জানালায় বসে কেবল কৃষ্ণচূড়াই নয়, কেবল মেহগিনি পাতার ঝরে যাওয়া নয়, চন্দনা তরুণ সুদর্শনদেরও দেখছে। এক সুদর্শনের সঙ্গে কিছু ভেবে কিছু না ভেবে দেখা করেও এসেছে। অনপুুঙ্খ বর্ণনা করেছে সেই দেখা হওয়া, সেই চোখে চাওয়া, সেই বুকের মধ্যে কেমন কেমন করা। হাত স্পর্শ করতে চেয়েছিল সুদশর্ন টি, চন্দনা আলগোছে সরিয়ে নিয়েছে নিজের হাত। ওর কেবল ভাল লেগেছে চোখে চাওয়াটুকুই, ওটুকুই ওকে বাকি দিন রাত্তির অদ্ভুত আবেশে জড়িয়ে রাখে। প্রেমের মত সুন্দর কিছু আমার মনে হয় জগতে আর নেই। প্রেমের গল্প আমি তন্ময় হয়ে শুনি। কল্পনায় এক রাজকুমার উড়ে আসে পঙ্খীরাজে করে। আমার এখন ভালবাসার সময়, আমি এখন ইচ্ছে করলেই ভালবাসার প্লাবন বইয়ে দিতে পারি..। নিজেও এমন কবিতা লিখতে থাকি।
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, ঢাকার এক উদীয়মান কবি, সেজুঁতির জন্য কবিতা পাঠিয়েছে। বাঁজে থেকে চন্দ্রবিন্দু তুলে তার তামাটে রাখাল তুই কবিতাটি পরের সংখ্যায় ছাপার জন্য রাখি।
বারবার বাঁশি তো বাজে না, বাঁশি শুধু একবারই বাজে। তামাটে রাখাল তোর বাঁশিটি বাজে না কেন! বাজে তোর নিঃসঙ্গতা, বাজে তনু ব্যথিত খোয়াব গহন সুরের মত বাজে তোর দিবস রজনী- তবু কেন বাঁশিটি বাজে না।
কবিতার সঙ্গে চিঠি পাঠিয়েছে রুদ্র, লাল কালিতে লেখা চিঠি। সেঁজুতির সম্পাদিকার সঙ্গে সে পরিচিত হতে চায় এবং তাকে তুমি সম্বোধন করতে চায় কারণ আপনি সম্বোধনটি তার বড় অপছন্দ। সেঁজুতির রং হলুদ কেন প্রশ্ন করেছে। সন্ধেদীপের শিখাটি হলুদ, তাই হলুদ, সোজা উত্তর। পরের চিঠিতে অবলীলায় তুমি সম্বোধন করে সে, যেন সে কত আপন আমার! চিঠিতে মানুষকে আপন করে নেওয়া আমার স্বভাবের অনগ্তর্ ত, আমি বিস্মিত হই না।
সেঁজুতির জন্য কবিতা কেবল দুই বাংলার শহর নগর গ্রাম গঞ্জ অলি গলি আনাচ কানাচ থেকে আসছে। কলকাতা থেকে অভিজিৎ ঘোষ, নির্মল বসাক, চৈতালী চট্টে াপাধ্যায়, জীবন সরকার এরকম অনেকে কবিতা পাঠাচ্ছেন। নাম দেখে নয়, কবিতা দেখে কবিতা ছাপি। কবিতা ভাল হলে সে নতুন কবি হোক, অজ পাড়া গাঁয়ে তার বাস হোক, পরোয়া করি না। লক্ষ করি, শব্দের বানানে পরিবর্তন চলছে চারদিকে। মুখের ভাষাকে লেখার ভাষায় আনা হচ্ছে। চন্দনা এক লিখতে এ্যাক লিখেছে। আমিও কোরেছিলাম, বোলেছিলাম, দ্যাখা হয়েছে, এ্যাকা লাগছে এরকম লিখছি। নির্মল বসাক কবিতায় প্রায়ই কোনও দাঁড়ি কমা ব্যবহার করেন না। রুদ্র শব্দ থেকে ণ তুলে দিচ্ছে এটি থাকার কোনও কারণ নেই বলে। ঊ, ঈ, ী, ,ূ কেও আর জরুরি মনে করছে না। নতুন একটি যতিচিহ্নের উদ্ভাবন করেছে, ইংরেজি ফুলস্টপের মত একটি শুধু বিন্দু এই যতিতে, কমাতে যতক্ষণ থামা হয়, তার চেয়ে কম থামতে হবে। রুদ্র যখন প্রাণ লিখতে প্রান লেখে, কারণ লিখতে কারণ লেখে, দেখতে অচেনা লাগে শব্দ। তবু সেঁজুতিতে যে কোনও পরিবর্তনকে স্বাগত