এ বাড়িতে গীতার আদরের কমতি নেই। ঈদ এলে দাদা গীতাকে সিল্কের শাড়ি কিনে দিলেন, মার জন্য সুতি। মার পছন্দ খয়েরি বা লাল রংএর শাড়ি, দাদা কেনেন পাড়অলা শাদা শাড়ি। শাদা শাড়িতেই মাকে মা মা লাগে, দাদা বলেন। যে শাড়িই মার জন্য কেনা হয়, মা আমাকে আর ইয়াসমিনকে দেন পরতে প্রথম। আমরা পরে, পরে মানে লুটোপুটি করে শখ মেটালে, পরে মা পরেন। মার অভাব আছে, কিন্তু অভাবের বোধ নেই। শাদা শাড়িটিই, হয়ত দুদিন পরে গ্রাম থেকে কেউ এসে নিজের অভাবের কথা বলে কাঁদল, মা দিয়ে দিলেন। গীতার কাছে রাজিয়া বেগমের নতুন নতুন অনেক কথা শোনেন মা। গীতার খোঁড়া মাসির সঙ্গে, যে মাসির নাম হেনা, যে মাসি আমাদের বাড়ি এসে একসময় আমাকে আর ইয়াসমিনকে পড়াতেন, রাজিয়া বেগমের খুব ভাব। নতুন বাজারের এক এতিমখানার মেট্রন হয়েছেন রাজিয়া বেগম, সেই এতিমখানায় গীতার হেনা মাসিও চাকরি করেন। রাজিয়া বেগমের কথা যত শোনেন মা, তত মার পাগল পাগল লাগে। পাগল পাগল মা বাবা বাড়ি ঢুকলে মখু বিষ করে বসে থাকেন। বাবা রাগ দেখালে মাও রাগ দেখান। বাবা সেই রাগ দেখানো মাকে তোশকের তল থেকে চাবুক এনে মেরে রক্তাক্ত করে উঠোনে ফেলে রাখলেন একদিন। গলা কাটা মুরগির মত ত্রাহি চিৎকার করতে করতে মা লাফালেন, মার গা থেকে রক্ত ঝরল, গাছের কাকগুলো কা কা রব তুলে সরে গেল এলাকা থেকে। দৃশ্যটি নৃশংস বলে সামনে যাইনি, ঘরের দরজা বন্ধ করে আমি আর ইয়াসমিন বসে ছিলাম, বাবার হাত থেকে চাবুক কেড়ে নেওয়ার শক্তি বা সাহস কোনওটিই আমাদের নেই। আমরা পাথর হয়ে থাকি। বাবা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মিনিট পাঁচ পর ছোটদা ঢোকেন। মাকে উঠোনে পড়ে গোঙাতে দেখে দৌড়ে বেরিয়ে যান বাড়ি থেকে। সোজা আরোগ্য বিতানে। টেবিল থেকে ডাক্তার লেখা ত্রিকোণ কাঠটি নিয়ে আমার মারে মারছস কেন? তরে আমি আজকে মাইরাই ফেলছি বলে ঝাঁপিয়ে পড়েন বাবার ওপর। পুরো নতুন বাজারের লোক জড়ো হয়ে যায় চিৎকার শুনে। ছোটদাকে পাঁচজনে ধরে বেঁধে থামায়। ঘটনা ওদিকে এটুকুই। বাবার কপালের একটি দিক শুধু সামান্য ফুলে উঠেছে। এর বেশি কিছু হয়নি। ছোটদার রক্তারক্তির ইচ্ছে ছিল, সেই ইচ্ছে সফল না হলেও শান্ত হতে হয় তাঁকে। আর এদিকে উঠোনের কাদামাটি থেকে উঠে গীতাকে অদ্ভুত শান্ত গলায় বললেন, চল আফরোজা, কই যাইতে হয় চল। রক্তমাখা শাড়ির ওপরই বোরখা চাপিয়ে মা বেরিয়ে যান গীতাকে নিয়ে। আদালতে গিয়ে সত্যিকার তালাকের কাগজে সই করে বাড়ি ফিরে আমার আর ইয়াসমিনের মাথায় হাত বুলিয়ে ভাল হইয়া থাইকো তোমরা, মাইনষের মা মইরা যায় না? মনে করবা আমি মইরা গেছি। তোমার বাবা আছে, ভাইয়েরা আছে। তারা তোমাদেরে আদর কইরা রাখবে। তোমরা ভাল কইরা লেখাপড়া কইর বলে মা নিজের সহায় সম্পদ যা আছে ছোট একটি পুঁটলিতে বেঁধে চলে গেলেন নানির বাড়ি। মা চলে যাওয়ার আগেই গীতার সঙ্গে বাবার বেশ ভাব হয়েছিল। বাবা গীতাকে আলাদা করে ডেকে বাড়িতে কি হচ্ছে না হচ্ছে খবরাখবর নিতেন। বাবার চিরকাল এমনই অভ্যেস, বাড়িতে সব সময় একজন চর নিযুক্ত করেন গোপন খবর পাওয়ার আশায়। কাজের মানুষরাই সাধারণত বাবার চর হিসেবে ভাল কাজ করে। এবারের চর অবশ্য কাজের মানুষ থেকে অনেক উঁচু মর্যাদার বুদ্ধিসুদ্ধি সম্বলিত।
