ধান ওঠার পর নান্দাইল থেকে বাড়ির লোকেরা যখন আসে, পিঠা নিয়ে আসে, মেড়া পিঠা। পিঠা দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়েন দাদা। সেই মেড়া পিঠা ফালি ফালি করে কেটে ভেজে গুড় দিয়ে খাওয়া হয়। মাঝে মাঝে বড় পাতিলে করে শিং মাগুর মাছ পানিতে সাঁতার কাটছে, আনেন। কেউ কিছু আনলে মা খুশি হন। মাছ রান্না করে পাতে দিতে দিতে বলেন, মাছগুলা খুব তাজা ছিল, পুস্কুনির মাছ। কেউ ঝাল পিঠা আনলে দাদা একাই ভেতরের বারান্দার চেয়ারে বসে পা দোলাতে দোলাতে অর্ধেকই খেয়ে ফেলেন। বাবার বড় বোনের অবস্থা ভাল। নান্দাইলের কাশিরামপুর গ্রামে থাকেন, অনেক জমিজমা, ছেলে মেয়ে লেখাপড়া করেছে। বড় বোনের মেজ ছেলে রাশিদ শহরের কলেজে লেখাপড়া করেছে। এ বাড়িতে থেকেই কলেজে পড়ত। অবকাশে থেকে বাবার অনেক আত্মীয়ই লেখাপড়া করেছে। বাবা তাঁর ভাইয়ের ছেলেদের পড়াতে যত আগ্রহী, বোনের ছেলেদের নয়। চাকরির খোঁজে, অসুখে বিসুখে, লেখাপড়ার কারণে লোক লেগেই থাকে, যে-ই আসে জায়গা হয় টিনের ঘরে, টিনের ঘরে লম্বা বিছানা পাতা আছে গ্রাম থেকে আসা মানুষদের থাকার জন্য। মার কাঁধে নিজের স্বামী সন্তানসহ বাবার বংশের লোকদের রেঁধে বেড়ে খাওয়ানোর দায়িত্ব। মা দায়িত্ব পালনে কোনওরকম ত্রুটি করেন না। এমনকি গ্রাম থেকে ভর দুপুরবেলা বাড়ি ওঠা অনাহূত অতিথিদের পাতেও ছোট হলেও মাছ মাংস দেন মা। মা অনেকটা জাদুকরের মত। এক মুরগি রেঁধে বাড়ির সবাইকে দুবেলা খাওয়ান, পরদিন সকালেও দেখি রুটির সঙ্গে খাবার জন্য কিছু মাংস রেখে দিয়েছেন। গরুর মাংস সস্তায় মেলে, বাবা সস্তার গরুর মাংস কিনে বাড়ি পাঠান প্রায়ই। এ খেলে আমার দাঁতের ফাঁকে মাংসের আঁশ আটকে থাকে, দাঁত খুঁচিয়ে বেলা পার হয়। বেছে বেছে আমার জন্য হাড় রাখেন মা, বড় হাড় মাংস কম, এ হলে কোনওরকম চালিয়ে নিতে পারি। মুরগির দাম বেশি। মুরগি খেতেও স্বাদ। খেতে স্বাদ হলেও মুরগি খাওয়ার ইচ্ছে দপদপ করলেও মুরগি জবাই কেউ আমাকে দিয়ে করাতে পারেনি। অনেক সময় এমন হয়, মা ব্যস্ত, দোকানের কোনও কর্মচারিরও আসার নাম নেই যে মুরগি জবাই করে দেবে, দাদারাও নেই কেউ, মা আমাকে বলেন জবাই করে দিতে। উঠোনে কাজের হাতে মুরগি ধরে দাঁড়িয়ে, আমার কেবল গলার চামড়া উঁচু করে ধরে আল্লাহু আকবর বলে কাটতে হবে যতক্ষণ না পর্যন্ত ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোয়। দা নিয়ে গেছি অনেকদিন। গলার চামড়া ধরে উঠিয়েছিও। দা ও গলার কাছে এনেছি। শেষ অবদি পারিনি। আমার পক্ষে কক্ষনো সম্ভব হয়নি জ্যান্ত মুরগির গলা কাটা। গলা কাটা মুরগি যখন উঠোন জুড়ে লাফায়, দেখলে কষ্টও অমন করে আমার বুকের ভেতর লাফায়। দাদার কোনও কষ্ট হয় না দেখতে। দাদা বেশ উপভোগ করেন মুরগির অমন লাফানো। আমি মাকে অনেক সময় বলেছি,আমাদের খাওয়ার মজার জন্য মুরগিটার জীবন দিতে হইল! মা বলেন, ওদেরে আল্লাহ বানাইছেন মানুষের খাদ্যের জন্য। আল্লাহর উদ্দেশে কুরবানি দিলে কোনও গুনাহ হয় না। গুনাহ হয় না মা বলেন, কিন্তু চারমাস উঠোন জুড়ে হেঁটে বেড়ানো, ফার্মের বড় একটি শাদা মুরগিকে, যাকে মা ঝুমঝুমি বলে ডাকতেন, যাকে তাকে কামড় দিত বলে যখন জবাই করার কথা উঠল, মা বললেন, পালা মুরগিরে জবো করা ঠিক না। শেষ অবদি জবাই মুরগিটিকে করা হয়েছিল। মা যে কেবল মুখে তোলেন নি কোনও মাংস, তা নয়, উঠোন রক্তাক্ত করে ঝুমঝুমি যনণ্ত্রায় লাফাবে এই বীভৎস দৃশ্যটি দেখার আগেই যেভাবে ছিলেন যে কাপড়ে, ওপরে একটি বোরখা চাপিয়ে চলে গেছেন নানির বাড়ি। ওখানে তৃপ্তি করে শাক দিয়ে ভাত খেয়েছেন। মার থেকে থেকে মনে হয়েছে ঝুমঝুমি মাকে অভিশাপ দিচ্ছে।
