মার প্রেরণায় লিখি কি হয় এমন খরচ সংসারে! কাটাই তো অনেকটা অনাহারে। ঈদ এলে জামা পাই, সব ঈদেও জোটে না মনে কত কথা জমা, মুখে কিছু ফোটে না। চারিদিকে মেয়েরা কথা বলে চুটিয়ে আমরাই এ বাড়িতে ভয়ে থাকি গুটিয়ে। মনে তবু আশা থাকে লুকিয়ে, বাবার আদর পেলে ভুলগুলো চুকিয়ে বড় হব এত বড় আকাশ নাগাল পাবো দিগন্তের ওইপারে একদিন হারাবো।
পদ্যটি পড়ে মা বলেন হারানোর কথা লেখছস কেন? দাদা শব্দ করে পড়ে বলেন, সুন্দর হইছে। বাবা এরপর আর কিছু লেখেন না। পদ্যের জীবন আর সত্যিকার জীবনে যে অনেক পার্থক্য তা একদিন বাবার নাসরিন ডাকের চিৎকারে অনুভূত হয়। বাবার সামনে আগের সেই নতমখু নতচোখ দাঁড়াই। তিনি আগের মতই দাঁত খিঁচিয়ে বলেন, কি করা হইতাছে?
আমি নিরুত্তর।
সারাদিন আড্ডা মাইরা জীবন চলবে?
নিরুত্তর।
কোনও মেডিকেলে তর মত গাধার পক্ষে যে পাশ করা সম্ভব না, এইডা বুঝা যাইতাছে না?
নিরুত্তর।
কবিতা লেখস? কবিতা কি একলা তুইই লেখতে পারস? সবাই লেখতে পারে। কামের ছেড়ি মালেকারে জিজ্ঞাসা কর, সেও পারবে লেখতে।
গাধা থেকে শব্দ বেরোয়, মালেকা তো লিখতে জানে না।
না জানুক, মুখে ত কইতে পারব। লালন ফকির মুখে মুখে কবিতা বলে নাই? হাছন রাজা বলে নাই?
নিরুত্তর।
আমি শেষ ওয়ারনিং দিয়া দিলাম, মেডিকেলে ভর্তি হইতে না পারলে বাড়িত তর ভাত বন্ধ। খবর রাখছ কবে ঢাকা ইউনির্ভাসিটির ভর্তি পরীক্ষা শুরু হইব?
নিরুত্তর।
আর্কিটেকচারে ভর্তি পরীক্ষা সামনের মাসে। ঢাকায় গিয়া পরীক্ষা দিতে হইব। এক্ষুনি অঙ্ক করতে ব। পরীক্ষায় পাশ না করলে কপালে কি আছে তা নিজে বুঝতে চেষ্টা কর।
বাবার উপদেশবাণী নীরবে হজম করে আমি নতমস্তকে তাঁর কক্ষ থেকে বেরিয়ে অঙ্ক নয়, আনন্দ উৎসব শুরু করি। ঢাকা যাওয়ার আনন্দ।
ঝিককির ঝিককির ময়মনসিং, ঢাকা যাইতে কত্তদিন ! ঢাকা যাইতে কত্তদিন, ঝিককির ঝিককির ময়মনসিং। ঢাকা যাইতে সাতদিন, ঝিককির ঝিককির ময়মনসিং!
