময় অদ্ভুত সুন্দর রঙে সেজে ওঠা আকাশ দেখতে দেখতে ভয় উবে যায়, নৌকো ডুবে মরে যাওয়ার ভয়। যখন বাড়ি পোঁছই, সারা গা ধুলোয় কিচকিচ, এমন কি কথা বলতে গেলে দাঁতে কিড়কিড় করে ওঠে ধুলো। ধুলোয় চুল জট হয়ে আছে। দেখতে আমাকে, ইয়াসমিন বলে, ভূতের মত লাগছে। ভূত পেত্নী যেমনই দেখাক না কেন আমাকে, এই ভ্রমণ আমাকে আশ্চর্য রকম সুখী করে। অর্ধেক রাত অব্দি দাদাকে ধমকেছেন বাবা, তর মাথায় ত বুদ্ধি টুদ্ধি আছে জানতাম। এই মেয়েরে নিয়া তুই মোটর সাইকেলে বাইর হস, মাইনষে কি কইব!
রাতে শুয়ে কড়িকাঠের দিকে চোখ, ইয়াসমিনকে বলি, ধর আমি একটা পাহাড়, আমার শরীরের অর্ধেকটা ভারত, অর্ধেকটা বাংলাদেশ। আমার ডান হাত বাঁদিকে যাইতে পারবে না, আমার বাঁ হাত ডান দিকে আসতে পারবে না। কিন্তু আমার ওপর দিয়া তুই যদি পাখি হস, যাইতে পারবি। পাখির স্বাধীনতা মানুষের স্বাধীনতার চেয়ে বেশি। নানির বাড়িতে আমরা গিয়েছি, সে খবর বাবার কাছে পৌঁছে যায়। বাবা আমাকে ডেকে বললেন, ঠ্যাং লম্বা হইয়া গেছে তর। আরেকদিন যদি শুনি বাসার বাইর হইছস, টেংরি ভাইঙ্গা ফেলব। বাবার হুমকি কাজ করে না। আমি ঠিকই নানির বাড়ি যেতে থাকি। মাকে বলি, মা চল। নানি বলেন, তুই কইলেই হইব নাকি! নোমান কামালরে পাঠা, তর বাপরে পাঠা। তর বাপ আইয়া নিয়া গেলে যাইতে পারে। শুকনো-মখু -মা, শুকনো- ঠোঁট-মা বলেন, ওর বাপ কি আসবে? মেয়েদুইটার কষ্ট দেইখাও ত মখু বুইজা রইছে। কি জানি যদি রাজিয়া বেগমরে বাড়িত তুলে, তাইলে তো আর কারও না হোক, মেয়েদুইটার কষ্ট হবে!
নানির বাড়িতে যাওয়ার আসার পথে দেখি আজিজ প্রিন্টাসর্ নামে একটি ছাপাখানা।রিক্সা থামিয়ে সেই ছাপখানায় নেমে ডিমাই সাইজ প্রতি ফর্মা ছাপতে খর্চা কত জেনে আসি। এরপর দাদার কাছে টাকা চেয়ে কাগজ কিনে ছাপাখানায় দিয়ে ওখানে বসেই সেঁজুতির দ্বিতীয় সংখ্যার প্রুফ দেখি। মোহাম্মদ আজিজ নামের লোকটি ছাপাখানার মালিক, দাদা চেনেন তাঁকে, দাদাও মাঝে মাঝে দেখে আসেন ছাপা কদ্দুর। একদিন ছাপার বাকি খরচ দিয়ে বাড়িতে সেঁজুতি নিয়ে আসেন। সেঁজুতি এবার শাদা কাগজে, দাদা একটি কপি হাতে নিয়ে বললেন, নাহ, ছাপা ভাল হয় নাই। এরপর থেইকা জমানে ছাপাইস। জমান হইল সবচেয়ে ভাল প্রেস। পাতা পত্রিকা ত জমান থেইকাই ছাপতাম। দাদা যখন তাঁর এককালের পাতার কথা স্মরণ করেন, তাঁর চোখ থেকে ঝিলমিল আনন্দ ঝরে। পাতা নামে দাদা আর তাঁর বন্ধুরা মিলে যে সাহিত্যের কাগজ প্রকাশ করতেন, তা আসলেই খুব সুন্দর ছিল। পাতার চিঠি লেখার কাগজ, এমনকি সদস্য হওয়ার কাগজ, সদস্যচাঁদা নেওয়ার রশিদ এসবও ছাপা ছিল চমৎকার জলছাপঅলা, দাদা এখনও স্মৃতি হিসেবে পাতার কাগজপত্র রেখে দিয়েছেন কাছে। মাঝে মাঝে বের করে ধুলো ঝেড়ে হাত বুলোন আর বলেন, দেখিস পাতা আমরা আবার ছাপাইয়াম। যে তিনজন পাতা ছাপতেন তার মধ্যে একজন শীলার ভাই, শীলার সঙ্গে দাদার প্রেম হওয়াতে চিকন ফরহাদ দাদার মখু দর্শন করা বন্ধ করে দিয়েছেন, আরেকজন মাহবুব, ও ছেলে পাগল হয়ে এখন মানসিক রোগীর হাসপাতালে শেকল দিয়ে বাধাঁ। দাদা একটি কেন দশটি সাহিত্যপত্রিকা ছাপতে পারেন ইচ্ছে করলে কিন্তু পাতা নামটি ব্যবহার করতে পারবেন না। পাতা দাদার একার সম্পত্তি নয়। দাদা ছিলেন যগু ্ম সম্পাদক, আসল সম্পাদক ছিলেন ফরহাদ। দাদা বলেন, ফরহাদ আর কি করত, সব ত আমিই করতাম! তা বলে স্বস্তি জোটে অবশ্য, কিন্তু কোনও পত্রিকার নাম পাতা দেওয়ার অধিকার জোটে না। দাদা আবার পত্রিকা বের করতে চান পাতা নামে, খবরটি শুনে ফরহাদ জানিয়ে দিয়েছেন, দাদার বিরুদ্ধে তিনি মামলা করবেন।