মা যে নেই, মা যেদিন চলে গেলেন সেদিন বুঝিনি। অথবা মা চলে গেলে বাড়িতে হৈ হৈ রৈ রৈ আগের চেয়ে আরও করতে পারার স্বাধীনতা বেড়ে গেছে বলে একধরনের গোপন আনন্দে ভুগেছিলাম। কিছুদিন পর হাড়ে কেন, মজ্জায় টের পেয়েছি। টের পেয়েছি আমাকে কেউ গা মেজে গোসল করিয়ে দেওয়ার নেই, মুখে তুলে কেউ খাইয়ে দেওয়ার নেই, চুল বেঁধে দেওয়ার নেই। কাপড় চোপড় ময়লা হলে কেউ দেখে না। খেলাম কি না খেলাম কেউ খোঁজ নেয় না। কেউ আর বিকেলে সন্ধেয় ছড়া শোনায় না। আমার কখন ক্ষিধে পেয়েছে, তা আমার জানার আগে মা জানতেন, অস্থির হয়ে উঠতেন আমাকে তৃপ্ত করতে। এখন আমার ক্ষিধে লাগলেই কি না লাগলেই কি, কারও কিছু যায় আসে না। মা চলে যাওয়ার পর সংসার দেখার জন্য নান্দাইল থেকে বাবা তাঁর ছোট ভাই মতিনের বউকে আনিয়েছেন। বউটি ইয়া মুটকি, কুচকুচে কালো। মতিন বিডিআরএ চাকরি যখন করতেন রাজশাহীতে, তখনই বিয়ে করেছেন। বউ নিয়ে কমাস আগে যখন এ বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন, আমরা মখু টিপে হেসেছি বউ দেখে। এক্কেরে মনে হয় কামের বেডি! কামের বেডির আশপাশ মাড়ায় না কেউ, কিন্তু মা দিব্যি সখু দুঃখের গল্প বললেন মতিনের বউএর সঙ্গে। যেন বউটি মার দীর্ঘদিনের সই। আমাদের মখু টেপা হাসির দিকে ফিরে মা বলেছেন, ও মেসে কাম করত। তাতে কি হইছে।মানুষটা খুব সাদাসিধাা। সাদাসিধা মানুষকে সে কাজের বেডি হোক, পথের ফকির হোক, মার পছন্দ। মতিনের বউ এ বাড়িতে রাঁধে বাড়ে, সকলকে খাওয়ায়। কিন্তু মার মত কে হতে পারে! মার মত কার আবেগ উথলে উঠবে আমাদের জন্য! খাওয়ার সময় কলমি শাক পাতে তুলে দিয়ে বলতেন, কলমি লতা কলমি লতা জল শুকোলে থাকবে কোথা? থাকব থাকব কাদার তলে, লাফিয়ে উঠব বর্ষাকালে। মার ছড়ার অন্ত ছিল না। সেই ছোটবেলায় পড়া যে কোনও ছড়াই মা অনর্গল বলে যেতে পারতেন। এত ছড়া মার জানা ছিল যে আমি মাঝে মাঝেই ভাবতাম মার সব ছড়া একদিন লিখে রাখব, কোনওদিন মা ছড়াগুলো আবার ভুলে যান যদি! মা সম্ভবত ছড়াগুলো ভুলে গেছেন, অনেকদিন তো তাঁর ছড়া বলে বলে কাউকে খাওয়াতে হয় না। মন ভাল থাকলে দিদার, সবার উপরে, হারানো সুর, সাগরিকা, বৈজু বাওরা, দীপ জ্বেলে যাই ছবির সংলাপ মা মখু স্থ বলতেন মা। রাতের অনড় স্তব্ধতা ভেঙে চমৎকার গলায় গেয়ে উঠতেন, এখনো আকাশে চাঁদ ওই জেগে আছে, তবু জেনে গেছি তুমি আছ কাছে….! এখন দিন রাত রাতের স্তব্ধতা বিরাজ করে বাড়িটিতে।