জানাচ্ছি। ভাষা তো স্থবির কোনও জলাশয় নয় যে থেমে থাকবে! সেজুঁতির টুকিটাকি বিভাগে লিটল ম্যাগাজিনের খবর দিই, ঠিকানাও, যে পড়বে সেঁজুতি সে আরও কুড়ি পঁচিশটি লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে। কেবল লিটল ম্যাগাজিনের খবর নয়, কোথায় কবিতার অনুষ্ঠান হচ্ছে, কে কেমন লিখছেন, কার কি বই বেরোচ্ছে, এসব খবরও সংগ্রহ করে দিতে থাকি। সেঁজুতির ঘোষণা, একজন নির্ভেজাল কবিতাপ্রেমিক মাত্রই সেঁজুতির অধিকারী। সেঁজুতির উজ্জ্বল আলোয় ঘুচে যাবে কাব্য জগতের সকল কালো। সেঁজুতি সর্বদা সত্য ও সুন্দর। সেঁজুতির বিনিময় মূল্য চাট্টে সিকি মাত্র। কিন্তু চাট্টে সিকির বিনিময়ে যে কেউ সেঁজুতি কিনছে তা নয়। বিজ্ঞাপনহীন পত্রিকা নিজের গাঁটের পয়সা খরচা করে বের করে যারাই কবিতা লেখে বা কবিতা পত্রিকা বের করে তাদের কাছে পাঠাচ্ছি। পাঠাতেও গাঁটের পয়সা কম খরচা হয় না। কবিতা পড়ুন, কবিতা পত্রিকা কিনুন, কবিতার বই কিনুন সাধারণের কাছে এই অনুরোধ জানাচ্ছি সেঁজুতির মাধ্যমে। পুরো জগতটিকে কবিতার জগত না বানিয়ে আমার স্বস্তি নেই। আমাকে সত্যি সত্যি কবিতায় পেয়েছে। কবিতা আমার রাত্রিদিনের সঙ্গী।
বাড়িতে কেউ নেই, চন্দন ও ফুল হাতে আমি আমি কবিতার পুজোয় বসেছি,
অভিমানে সারাটা দিন নিষ্কর্মার মত বসে থাকি অহেতুক,
দরোজায় দাঁড়িয়ে কৃতঘ্ন শব্দেরা চোখ টিপে সহাস্যে অপমান করে
দুধেল জ্যোৎস্নায় ওত পেতে বসে থাকে নিন্দুক ও সমালোচকের দল
টানা গদ্যে লেখা অভিজিতের দীর্ঘ কবিতাগুলো পড়তে পড়তে মাত্রাবৃত্ত স্বরবৃত্ত থেকে বহুদূরে ভাসতে থাকি সময়ের স্রোতে।
রুদ্র সদ্য ছাপা হওয়া তার প্রথম কবিতার বই উপদ্রুত উপকূল পাঠিয়েছে। বইয়ের কবিতাগুলো সশব্দে পড়ি, সঙ্গে ইয়াসমিনকেও ডেকে আনি পড়তে। অবকাশের বাতাসে রুদ্রর কবিতার শব্দ। কবিতার গন্ধ। আমাদের মুখে কবিতা। মনে কবিতা।
আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই,
আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ননৃত্য দেখি,
ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে
এ দেশ কি ভুলে গেছে সেই দুঃস্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময়?
বাতাসে লাশের গন্ধ ভাসে
মাটিতে লেগে আছে রক্তের দাগ।
এই রক্তমাখা মাটির ললাট ছুঁয়ে একদিন যারা বুক বেঁধেছিল
জীণর্ জীবনের পুঁজে তারা খুঁজে নেয় নিষিদ্ধ আধাঁর
আজ তারা আলোহীন খাঁচা ভালবেসে জেগে থাকে রাত্রির গুহায়।
জাতির পতাকা আজ খামছে ধরেছে সেই পুরোনো শকুন।
রক্তের কাফনে মোড়া কুকুরে খেয়েছে যারে, শকুনে খেয়েছে যারে
সে আমার ভাই, সে আমার মা, সে আমার প্রিয়তম পিতা।
স্বাধীনতা, সে আমার স্বজন হারিয়ে পাওয়া একমাত্র স্বজন
স্বাধীনতা, সে আমার প্রিয় মানুষের রক্তে কেনা অমূল্য ফসল।
ধর্ষিতা বোনের শাড়ি ওই আমার রক্তাক্ত জাতির পতাকা।