আর্কিটেকচারে ভর্তি পরীক্ষা দিতে তিনি নিজ মুখে বলেছেন, এর চেয়ে বেশি আমি আর কি চাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় ভর্তি হওয়ার কথা বললে তিনি হয়ত ঢাকা যাওয়ার এই সুযোগ থেকেও আমাকে বঞ্চিত করবেন। আর্কিটেকচারে ভর্তি পরীক্ষা দিতে পাঠাতে বাবা রাজি হতেন না যদি না এম এ কাহহারের পুত্রধন ফরহাদের মুখে শুনতেন আর্কিটেকচার ভাল সাবজেক্ট। ফরহাদ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বষের্ দীর্ঘ বছর বসে আছেন, পরীক্ষা এলেই তাঁর খুব বমি আর পাতলা পায়খানা শুরু হয়। প্রতি বছর পরীক্ষার আগে আগে ডাক্তার এসে ওষধু দিয়ে যান। পরীক্ষা দেওয়া হয় তাঁর, কিন্তু পাশ হয় না কখনও। না হলেও তাঁর কথার তো মূল্য আছে। স্থাপত্যশিল্প ভাল বিষয়, কেবল ভাল বিষয় নয়, ফরহাদ জোর দিয়ে বলেছেন, ডাক্তারির চেয়ে ভাল। যুক্তি দেখিয়েছেন, ডাক্তার মেয়েকে এক ডাক্তার ছেলে ছাড়া আর কেউ বিয়ে করে না, মেয়েদের ডাক্তারি পড়ার মুশকিল হল এই। ফরহাদ যে যুক্তিই দিন না কেন, কোনও যুক্তি বাবার কাছে টেকে না, বাবা কিছুতেই বিশ্বাস করেন না ডাক্তারির চেয়ে ভাল বিষয় পৃথিবীতে আর কিছু আছে, সে মেয়ের জন্য হোক কি ছেলের জন্য হোক, কী কুকুর বেড়াল কীটপতঙ্গের জন্যই হোক। হাত পা নেড়ে ফরহাদ দাদাকে বলে গেছেন, আরে মিয়া ঘরে বইসা কাজ করা যায়, বাইরেও যাইতে হয় না। একটা বড়লোকের বাড়ির ডিজাইন কইরা দিবা, ধর একটা গভমেণ্টের বিল্ডিং অথবা ধর নতুন সংসদ ভবনের ডিজাইন, কইরা দিলা, কোটি টাকা ঘরে বইয়া পাইয়া গেলা, সারা বছর আর তোমার কিছু না করলেও চলে। আর্কিটেকচার ভাল সাবজেক্ট এ কথা ছোটদাও বলেন। আরে আমগোর রফিক ওইখানে পড়তাছে না! রফিক পড়ছে বলেই সাবজেক্টটি ভাল,রফিক না পড়লে সাবজেক্টটি এত ভাল নাও হতে পারত। বন্ধু আর্কিটেকচারে পড়ছে বলে ছোটদা কালো-মাড়ি-হাসিটি এমন প্রসারিত করে রাখেন যে মনে হয় বিষয়টির স্বরেঅ থেকে চন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত সব তাঁর নখদর্পণে। ভর্তি হওয়ার আগে সাতদিন ক্লাস করতে হয়। ক্লাস নেয় শেষ বর্ষের ছাত্ররা। তাঁর বন্ধুটি আমাকে ইভেন ফ্রি কোচিংও দিতে পারে। যে জিনিসটি স্থাপত্যশিল্পে ভর্তি হওয়ার জন্য এখন জরুরি করা, তা অঙ্ক। আমার টেবিলের ওপর সপ্তূ হয়ে আছে লিটল ম্যাগাজিন। অঙ্ক বইয়ের খোঁজ পাওয়া যে আমার পক্ষে সম্ভব নয়, তা বুঝি। অঙ্কের খাতাগুলোও বাড়িতে আর আছে বলে মনে হয় না। সেরদরে বিক্রি করে সেঁজুতির কাগজ কিনতে চলে গেছে।
আমি যে খুব শীঘ্র স্থাপত্যশিল্পী হতে যাচ্ছি, সে কথা চন্দনাকে জানাই। চন্দনা ভর্তি পরীক্ষা দেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, বাংলা সাহিত্যে পড়াশোনা করবে। ঢাকায় আমরা একসঙ্গে থাকব, শেকল ছিঁড়ে দুটো মুক্ত পাখি হাওয়ায় উড়ে বেড়াবো, দুচোখে জীবন দেখব, দুপায়ে দৌড়ে যাবো, ক্রমশ উঁচুতে আরও উঁচুতে কি আছে না-দেখা, দেখব; স্বপ্নের সিঁড়ি আমাদের পায়ের নাগালে এসে যাচ্ছে। আমাদের ডানায় এসে ভর করছে ঝাঁক ঝাঁক আনন্দ।
সেঁজুতির দ্বিতীয় সংখ্যার জন্য চন্দনা তারুণ্য এ্যাক মোহন নদী নামে কবিতাটি পাঠিয়েছে।
আমার চারপাশে অমিত তারণ্যে খেলা করে কয়েকজন সুদর্শন তরুণ ঝড় ওঠে দ্রৌপদীর বুকে উন্মত্ত সজীবতায় অবিরাম ওরা হয় লুন্ঠিত, হৃতসর্বস্ব..।
