ইয়াসমিন ইশকুল থেকে ফিরে চেঁচাচ্ছে আমার ভাত কই? মতিনের বউ বলে, ভাত নাই। ভাত নাই মানে? ইশকুল থেইকা আইসা ভাত পাই নাই এইরম ত হয় নাই কোনওদিন। তা ঠিক, হয়নি কোনওদিন। মা ইশকুল থেকে ফিরলেই ভাত বেড়ে দিতেন। চিৎকার করে বাড়ি মাথায় করে ইয়াসমিন। মতিনের বউ দিয়ে সংসার চলছে না নিশ্চিত হয়ে বাবা গীতার ওপর সংসারের সমস্ত দায়িত্ব দিলেন। ছোটদার সঙ্গে বাবার যে বচসা হয়েছিল, তা আপনা আপনি মিটে গেল, যেন কোনওদিন বাবার মাথায় কোনও দ্বিকোণ, ত্রিকোণ, চতুষ্কোণ কোনও কাষ্ঠবস্তুর আঘাত লাগেনি। গীতা যা আদেশ করে, মতিনের বউ আর আমেনা সেই আদেশ পালন করে। দিন এভাবেই চলছে। দিন হয়ত চলে, আমার আর ইয়াসমিনের চলে না। গীতা আমাদের নিয়ে ছাদে দৌড়োদৌড়ি করছে, ঘরে নাচের ইশকুল খুলছে, আমাদের সিনেমায় নিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কিছু যেন বাকি থেকে যায়। বাবা বাড়ি ফিরেই গীতাকে ঘরে ডাকেন, অনুমান করি রাজ্যির কথা জিজ্ঞেস করছেন, সংসার ছেলেমেয়ের কথা। কেউ আবার কোনওরকম অঘটন ঘটাচ্ছে কি না জানতে চাচ্ছেন। গীতা বাবাকে আশ্বস্ত করেন বলে যে সব কিছু সে নিখুঁত চালাচ্ছে, সবই বিন্যস্ত, সবই সন্নদ্ধ। নিষেধ থাকার পরও এক বিকেলে ইয়াসমিনকে বলি, চল নানির বাসায় মারে দেইখা আসি। ইয়াসমিন লাফিয়ে ওঠে। ভয়ডর তুচ্ছ করে একটি রিক্সা নিয়ে দুজন যখন নানির বাড়িতে পৌঁছোই, মা দৌড়ে এসে আমাদের জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে ওঠেন।
মখু টা এত শুকনা লাগতাছে কেন, খাও নাই?
মাথা নাড়ি, খাইছি।
মা কাছে বসিয়ে কি দিয়ে খেয়েছি, কে রাঁধে, কে কাপড় চোপড় গোছায়, কে বিছানা করে দেয় সব পই পই করে জিজ্ঞেস করেন। মুখে তুলে ভাত মাছ খাইয়ে আঁচলে মখু মুছিয়ে দেন। তেল না পড়া জট বাধাঁ চুল সযতে ্ন আঁচড়ে বেণি গেঁথে দেন। আড়ালে নিয়ে জিজ্ঞেস করেন বাবা কিছু বলে কি না তাঁর কথা। আমি মাথা নাড়ি। বাবা কিছু বলেন না। বাবা যে প্রায়ই আমাদের বলেন কোনও জ্বালউরা বেডি বাড়িতে নাই, এহন নিজের খাওয়া নিজে খাইবি, নিজের পরা নিজে পরবি, নিজের বুঝ নিজে বুঝবি পেটের ভেতর লুকিয়ে রাখি। মা বলেন তিনি ভাল আছেন, নানা তাঁকে শাড়ি কিনে দিয়েছেন, এখানে খাওয়া দাওয়ায় কোনও অসুবিধে হচ্ছে না, এ বাড়ির সবাই মাকে খুব ভালবাসেন।মা বারবার বলেন এই কদিনে আমি আর ইয়াসমিন দুজনই নাকি শুকিয়ে গেছি। চোখের জলে মার গাল ভিজে যায়, বুক ভিজে যায়।
আমার জন্য মন খারাপ লাগে তুমগোর? মা মা বইলা কান্দো?