ঢাকায় থেকে আসা বার্মা কোরিয়া ঘুরে আসা গীতাকে আমরা বিস্মিত চোখে দেখলেও সে যে মার পুত্রবধু, মা তা ভোলেন না। পুত্রবধূর হাতে সংসারের দায়িত্ব কিছুটা হলেও দিয়ে নিজে তিনি বিশ্রামের সময় পাবেন ভাবেন। মার ভাবনাই সার। গীতা রান্নাঘরের ছায়াও মাড়ায় না। আগের চেয়ে গীতার ঔজ্জ্বল্য আরও বেশি বেড়েছে। আগের চেয়ে তার হিলজুতো থেকে শব্দ হয় বেশি যখন হাঁটে। ঘাড় অবদি চুল কেটেছে। ভুরুদুটো সম্পণূর্ চেছে ফেলে কাজল-পেনসিলে দুটো ধনুক এঁকে দেয় ভুরুর জায়গায়। আগের চেয়ে মখু মালিশের জিনিসপত্র বেশি তার। ঠোঁটে কায়দা করে লাল গোলাপি লিপস্টিক লাগায়, চোখের পাতায় রং লাগায়, নীল শাড়ি পরলে নীল রং, সবুজ পরলে সবুজ। আগের চেয়ে সুন্দর শাড়ি পরে, আগের চেয়ে রঙিন। আগের চেয়ে বেশি বাইরে বেড়াতে যায়। আমি আর ইয়াসমিন আগের মতই খানিকটা বিস্ময়ে, খানিকটা মুগ্ধ হয়ে, খানিকটা আহত হয়ে, খানিকটা বুঝে, খানিকটা না বুঝে গীতাকে দেখি। মার আয়নার টেবিলটির মাথায় তিনটে বাতি লাগিয়ে দিয়েছেন ছোটদা। কড়া আলোর তলে গীতাকে ফর্সা দেখতে লাগে আয়নায়। সেজে গুজে দাঁড়ালে গোলপুকুর পাড়ে সুধীর দাসের মূর্তি বানানোর দোকানে সাজিয়ে রাখা অবিকল দগুর্ামূর্তিটি, দশ হাতের বদলে দু হাত, এই যা পার্থক্য। গীতা ফাঁক পেলেই আমাদের ঢাকার গল্প শোনায়। রাহিজা খানমের তিন ছেলেমেয়ের গল্প। শুনতে শুনতে ছেলেমেয়েগুলোর স্বভাব চরিত্র সব আমাদের জানা হয়ে যায়। বার্মা কোরিয়ার গল্প যখন করে শুনতে শুনতে মনে হয় বার্মা আর কোরিয়া বুঝি আমলাপাড়ার পরের গলিতেই। আগের মতই মা রান্না করে বাড়ির সবাইকে খাওয়ান। আফরোজা উঠ, কিছু খাইয়া লও, থেকে থেকে মার ডাক শুনি। ছোটদার জীবনে লেখাপড়া জাতীয় কিছু হওয়ার আর কোনও সম্ভাবনা নেই বলে বাবা তাঁকে উপদেশ দেন আরোগ্য বিতানে বসতে। আড়াইশ টাকা মাইনে পাবেন। ছোটদা চাকরিটি লুফে নেন। এই চাকরি নেওয়ার পর দাদার ওষুধের ওপর হামলে পড়া প্রায় পুরোটাই কমে গেছে ছোটদার। তিনি ফুরফুরে মেজাজে দিন যাপন করেন। ফুরফুরে মেজাজে বিকেলবেলা গোলপুকুরপাড়ের দিকে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে যান। কালো ফটকে ছোটদার বাইরে যাওয়ার শব্দ হওয়া মাত্রই দৌড়ে গিয়ে সবরি গাছের নিচে মেথরের যাওয়া-আসা করার ছোট দরজার ছিদ্রে চোখ রেখে কলস কলস নিতম্বটি বাঁকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে গীতা। ওই ছিদ্রে চোখ রাখলেই রাস্তার উল্টোদিকে ডলি পালের বাড়ি, গীতা দেখে ওই বাড়ির দিকে ছোটদার ভুলেও কখনও চোখ পড়ে কি না। বিয়ে হয়ে কাচ্চা বাচ্চার মা হয়ে তালাক হয়ে বাপের বাড়ি পড়ে আছে ডলি পাল। ডলি পালের দিকে ছোটদা এখন আর তাকান না, তারপরও বার্মা কোরিয়া ঘুরে আসা গীতার সন্দেহ মোচন হয় না। গীতার সবকিছু এমনকি সবরি গাছের তলে দৌড়ে গিয়ে ছোটদাকে দেখার কৌতূুহলও আমাদের কৌতূহলি কবে। গীতার উচ্চাজ্ঞরত শব্দও লুফে নিতে দেরি হয় না। গীতা যে ভাষায় কাজের মানুষদের গাল দেয়, তার বেশির ভাগই আমরা আগে শুনিনি, অথর্ও অনেক গালের জানি না। আমেনাকে পানি দিতে বলার পরও দিতে দেরি হচ্ছিল বলে যখন বলল, বেডি এহনো পানি দেয় নাই। করে কি বেডি? বেডির কি বিগার উঠছে নাহি! বিগার শব্দটি অর্থ না জেনে ইয়াসমিন এখানে সেখানে ব্যবহার করতে লেগে যায়।