আমি আর ইয়াসমিন পরস্পরের চোখে চাই। কান্দি না বললে মার যদি কষ্ট হয়, বলি না। নিরুত্তর আমাদের বুকে জড়িয়ে মা বলেন, না কাইন্দো না, কান্দা আইলে তোমরা গীতার সাথে গপ্প কইর, নাম দেশ ফুল ফল খেইল। এখন থেইকা আর কাইন্দো না।
মাথা নাড়ি। আইচ্ছা।
নোমান কামাল আইল না যে! ওদেরে বইল আসতে।
মাথা নাড়ি। আইচ্ছা।
মা খুঁটিয়ে আরও কথা জিজ্ঞেস করেন।
রান্না কেমন হয়?
ভাল হয় না।
কেন ভাল হয়না? মতিনের বউ তো খারাপ রান্ধে না।
ঝাল দেয়।
বইলা দিবা ঝাল যেন না দেয়।
শাকের মধ্যে চুল পাইছি।
শাক ভাল কইরা ধইয়া নিতে কইবা।
আইচ্ছা।
মা, তুমি কি আর কোনওদিন যাইবা না? কণ্ঠে কষ্ট চেপে বলি।
খিলালে দাঁত খোঁচাচ্ছিলেন নানি, থুতু ফেলে বললেন, কেন যাইব? নিজেরা বড় হ।
তারপরে মারে নিয়া থাহিস। ওই বাড়িত ঈদুন আর যাইব না।
মা বলেন, নোমানের ত টাকা পয়সা আছে। সে যদি আলাদা বাসা নেয়, তাইলে ত থাকতে পারি।
অনেকক্ষণ উঠোনে উদাস তাকিয়ে থেকে মা আবার বলেন, দেইখেন মা, এইবার ওই রাজিয়া বেগমরে বাড়িত আনব।
তোমার বাবা কি কিছু কয়? রাজিয়া বেগমরে বাড়িতে আনব, এই ধরনের কিছ?ু মাথা নাড়ি। না।
তোমার বাবা কি বাসায় খায়?
খায়।
খাওয়া পছন্দ হয় তার?
জানি না।
কিছু কয় না?
না।
মা পাংশুমুখে বসে থাকেন। চোখের নিচে কালি মা,বসে থাকেন। গালে চোখের জলের দাগ মা, বসে থাকেন। আমরা যখন চলে আসি, পেছনে পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকেন বাসি গোলাপের মত, স্পর্শ লাগলেই ঝরে যাবেন এমন।
গীতার হাতে যখন সংসার, হাতে সংসার মানে কাজের বেডি বা ছেড়ি বা ছেড়া যেই থাকে কাজে ফাঁকি যেন না দেয়, দেখা; বাসন মাজা কাপড় ধোয়া ঘর মোছা ইত্যাদি কাজ আদেশ দিয়ে বিরামহীন করানো;পটল দিয়ে মাছ হবে, কি শাক দিয়ে মাছ হবে, ডাল পাতলা হবে কি ঘন হবে, আর ভাতের চাল কয় কৌটো নিতে হবে এসব বলে দেওয়া; গীতা যখন মাতব্বর, বাবার সঙ্গে যখন গীতার দহরম মহরম, তখনই একদিন গীতার ছোট ভাই ভাল নাম শিশির মিত্র, খারাপ নাম টুলু আসে, দেখা করে যায় বোনের সঙ্গে। এরপর প্রায়ই আসে। গীতা ঘরে ডেকে নিয়ে টুলুকে এটা সেটা খেতে দিয়ে ফিসফিস গল্প করে। টুলুর আসার খবরটি আমি আর ইয়াসমিন দুজনেই গোপন রাখি। গীতা মুসলমান বিয়ে করে মুসলমান হয়ে গেছে, তার এখন কোনও হিন্দু বাড়ির সঙ্গে সম্পর্কে থাকতে পারে না, এরকম একটি অলিখিত নিয়ম চালু এ বাড়িতে। গীতা যখন ছোটদাকে নিয়ে নিজের বাড়ি যায়, সে কথা বাড়িতে গোপন রাখে। টুলুর আসার ব্যাপারটিও গোপন।
দাদা নানির বাড়িতে মাকে দেখতে যেয়ে নানির হাতের চমৎকার রান্না খেয়ে নানির পানের বাটা থেকে পান খেয়ে বাড়ি ফেরেন মখু লাল করে। ছোটদাও সন্ধেবেলা বউ নিয়ে বেরিয়ে বন্ধুদের বাড়ি হয়ে, পিওনপাড়া বউএর বাড়ি হয়ে, নানিবাড়ি গিয়ে মাকে দেখে আসেন। দুজনকেই বলি, মারে নিয়া আসো না কেন?
